চট্টগ্রামে ‘মৃত’ খোরশেদের ‘বেঁচে’ থাকার গল্প

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ এএম

ঘটনাটি ২০০৯ সালের জুন মাসের। চট্টগ্রামের বায়েজিদ কুঞ্জছায়া এলাকার খোরশেদ আলমকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে এক ‘অলৌকিক’ গল্প। ‘অসুস্থ’ হয়ে হাসপাতালে মারা যান। পাঁচ দিন তার মরদেহ ছিল হাসপাতালের মর্গে, পরে লাশ বাড়ি নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সে ঝাঁকুনি লাগলে নড়ে ওঠে। এরপর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।

ঘটনার দীর্ঘ ১৩ বছর পর খোরশেদ ও তার পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে ২০২২ সালে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয় সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। এ ঘটনাকে সহানুভূতির লাভের উপায় হিসেবে ব্যবহার করে প্রাপ্তিযোগের চেষ্টা চালান খোরশেদ।

সেই পুরনো গল্প গত ১৪ সেপ্টেম্বরে আবার আলোচনায় আসে। এবার ‘মৃত’ খোরশেদ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছে হাজির হয়ে সেই ‘পাঁচ দিন মর্গে থেকে জীবিত ফেরার’ গল্প তুলে ধরেন। তার অসুস্থতা ও দরিদ্রতার কথা শুনে মেয়র তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ান। আরও সহযোগিতার আশ্বাসও দেন।

একজন মানুষের ‘পাঁচ দিন মর্গে থেকে জীবিত ফেরার’ গল্পটি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় এ নিয়ে অনুসন্ধান চালায় দেশ রূপান্তর।

খোরশেদের ‘মৃত্যু’র গল্প : একটি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট অনুসারে ২০০৯ সালে খোরশেদ আলমের বয়স ছিল ২৭ বছর। পেশায় ছিলেন গাড়িচালকের হেলপার। পেট ফুলে যাওয়াসহ লিভারের সমস্যায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী। খোরশেদের দাবি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ অবস্থায় স্ত্রী লাশ ফেলে চলে যায়। ‘লাশ’-এর দাবিদার কেউ না থাকায় মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। পাঁচ দিন পর তার মা সায়েরা বেগম খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ দাফনের জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ি উদ্দেশে যাত্রা করেন। ফেরার সময় ২ নম্বর গেট এলাকায় একটি গর্তে অ্যাম্বুলেন্স পড়ে ঝাঁকুনি লাগে। সেই ঝাঁকুনিতে ‘মৃত খোরশেদ’ নড়ে ওঠেন। তখন ভয় পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারও পালিয়ে যান। অন্য এক ট্রাক ড্রাইভারের সহযোগিতায় মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আবার ভর্তি করেন। চিকিৎসা করে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এতে তার খরচ হয় প্রায় ১২ লাখ টাকা। এ ঘটনাই তার ‘মৃত্যুর পাঁচ দিন পর জীবিত হয়ে ওঠা’র গল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি খোরশেদের বাড়িতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি এ গল্পই বিস্তারিত বলেন। কিন্তু মৃত্যু সনদ কিংবা এ সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে সেখানে তার মাকে উপস্থিত করে বক্তব্য গ্রহণ করা হলে তিনি ভিন্ন তথ্য দেন।

মায়ের বর্ণনায় ঘটনা অন্য রকম : কুঞ্জছায়া এলাকায় গিয়ে এ বিষয়ে খোরশেদের মা সায়রা বেগমের বক্তব্য আমরা গ্রহণ করি। তিনি জানান, তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছেলের মরদেহ নিয়ে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত যাননি। অ্যাম্বুলেন্সে করে এতদূর যাওয়ার ঘটনাও ঘটেনি। তার ভাষ্য হাসপাতাল থেকে তাকে ফোন করা হলে তিনি সেখানে যান। গিয়ে দেখেন ছেলে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে লাশ ঘরের বাইরে একটি ট্রলিতে পড়ে আছে। অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করার সময় ছেলেকে দেখে তার মারা যাওয়া নিয়ে সন্দেহ হয়। এরপর তিনি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক পরীক্ষা করে খোরশেদ জীবিত আছেন বলে নিশ্চিত করেন। এরপর তার চিকিৎসা শুরু হয়। কিছু দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর খোরশেদের বড় অস্ত্রোপচারও হয়।

সায়েরা বলেন, আমার ছেলে যখন অসুস্থ হয়, তার প্রথম স্ত্রী আমার কাছে আসে; কিন্তু আমি তখন গুরুত্ব না দিয়ে তাকে চলে যেতে বলি। এরপর আমি হাসপাতাল থেকে খবর পেয়ে ছুটে যাই। সায়রা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলে শারীরিক নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রায় দুই মাস তিনি ছেলের সঙ্গে হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা করান। চিকিৎসায় নিজের জমানো চার লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়। এরপর সে সুস্থ হয়ে ফিরে।

মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী নেই : খোরশেদের মৃত্যুর খবর কুঞ্জছায়া এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল খোরশেদ ও তার মায়ের মাধ্যমেই। কিন্তু আশপাশের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৃত্যুর খবর তারা শুনেছেন মুখে মুখে। খোরশেদকে মৃত অবস্থায় দেখেছেন এমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান মেলেনি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খোরশেদ অসুস্থ ও দরিদ্র এ কারণে এলাকায় তার প্রতি মানুষের সহানুভূতি আগে থেকেই ছিল। কিন্তু পাঁচ দিন ‘মৃত’ থাকার পর জীবিত ফিরে আসার গল্পটি ছড়িয়ে পড়ার পর সেই সহানুভূতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল বলেন, খোরশেদের অসুস্থতার বিষয়টি তারা জানতেন। কিন্তু তিনি মারা গেছেন এবং কয়েক দিন পর আবার জীবিত হয়ে ফিরেছেন এমন কথা শুনে অনেকেই বিষয়টিকে সত্য বলে ধরে নেন। মানুষের কাছে ঘটনাটি ছিল অলৌকিক বলে মনে হয়েছে।

খোরশেদের বর্তমান স্ত্রী মানসুরা (১৮) জানান, স্বামীর ‘মৃত্যু’, মর্গে থাকা এবং পরে জীবিত হয়ে ওঠার ঘটনাটি তিনি তার স্বামী ও শাশুড়ির কাছ থেকেই শুনেছেন।

সত্যতা যাচাই ছাড়াই সংবাদ প্রচার : ২০২২ সালে খোরশেদের বক্তব্য অনুসারে ‘মৃত খোরশেদ’-এর গল্প কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশিত হয়। এরপর আবার গত ১৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহযোগিতা লাভের পর আবারও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তবে কোনো সংবাদেই মৃত মানুষের জীবিত হয়ে ওঠার পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ দেওয়া হয়নি। ঘটনার পক্ষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোনো নথি, মর্গের রেজিস্টারে নাম ছিল কি না, মৃত্যুসনদ আছে কি না কিংবা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কোনো বক্তব্য কোনো কিছুই ছিল না। এমনকি পাঁচ দিন মর্গে থাকার পর জীবিত হয়ে ওঠার ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সম্ভব কি না, সে বিষয়েও কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

চিকিৎসকরা কী বলেন : খোরশেদের ‘পাঁচ দিন মৃত থাকার’ দাবির পক্ষে অনুসন্ধানে গিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেন, এতদিন পর হাসপাতালে কোনো নথি থাকার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কাউকে মৃত ঘোষণা করা হলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় তা উল্লেখ করা হয়। এই ছাড়পত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বজনদের কাছে থাকার কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এমন দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি ছাড়া এ ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল প্রফেসর জসিম উদ্দিন বলেন, ঘটনাটা একটা বায়বীয় তথ্য বলেই মনে হচ্ছে। কারণ লাশ ঘর বা মর্গে সেসব রোগীকে রাখা হয়, যারা সড়ক দুর্ঘটনা বা পুলিশ কেসসংক্রান্ত ঘটনায় মারা যায়। কোনো ব্যক্তি যদি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তাহলে ওয়ার্ড থেকেই তার সব কাগজপত্র তৈরি করে তার স্বজনদের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বেওয়ারিশ হলে যেকোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে তাকে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এর বাইরে একজনকে কেন লাশ ঘরে রাখা হবে?

সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ডা. আমির খসরু বলেন, যেকোনো রোগীকে মৃত ঘোষণার আগে তার প্রেশার মাপা হয়। যদি প্রেশার পাওয়া না যায় তখন আমরা পালস পাওয়া যায় কিনা সেটি দেখি। এ ছাড়া মৃত ব্যক্তির চোখের মনি গোল হয়ে স্থির হয়ে যায়। তখন চোখে আলো ফেললেও কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় না। ইজিসি করলে এসিস্টল বা সরল রেখা আসবে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই কোনো ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তিনি জানান, যদি খোরশেদের বেলায় এ ধরনের ঘটনা থাকে তাহলে অবশ্যই সেসবের ডকুমেন্টস তার কাছে থাকবে। যদি না থাকে তাহলে ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত