রংপুরে ৪ খুন

খেজুরের বিচি, শসা ও গামছায় মিলল আসামিদের ডিএনএ

ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন নমুনা ঢাকায় অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৭ এএম

রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যাকাণ্ডে কয়েকটি আলামতে গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পাওয়া গেছে। খেজুরের বিচি, শসার টুকরা, বিড়ির শেষাংশ ও নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলায় প্যাঁচানো গামছার নমুনা পরীক্ষায় তাদের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে।

ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন নমুনা ঢাকায় অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, খেজুরের বিচির নমুনায় মুগ্ধ দাসের, শসার টুকরায় সিদ্ধার্থ দাসের এবং বিড়ির শেষাংশে দুজনেরই ডিএনএ পাওয়া গেছে। এছাড়া নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলায় প্যাঁচানো গামছার নমুনায় শুধু মুগ্ধ দাসের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে।

রবিবার (১১ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর মহানগর ডিবি কার্যালয়ে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, উদ্ধার হওয়া আলামত, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে চার হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে নিহত চারজন ও দুই আসামি ছাড়া অন্য কারও ডিএনএ উপস্থিতির প্রমাণ মেলেনি।

তিনি আরও জানান, মামলার তদন্তকাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

জিন্নাত আলী বলেন, গত বৃহস্পতিবার ঢাকার সিআইডি কার্যালয় থেকে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩১ ধরনের নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল।

নমুনাগুলোর মধ্যে ছিল খেজুরের বিচি, শসার অংশবিশেষ, ফল কাটার ছুরি, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, বেসিনের দাগ এবং দুই আসামির রক্তের নমুনা।

চার হত্যাকাণ্ডের পর নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত হতে মা-মেয়ের ভ্যাজাইনাল সোয়াবের নমুনাও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। তবে পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, উদ্ধার হওয়া আলামত, আদালতে দেওয়া আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া চারজনের বক্তব্য এবং পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেওয়া ৫৬ জনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা জানিয়েছেন জিন্নাত আলী।

তিনি জানান, গণপতি চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজন মিলে হত্যা করেন। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে হত্যা করেন মুগ্ধ দাস। তাদের কলেজপড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজন মিলে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আসামিরা খবর পেয়েছিলেন, অবসরের পর পাওয়া ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা গণপতি চক্রবর্তী ব্যাংক থেকে তুলে বাড়িতে রেখেছেন। এ ছাড়া বাড়িতে অনেক স্বর্ণালংকার রয়েছে বলেও তাদের ধারণা ছিল। মূলত চুরির উদ্দেশ্যে তারা বাড়ির ছাদ দিয়ে প্রবেশ করেন। এরপর পরিবারের সদস্যদের একে একে হত্যা করেন বলে জানান জিন্নাত আলী।

তিনি আরও বলেন, মামলায় এলাকার শান্ত দাস, সীমান্ত দাস, দুলাল শর্মা ও কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাস আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন ৫৬ জন।

উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় ২৩ আগস্ট নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী রংপুর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

পরে পুলিশ গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে রংপুর কারাগারে পাঠায়। পরবর্তী সময় তারা আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

মামলাটি প্রথমে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত