দলগুলোর অস্বচ্ছতায় অবৈধ অর্থায়ন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫৯ এএম

রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে অবৈধ অর্থায়ন হচ্ছে বলে মনে করছে দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের তথ্যের কথা জানিয়ে টিআইবি বলছে মাঠপর্যায়ে একটি নির্বাচনী আসনে প্রার্থীর ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের তথ্য দলগুলোর নেতাদের কাছ থেকেই পেয়েছে সংস্থাটি।

এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘যেখানে মাঠপর্যায়ে নির্বাচনে একজন প্রার্থী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন, সেখানে নির্বাচন কমিশনে পুরো দল মিলে বছরে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। দলগুলোর এই আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে পর্দার আড়ালে বা টেবিলের নিচে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং অবৈধ অর্থায়নের পথ সুগম হচ্ছে।’

গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় সংস্থাটি। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ সময় জানানো হয়, দলীয় কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার চরম ঘাটতি রয়েছে। দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১৬টি দলের নিয়মিত সম্মেলন (কাউন্সিল) হয় না।

মনোনয়ন বাণিজ্যের সুস্পষ্ট অভিযোগ : সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের প্রভাবশালী তিনটি দলের বিরুদ্ধে সরাসরি মনোনয়ন বাণিজ্যের সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। দল তিনটি হলো বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ)।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দলগুলো প্রকাশ্যে মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করলেও এটি যে মাঠপর্যায়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত, তা দলীয় প্রতিনিধিদের বয়ানেই উঠে এসেছে।’ তিনি বলেন, মনোনয়ন বাণিজ্য সম্পর্কে যে তথ্য গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রাপ্ত। তিনি বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের নির্বাচনে কোনো কোনো প্রার্থীর ৫০ কোটি টাকার মতো ব্যয়ের তথ্য দলগুলোর নিজস্ব পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমে মনোনয়ন বাণিজ্যের যে অভিযোগ প্রকাশিত হয়, দলগুলোর নিজস্ব ভাষ্যেই তার সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত হচ্ছে।’

জাতীয় সম্মেলন করে না ১৬টি রাজনৈতিক দল : গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয় নিয়মিত জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে না দেশের ১৬টি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে গত ১০ বছরের বেশি সময় জাতীয় সম্মেলন করেনি প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। এ ছাড়া ১৮টি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার কোনো শর্ত নেই। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গবেষণার জন্য ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে টিআইবি। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত ও পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। ৩২টি দলের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে বিশ্লেষণ করেছে টিআইবি। বাকি ১০টি দলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা তথ্য দেয়নি। গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয় দুই পর্যায়ে ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। রাজনৈতিক দলগুলোর তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও  দুর্বলতা রয়েছে উল্লেখ করে জানানো হয়, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৪টির ওয়েবসাইট থাকলেও সক্রিয় রয়েছে মাত্র ১৬টির।

প্রতিবেদনে বলা হয় শুধু সম্মেলন আয়োজনেই নয়, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। এমনকি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় সদস্য বা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া ঠেকানোর কার্যকর বিধানও নেই অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে।

এতে বলা হয় দলগুলোর অভ্যন্তরে নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়া, তৃণমূল পর্যায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ না থাকা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব বাছাইয়ের অনীহার কারণে পরিবারতন্ত্র ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক কর্তৃত্বপরায়ণতা ক্রমাগত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। দেশে বর্তমানে অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে নির্ধারিত হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের প্রবণতা বেশি। বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৮ থেকে ৩২ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক বা একাধিক মামলা ছিল।

১৩ বছরে সহিংসতায় নিহত ৭৪৬ জন : সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৩ বছর আট মাসে (২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত) রাজনৈতিক সহিংসতার ৪ হাজার ২৮০টি ঘটনায় ৭৪৬ জনের প্রাণ গেছে। আর সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৬ হাজার ৩৫১ জন ব্যক্তি। ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সংখ্যা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ৪২৮টি ঘটনায় ৪২৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৭ হাজার ৮৬০ জন। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘর্ষের ১ হাজার ৯২৬টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১৮ জন। আহত হয়েছেন ১৮ হাজার ৪৯১ জন। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৬ জন। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৫৯ জন। রাজনৈতিক সহিংসতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে।

টিআইবির মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংঘাতের পাশাপাশি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলও সহিংসতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। আর এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের।

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিজনেস মডেল’ ইফতেখারুজ্জামান : দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও কালো টাকার কারণে অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা দলীয় অবস্থান একটি ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত হচ্ছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। সেখানে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্ষমতার রাজনীতির কারণে দলীয় কোন্দল, অন্তর্দ্বন্দ্ব, এমনকি মানুষের প্রাণ দিতে হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সেটি আরও বেশি বিকশিত হচ্ছে এবং এটা উদ্বেগজনক।’

তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকা এবং জবাবদিহির ঘাটতির ফলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার দেখা যায়। এর ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে।’

রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ অর্থের ব্যবস্থাপনা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিনির্ভর। ফলে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো থাকা একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয় পরিচালনা ও কর্মসূচি পালন করলে বছরে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হলে সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে দল পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয়ের বড় পার্থক্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ অর্থের ব্যবস্থাপনা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিনির্ভর। ফলে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে।’

সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির উপদেষ্টা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত