সাবেক সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড সরাসরি দেখাবে পেন্টাগন

‘একটি মৃত্যুদণ্ড লাইভস্ট্রিম করা মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল। এক সমাজ হিসেবে আমরা এই মানসিকতা অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি—অন্তত আজকের দিন পর্যন্ত আমি সেটাই মনে করতাম।’

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

১৩ জন নিরস্ত্র সেনাসদস্যকে গুলি করে হত্যার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সাধারণ জনগণের জন্য সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিম) করার পরিকল্পনা পেন্টাগনের। ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাসদস্যকে হত্যা করেন নিদাল হাসান। খবর বিবিসির।  

এই ফোর্ট হুডেই আগামী ৩ ডিসেম্বর এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মঙ্গলবার (৭ অক্টোবর) মার্কিন সেনাসচিব জানিয়েছেন।    

ধারণা করা হচ্ছে, এটি গত প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হতে যাওয়া প্রথম কোনো প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড এবং গত ৬০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রথম মৃত্যুদণ্ড। আগামী ৩ ডিসেম্বর এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।  

এই মৃত্যুদণ্ড জনসমক্ষে কার্যকরের বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘মানুষ যেন বুঝতে পারে এই ধরনের অপরাধের পরণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।’

রক্ষণশীল টেলিভিশন আউটলেট ‘রিয়েল আমেরিকাস ভয়েস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘হাসান সেনাদের নিয়ে গঠিত ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে—আর সেটাই হওয়া উচিত।’ 

হাসান কোনো শেষ অনুরোধ বা প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমার আবেদন করেছেন কি না জানতে চাইলে হেগসেথ স্পষ্ট জানান, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। নির্ধারিত দিনেই আদেশ কার্যকর হবে।  

এদিকে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল নিশ্চিত করেছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর এই সুপারিশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছেন। 

তবে এই সিদ্ধান্ত নতুন করে আইনি বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মৃত্যু পরোয়ানা স্থগিতের আইনি লড়াইয়ে যুক্ত আইনজীবী জন মিলস মন্তব্য করেন, হাসানের আপিল প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি এবং তিনি ফেডারেল আদালতে তার দণ্ড ও সাজা পর্যালোচনার আবেদন জানাতে পারেন, যা কার্যকর করার প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারে। ফলে, এই মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত তারিখে সত্যি হবে কি না, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।    

মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করার এই প্রয়াস ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। এছাড়াও তিনি যোগ করেন, বাস্তবে এটি হওয়ার সম্ভাবনা কম, আর এতে সুবিচারের কোনো প্রতিফলনও ঘটে না।’  

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ভিজিটিং লেকচারার ইউজিন আর. ফিদেল বিবিসিকে বলেন, ‘একটি মৃত্যুদণ্ড লাইভস্ট্রিম করা মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল। এক সমাজ হিসেবে আমরা এই মানসিকতা অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি—অন্তত আজকের দিন পর্যন্ত আমি সেটাই মনে করতাম।’  

ফিদেল জানান, হাসান যদি আইনি পদক্ষেপ নেন, তবে এই আইনি প্রক্রিয়া বহু বছর ধরে চলতে পারে এবং তা ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। 

লাইভস্ট্রিমটি ঠিক কোথায় দেখা যাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ, বেশিরভাগ প্রধান সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে সহিংস ও স্পষ্ট বিষয়বস্তু লাইভস্ট্রিম করার ওপর কঠোর নিষেধ রয়েছে। মেটা, ইউটিবউব, টিকটক এবং এক্স-এর মতো জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোতে শুধু সহিংস ছবি বা ভিডিও নয়, বরং মানুষের মৃত্যুর দৃশ্য দেখানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। মেটা পরিষ্কারভাবে মৃত্যুদণ্ড লাইভস্ট্রিম করা নিষিদ্ধ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৬১ সালে। সে বছর ১১ বছর বয়সী এক অস্ট্রিয়ান শিশুকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সাধারণ সৈনিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছিলেন।   

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের খুব কম দেশেই প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ইরান ১১টি এবং আফগানিস্তানে ৬টি প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের নজির দেখা গেছে। 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত