লাল্টুর খোঁজে

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫৬ এএম

আফতাবনগরে বালু নদীর তীরে যাব যাব করে অনেক দিন যাওয়া হয় না। এ সময়টায় প্রকৃতি যেন ওখানকার খালি প্লটগুলোকে কাশফুলে শে^তশুভ্র করে সাজিয়ে রেখেছে। এই শুভ্রতার মধ্যে আলতা রঙের এক দুর্লভ পাখির খোঁজে এখানে এসেছি। শরতে ওরা এখানে আসে বংশবৃদ্ধির জন্য। ঠোঁট দিয়ে কাশফুল কেটে তা ঘাসের সঙ্গে জুড়ে তুলোট বাসা বানিয়ে ছানা তোলে। ঘাসবীজ ও কাশবীজে ক্ষুধা মিটায়। প্রতিবারের মতো এবারও কাশফুলে ওদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পক্ষী আলোকচিত্রীদের আনাগোনাও। শরৎ শেষ হয়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও কাশ কাটা শুরু হয়ে গেছে।

২৪ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রকৃতিবিদ ও আলোকচিত্রী ক্যাপ্টেন কাওসার মোস্তফাকে নিয়ে হাজির হলাম সেই কাশফুলের প্রাকৃতিক বাগানে। আমরা বোধহয় একটু দেরিই করে ফেলেছি। সাড়ে ৫টায় সূর্য অস্ত যায়। হাতে মাত্র এক ঘণ্টা সময়। এরই মধ্যে আলো পড়ে গেছে। প্রিন্স পাল জয় ও তামিম চৌধুরীসহ তিন-চারজন পক্ষী আলোকচিত্রীর সঙ্গে দেখা। বললেন ইতিমধ্যেই লাল্টুরা কয়েক বার এসেছিল। দুপুর ১টায় অন্তত ৫০ জোড়া এসেছিল। শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

‘কাশবাগানে ছবি তোলার জন্য মানুষের আনাগোনাও বেড়ে যাচ্ছে। পাখিগুলো দ্রুত আসলেই ভালো হতো’ এ কথা যখন ভাবছি তখনই তামিম বললেন ‘স্যার, এদিকে আসুন, ওরা এসেছে।’ তখন বিকেল পৌনে ৫টা।

দু-তিনটি স্ত্রী লাল্টু এলো। দ্রুত ওদের ছবি তুললাম, ভিডিও করলাম। কিন্তু আসল পুরুষ লাল্টুগুলো এলো বিকেল ৫টার পর। ৪৫ মিনিটের মধ্যে চার থেকে পাঁচ বার এলো ওরা, তবে পাঁচ থেকে ছয় জোড়ার বেশি নয়। এই মৌসুমে ওদের ছবি তুলতে পেরে ভালো লাগল।

কাশফুলের এই লাল্টুগুলো কারা? ওরা এদেশের আবাসিক পাখি লাল মুনিয়া। রাঙা মুনিয়া, আলতা মুনিয়া বা সোনামুনে নামেও পরিচিত। তবে পক্ষী আলোকচিত্রীরা এদের আদর করে লাল্টু নামেই ডাকেন। ইংরেজি নাম জবফ/ইড়সনধু আধফধাধঃ, আধফধাধঃ, জবফ গঁহরধ/ডধীনরষষ, ওহফরধহ ঝঃৎধনিবৎৎু, ঝঃৎধনিবৎৎু/ঞরমবৎ ঋরহপয ও ঝপধৎষবঃ অসধহফধাধ। বৈজ্ঞানিক নাম অসধহফধাধ ধসধহফধাধ। ওরা মূলত বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও গ্রীষ্মম-লীয় এশিয়ার আবাসিক পাখি।

লাল মুনিয়া লম্বায় ১০ সেন্টিমিটার। ওজনে ৯ গ্রাম। প্রজনন মৌসুম ছাড়া অন্য সময় স্ত্রী-পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম। কিন্তু প্রজননকালে পুরুষের পুরো দেহের পালক আলতা লাল রঙে রাঙিয়ে যায়। মাথা-ঘাড় বাদে এই লালের ওপর থাকে সাদা সাদা ফোঁটা, বিশেষত ডানা ও পেটে। লাল আভাসহ মাথার চাঁদি গাঢ় জলপাই-বাদামি। ঘাড়ের পেছন ও পিঠ লালচে-বাদামি। ডানা গাঢ় লালচে-বাদামি। লেজ খাটো ও গাঢ় কালচে-বাদামি যার আগা গাঢ় বাদামি। চোখ টকটকে লাল, চোখের নিচে সাদা টান। খাটো, মজবুত ও ত্রিকোনাকার ঠোঁটের রঙ প্রবাল লাল। পা ও পায়ের পাতা গোলাপি। নখ কালচে-বাদামি। স্ত্রী ও প্রজননহীন পুরুষের মাথা, পিঠ ও ডানার ওপরটা বাদামি। ডানার ওপর কিছু সাদা ফোঁটা। কোমড় গাঢ় লাল। গলা-বুক-পেট সাদাটে। তলপেট হালকা হলদে-সাদা। লেজ কালচে-বাদামি। ঠোঁট লাল, ওপরের ঠোঁটের ওপরটায় কালচে ভাব থাকে। চোখ লালচে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা হালকা গোলাপি বা বাদামি। ছানাগুলোর পালক বাদামি। ডানায় হালকা হলদে লম্বা দাগ। লেজ কালচে। ঠোঁট হলদে, ঠোঁটের গোড়া গোলাপি। পা ও পায়ের পাতা হালকা বাদামি।

যদিও দেশের প্রায় সর্বত্র দেখা মেলে, কিন্তু অন্য মুনিয়ার তুলনায় কম। বেশ নিরীহ ও ভীত পাখি। তবে চঞ্চল ও চতুরও বটে। সচরাচর ছোট ঝাঁকে ঘাসবন, জলাভূমি বা চষা ক্ষেতের লাগোয়া ঝোঁপঝাড়ে বিচরণ করে। বেশ দ্রুত ওড়ে। উড়ে এসে ঘাসঝাড়, কাশঝাড়, নলখাগড়া বা ঝাউ গাছে এমনভাবে বসে যে সহজে চোখে পড়ে না। নড়তে-চড়তে দেখা গেলেও পুরো দেহ দেখা যায় না, তাই ছবি তুলতে কষ্ট হয়। ঘাস, নলখাগড়া, হোগলাবন, কাশবন ও আখক্ষেতে বিভিন্ন প্রজাতির ঘাসের বীচি খোঁজে। এ ছাড়া ধান, কাউন, তিল, সরষে, চিনাদানা, ডাল, মটর ইত্যাদিও খায়। পোকামাকড়েও অরুচি নেই। তীব্র কণ্ঠে ‘সিপ-সিপ-সিপ--- ’ স্বরে ডাকে।

আগস্ট থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। তবে, বাসা বা ডিম-ছানা নষ্ট হলে ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে, শীতেও ডিম-ছানা তুলতে পারে। প্রজননকালে পুরুষ লাল্টু ঘাস বা নলখাগড়ার ওপর বসে মধুর স্বরে গান গায়। তার গানে স্ত্রী সাড়া দিলে জোড় বাঁধে। এরপর নলখাগড়া, হোগলাবন, ঘাসবন, উলুঘাস, কাশবন বা বাঁশবনে গোলাকৃতির বাসা বোনে। অনেক সময় তাল-খেজুরের চারার মাথায় এবং গোলগাছের মাথার ভেতরেও বাসা বানায়। সরু ঘাস-লতা-ধান পাতা দিয়ে সুন্দর, নরম ও তুলট বাসাটির ভিত্তি রচনা করে। কাশফুল দিয়ে চারপাশটা মুড়ে নেয়। বাসার ভেতরে থাকে কাশফুল বা তুলোর গদি। বাসায় ঢোকার জন্য গোপন সরু পথ বানায় যেন শত্রুরা না দেখে। বাসার উপকরণ হিসেবে যখন সরু লম্বা ঘাস-লতা বা কাশফুলের ডগা ঠোঁটে-পায়ে নিয়ে দুলতে দুলতে উড়ে যায়, তখন যেন কোনো উড়ন্ত সাপের মতো মনে হয়! স্ত্রী-পুরুষ একসঙ্গে মিলেমিশে বাসা বানায়। মুক্তার মতো সাদা ছোট ছোট চার থেকে সাতটি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দিলেও স্ত্রীই বেশি সময় ব্যয় করে। ডিম ফোঁটে ১২-১৬ দিনে। ছানারা ১৯-২৪ দিনে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, ইদানিং লাল মুনিয়াসহ অন্য মুনিয়াদেরই পোষা পাখির হাটে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে মিরপুর এক নম্বর পাখির হাটে। কিন্তু এদেশে বন্য পাখি ধরা, খাঁচায় বন্দি করা, বিক্রি করা ও পোষা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কাজেই এ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তা না হলে হয়তো একদিন লাল্টুরা প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবে।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত