আলো দেখাচ্ছে অ আ ক খ স্কুল

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৩ এএম

দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকটের কারণে অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ ও স্বপ্ন থাকলেও পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে তাদের অনেকেরই বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে অল্প বয়সেই জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত শহরের ফুটপাতে ছোট দোকান দেওয়া কিংবা বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতে হয় তাদের। আবার যথাযথ পরিচর্যা, পারিবারিক দিকনির্দেশনা ও সামাজিক সুরক্ষার অভাবে কিছু শিশু অসৎ সঙ্গের সংস্পর্শে এসে মাদকাসক্তি, চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। এভাবেই অনেক শিশুর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে চলে যায়।

ছড়িয়ে দিতে শিক্ষার আলো

নানা কারণে সুবিধাবঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুর জীবনে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ২০১৬ সালে ১৯ মে সাভারের নবীনগর এলাকার নিরিবিলি বস্তিতে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ আ ক খ স্কুল’। শুরুতে ত্রিপল দিয়ে বিকালবেলায় গণ বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণ স্বাস্থ্য মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা পালাক্রমে সপ্তাহে ৩-৪ দিন পড়াতেন।

প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সমাজের আগ্রহী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে স্কুলটি পরিচালিত হতো। এখানে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সার্বিক সহযোগিতার পাশাপাশি ‘উড় ংড়সবঃযরহম ভড়ঁহফধঃরড়হ’ সহায়তা করে। তাদের সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে ফুটপাত, বস্তি, চর অঞ্চল ও উপকূলের শিশুদের শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি তাদের সমাজের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠান। সেই থেকে এখন পর্যন্ত গণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে স্কুলটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যেক শাখার শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করেছে।

একে একে চারটি শাখা

বর্তমানে ‘অ আ ক খ স্কুল’-এর চারটি শাখা রয়েছে। শাখাগুলো হলো সুন্দরবন, সাভার, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া। এই চারটি শাখায় প্রায় চারশর বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। যার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্কুলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা ও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সার্বিক সহযোগিতা করে থাকেন। শিশুদের পড়াশোনার জন্য খাতা-কলম, বই ও স্কুল ব্যাগ, স্কুল ড্রেসের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রতি বছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সফর, শীতবস্ত্র বিতরণ, মৌসুমি ফল উৎসব, ইফতার মাহফিল, গরিব শিশুদের মধ্যে কোরবানির মাংস বিতরণসহ বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের আয়োজন করে থাকে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি হাতে কলমের শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে।

এই স্কুলের মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বর্তমানে দেশের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা। তাদের এই অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে, উপযুক্ত সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরাও নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।

অ আ ক খ স্কুলের পরিচালক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘অ আ ক খ স্কুলের মূল লক্ষ্য হলো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা এবং তাদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিশুরই শিক্ষার অধিকার রয়েছে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিশু যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই আমাদের এই উদ্যোগ। সমাজের সবার সহযোগিতা পেলে আমরা আরও বেশি শিশুর কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছ দিতে পারব।’

দেওয়া হয় নৈতিক শিক্ষা

শিশুদের পাঠ্যবইয়ের শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিশুদের মধ্যে বাস্তবধর্মী শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সুনাগরিক ও ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। তাদের এই উদ্যোগ সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে।

অ আ ক খ স্কুলের সুন্দরবন শাখার প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমাদের স্কুলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে আনন্দময় পরিবেশে শিশুদের পাঠদান করা হয়, যাতে তারা আনন্দের সঙ্গে সহজভাবে বিষয়গুলো বুঝতে পারে। পাশাপাশি, হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে তাদের বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়।

শিশুদের শিক্ষার পথকে আরও সহজ ও বাধামুক্ত করতে স্কুলের পক্ষ থেকে খাতা, কলম, স্কুল ড্রেসসহ পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিশু যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয় এবং প্রতিটি শিশু যেন সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পায়।’

স্বস্তি পেলেন অভিভাবকরা

অ আ ক খ স্কুলের কার্যক্রমে স্বস্তি পেয়েছেন অভিভাবকরা। তাদের মূল সমস্যা ছিল অর্থের। এই অর্থাভাবেই তারা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারছিলেন না। কারণ শুধু বিদ্যালয়ে পাঠানোই যথেষ্ট না। প্রয়োজন বই, খাতা, কলম, ব্যাগ, পোশাক এবং খাবার। কিন্তু স্কুল থেকে বই, খাতা পোশাক প্রভৃতি শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করায় অভিভাবকদের চিন্তা অনেকাংশে কমেছে। তারা এখন শিশুদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছেন। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে স্কুলটির কার্যক্রম সম্পর্কে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। তারা জানান, তাদের আয় দিয়ে সন্তানদের পড়ালেখা করানো সম্ভব হতো না। তারা নানা কারণে

সন্তানদের পড়ালেখার খোঁজ নিতে হয়তো পারেন না কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের থেকেও শিক্ষকদের চিন্তা যেন বেশি। ছেলেমেয়ে স্কুলে না গেলে শিক্ষকরা খোঁজখবর নেন। প্রয়োজনে বাড়িতে গিয়ে দেখা করে আসেন। অ আ ক খ স্কুল তাদের সন্তানদের জন্য পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত। তাদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুরা শিক্ষিত হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে এবং একদিন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

সুবিধাবঞ্চিত ও অনগ্রসর শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের মুখে হাসি ফোটানোর এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে চান গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রত্যাশা, ‘অ আ ক খ স্কুল’-এর মাধ্যমে আরও বেশি শিশু শিক্ষার সুযোগ পাবে, স্বপ্ন দেখতে শিখবে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার পথে এগিয়ে যাবে।

শিক্ষার্থী, সপ্তম সেমিস্টার, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত