অগ্নিকুন্ডে সেন্টমার্টিন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫৫ এএম

মূল ভূখন্ড থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে সাগরের মাঝে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। আট বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপের মাত্র চার বর্গকিলোমিটারেই থাকে সাড়ে ১০ হাজার মানুষ। পর্যটন মৌসুমে এ ক্ষুদ্র অংশে সাড়ে ৩ হাজার পর্যটকের সেবায় যুক্ত হয় আরও হাজার খানেক লোক। সব মিলিয়ে চার বর্গকিলোমিটারে স্থানীয় লোকজনসহ পর্যটকদের জন্য রয়েছে ২ হাজার ঘরবাড়ি এবং প্রায় ২৫০টি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ।

দ্বীপটিতে স্থায়ী শতাধিক দোকানপাট ও পাঁচ শতাধিক ঝুপড়ি দোকান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। বিশাল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নেই কোনো ফায়ার স্টেশন। ফলে অগ্নিকু-ে পরিণত হয়েছে সেন্টমার্টিন। দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এমন দাবিই করেছেন।

উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ থেকে সাগরপথে ৯ কিলোমিটার দূরে সেন্টমার্টিন। দ্বীপের একমাত্র সড়কের দুপাশ ধরেই গড়ে উঠেছে জনবসতি ও পর্যটকের আবাসস্থল। উত্তরপাড়া, মাঝের পাড়া, দক্ষিণপাড়া ও কোনাপাড়াসহ আশপাশের মাত্র চার বর্গকিলোমিটারে জনবসতি রয়েছে। দ্বীপের জনবসতির ঘনত্ব দেশের মূল ভূখন্ডের দ্বিগুণেরও বেশি। 

দ্বীপের স্থানীয়দের ২ হাজার ঘরবাড়ির সঙ্গে রয়েছে আড়াইশ হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রিসোর্ট। এর মধ্যে ১০-১২টি বহুতল ভবনের সঙ্গে শতাধিক একতলা ভবন রয়েছে। এ ছাড়া পর্যটকদের জন্য রয়েছে ছয় শতাধিক দোকানপাট এবং প্রায় আড়াইশ রেস্তোরাঁ। দ্বীপে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, কোস্ট গার্ড ও বিজিবি অফিস, পুলিশ ক্যাম্প, আবহাওয়া অফিস ও  হাসপাতাল থাকলেও নেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।

দ্বীপের আবাসিক হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁর ফায়ার লাইসেন্স নেই। বহুতল ভবন নির্মাণেও কেউ সংস্থাটি থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নেয়নি। সরেজমিন দ্বীপ পরিদর্শনে দেখা গেছে, দ্বীপের উত্তরপ্রান্তে ট্রলার ও জাহাঙ্গ নোঙরের জন্য রয়েছে বিআইডব্লিউটিএর জেটিঘাট। রয়েছে রুপালি বালুর চরে মাছ শুকানোর মাচা। এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মাছ বহনের ঠেলাগাড়ি। জেটি থেকে দক্ষিণে বিআইডব্লিউটিএ ও কাস্টমস অফিস। জেটি পেরিয়ে দক্ষিণমুখী সড়কের প্রবেশ মুখে ভ্যান স্ট্যান্ড, ভাসমান হকার ও ডাব বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। ৮-১০ ফুট সড়কের কোলঘেঁষে পূর্ব ও পশ্চিম পাশে শুধু দোকান। সড়কের প্রায় ৭০০ মিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে বাজার। এখানে শামুক ঝিনুক, জুতা, কাপড়, প্রসাধনীর দোকান আর রয়েছে অসংখ্য রেস্তোরাঁ। বাজারের পূর্ব পাশে সেন্টমার্টিন জামে মসজিদ, নুরানি মাদ্রাসা ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পশ্চিম পাশে রয়েছে সারিবদ্ধ শুঁটকি, বার্মিজ পণ্য ও ঝিনুকের দোকান। এ লাইনেই আল-আরাফাত, কেয়াবন ও বাংলা হোটেলসহ নানা নামের রেস্তোরাঁ রয়েছে। রাস্তার ওপরেই গ্যাসের চুলায় রান্না হয়।

এখান থেকে দক্ষিণে এগুতেই পশ্চিমে ২০ শয্যার হাসপাতাল কমপ্লেক্স এবং পূর্ব পাশে রয়েছে একাধিক রিসোর্ট। বিপরীত দিকে বিএন ইসলামিক হাই স্কুল। এ স্কুলের দেয়াল ঘেঁষেই কোস্ট গার্ড স্টেশন, মেরিন পুলিশ ক্যাম্প ও বিজিবি ক্যাম্প। এ নিরাপত্তাজোনের বিপরীতে পূর্ব পাশে পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার জন্য একাধিক রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এ এলাকা পেরোলেই দ্বীপের সবচেয়ে সরু অংশ ‘গলাচিপা’।  এ বাঁকটিতে সড়কের দুপাশেই সমুদ্রের নীল পানি খুব কাছ থেকে দেখা যায়। সংলগ্ন সৈকতজুড়ে জেলেদের মাছ শুকানোর মাচা।

গলাচিপা পেরিয়ে দক্ষিণ পাড়ায় ঢুকতেই পূর্ব পাশে রয়েছে রিসোর্ট। এরপর নারিকেল বাগান ও ফসলি জমির মাঝখান দিয়ে সড়কের শেষ প্রান্তের পশ্চিম পাশে আবহাওয়া অফিস, সাইক্লোন শেল্টার ও বাতিঘর। বাতিঘরের পশ্চিমে একাধিক রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। সবশেষে, পাকা সড়কের একদম শেষে পূর্ব পাশে রিসোর্ট ও কিছু স্থানীয় দোকান। এরপর মূল সড়কের সমাপ্তি ঘটলেও এর আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ।

দ্বীপের অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা ও  ঘনবসতি যে কতটা ভয়াবহতার কারণ হতে পারে তার প্রমাণ মিলেছে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ভোরে। সেদিন গলাচিপার একটি রিসোর্টের মাল্টিপ্লাগে শর্টসার্কিট হয়ে আগুন লেগে মুহূর্তেই ২৬টি কক্ষ পুড়ে ছাই হয়। তবু টনক নড়েনি ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের।

এ দ্বীপে কোনো হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর ফায়ার লাইসেন্স নেই। ভবনগুলোতে ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফায়ার এক্সটিংগুইশার, স্মোক ডিটেক্টর নেই। আগুন লাগলে প্রাথমিক প্রতিরোধের জন্য বালু বা পানির বালতি, ফায়ার ব্লাঙ্কেট নেই। দুর্ঘটনা ঘটলে আহতদের চিকিৎসার জন্য সাধারণ প্রাথমিক চিকিৎসার কিটও (ফার্স্ট এইড) রাখেনি অধিকাংশ কর্তৃপক্ষ।

সেন্টমার্টিন দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য হাবিব উল্লাহ খান বলেন, চার বর্গকিলোমিটার জনবসতির এ দ্বীপে কোনো ফায়ার স্টেশন নেই। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। যারা রেখেছে তাও অপ্রতুল।  আমরা চরম আতঙ্কে রয়েছি। কোনো কারণে আগুন লাগলেই সব শেষ।

তিনি বলেন, এ দ্বীপ নিয়ে সরকার, জাহাজমালিক ও হোটেল মালিকরা হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে। কিন্তু দ্বীপকে বাঁচাতে তাদের কোনো চিন্তা নেই ।

সেন্টমার্টিন হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য আবদুর রহমান বলেন, দ্বীপ দিনে দিনে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটলে এর সব পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ‘তবে আগে ব্যবসায়ীরা সচেতন না থাকলেও এখন সচেতন হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। আমরা সবাই মিলে বৈঠক করে দ্বীপকে বাঁচাতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা শতভাগ নিশ্চিত করতে কাজ করব।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে আমরা ফায়ার সার্ভিস চেয়েছি। তবে আদায় করতে পারিনি। এই মৌসুমে আমরা দ্বীপের জন্য ফায়ার স্টেশনের ব্যবস্থা করতে পারব বলে আশা করি।’  

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম (ভারপ্রাাপ্ত) বলেন, ‘মাত্র চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সাড়ে ১০ হাজার বাসিন্দার সঙ্গে প্রতিদিন আরও সাড়ে ৩ হাজার মানুষের আগমন ঝুঁকি শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। টেকনাফ থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এখানে আগুন নেভানো ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার টেকনাফে মাসিক সমন্বয় সভা ছিল। সেখানে পাঁচটি বাজারের জন্য ফায়ার স্টেশনের প্রস্তাব রাখা হয়। তখন আমিও দ্রুত আমার ইউনিয়নে একটি স্টেশন দেওয়ার দাবি তুলি।’

জানা গেছে, সেন্টমার্টিনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে করণীয় নির্ধারণে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স একটি কমিটি করেছে। কমিটি আজ সোমবার দ্বীপ পরিদর্শন করবে। এ  বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের পরিদর্শক (লাইসেন্স) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বীপের দুটি প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স ছিল; তবে তা নবায়ন করা হয়নি। দ্বীপের অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে একটি চার সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। তবে তারা কবে পরিদর্শন করবে আমার জানা নেই।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের ফায়ারম্যান মো. গুফরান চৌধুরী বলেন, ‘দ্বীপটির অগ্নিঝুঁকি বিবেচনা করে ২০২৩ সালে আমরা সেখানে একটি ‘বি’ শ্রেণির স্টেশনের আবেদন করেছিলাম। কিন্তু সরকার পতনসহ নানা কারণে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) তৌফিকুল ইসলাম ভুইয়া বলেন,  ‘বিরূপ প্রকৃতিসহ নানা কারণে আমরা অনেক জায়গায় লাইসেন্স প্রদান করি না। আমাদের জরিমানা করা কিংবা স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার নেই। আমরা শুধু পরিদর্শন করে প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাই।’

তিনি বলেন, ‘সেন্টমার্টিনসহ কক্সবাজার জেলায় ফায়ার লাইসেন্স ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা দেখতে ঢাকা থেকে চারটি টিম পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি টিমে থাকবে একজন উপ-সহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে চারজন সদস্য। সেন্টমার্টিনের টিমটি আজ থেকে দ্বীপে অবস্থান করবে।’ তিনি বলেন, দ্বীপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা আমাদের আগের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে আবারও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করব।’

কক্সবাজারের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে প্রশাসন আপস করত হোটেল মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠকে জানানো হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রেখেই দ্বীপে পর্যটনসেবা দিতে হবে। উপজেলা প্রশাসন এটি কঠোরভাবে তদারকি করবে।’  ফায়ার সার্ভিস  না থাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একটি ইউনিয়নে সচারচর ফায়ার সার্ভিস থাকে না। তবে দ্বীপটি মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে।’ স্থগিত হওয়া ফায়ার স্টেশন প্রকল্প  সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা বলব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত