অবশেষে পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) খরা কাটছে। দীর্ঘ ২ বছরেরও বেশি সময় পর একসঙ্গে ছয়টি কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে ৬১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা উত্তোলনের লক্ষ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদন জমা দিয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে দোলাচলে রয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীরা। বাজারে নতুন শেয়ার আসার খবর তাদের জন্য স্বস্তি নাকি আবারও হতাশার কারণ হবে, তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন তারা। কারণ, গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যত কোম্পানি বাজারে এসেছে, তার বেশির ভাগই দুর্বল, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে আগ্রহী ছয় প্রতিষ্ঠান হলো কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি, পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং পিএলসি, স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেড, অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স পিএলসি, ডজিকন টেকনোলজিস পিএলসি ও প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে গত অক্টোবরে এসব আবেদন জমা পড়ে।
জানা গেছে, ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০০ কোটি অর্থ সংগ্রহের আবেদন করেছে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা করা প্রতিষ্ঠানটির প্রসপেক্টাসে শেয়ারপ্রতি নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪২ টাকা। তবে এই মূল্য এখনো চূড়ান্ত নয়। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
ডিবিএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং এক কোটি ৯৫ লাখ শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৭৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। প্রতিটি শেয়ারের প্রস্তাবিত মূল্য ৪০ টাকা, যার মধ্যে ৩০ টাকা প্রিমিয়াম। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছে শান্তা ইকুইটি লিমিটেড। অন্যদিকে, স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেডের লক্ষ্য ৫৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিটি শেয়ার ১৩ টাকা দরে ইস্যু করতে চায়। এর মধ্যে ৩ টাকা প্রিমিয়াম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড।
প্রযুক্তি খাতের ডজিকন টেকনোলজিস পিএলসি ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। একইভাবে প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স দেড় কোটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা তুলতে চায়। প্রতিষ্ঠান দুটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। এ ছাড়া আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স ৩৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রস্তাব দিয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার ইস্যু করতে চায়, যার প্রতিটির মূল্য ১০ টাকা। এ কোম্পানির ইস্যু ব্যবস্থাপক ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। পার্কওয়ে প্যাকেজিং প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ৪০ টাকা, স্ক্যানডেক্স ১৩ টাকা এবং অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রতিটি শেয়ার ১০ টাকা দরে ইস্যুর প্রস্তাব দিয়েছে।
বর্তমান নিয়ম অনুসারে, কোনো কোম্পানির হিসাব বছর শেষ হওয়ার পরবর্তী ১২০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে আইপিও আবেদন করতে হয়। জুনে হিসাব বছর শেষ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ২৮ অক্টোবর ছিল আবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত শেষ তারিখ। শেষ দিনে ছয়টি প্রতিষ্ঠানই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তাদের আবেদন জমা দেয়। আবেদনগুলো পাওয়ার পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে বিএসইসিকে সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের শেষ দিকে বাজারে আসতে পারে কোম্পানিগুলো।
এ বিষয়ে ঢাকা স্টক ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে নতুন কোম্পানি আসবে, এটা ভালো খবর। তবে কোম্পানি আসতে হবে মৌলভিত্তিসম্পন্ন। বিনিয়োগকারীরা নতুন নতুন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে ভালোবাসেন। আমাদের প্রত্যাশা, পুঁজিবাজারে এমন কোম্পানির শেয়ার আসুক, যেখানে বিনিয়োগ স্বস্তির হবে।’
বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূর্বে অনেক কোম্পানিতে অর্থ লগ্নি করে বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তাই অনেকেই এখন নতুন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে ভয় পান। আমাদের প্রত্যাশা, বিএসইসি নিশ্চয়ই আগের সেই ভুল করবে না। কর্তৃপক্ষ যদি দেখে-শুনে যোগ্য কোম্পানিকে বাজারে আসার অনুমতি দেয়, তবে বিনিয়োগকারীরা ঠকবেন না এবং বাজারও আরও শক্তিশালী হবে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোনো আইপিও তালিকাভুক্ত হয়নি। রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর পূর্ববর্তী সময়ে জমা হওয়া আইপিও আবেদনগুলো বাতিল কিংবা ফেরত পাঠানো হয়। তবে বাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর করতে বর্তমানে নতুন কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করার পাশাপাশি আইপিও-সংক্রান্ত বিধিমালায় কিছু ছাড় এবং শর্ত সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য বাজারে ভালো কোম্পানি আনা। তবে একটি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয় স্টক মার্কেটে। ফলে সবার আগে বিনিয়োগকারীদের ভালোমানের কোম্পানি পছন্দ করতে হবে। পরবর্তীতে আমরা কোম্পানির খুঁটিনাটি সব বিষয় দেখব। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা কী, এর মালিক কারা, তাদের হিস্ট্রিসহ আরও অনেক বিষয়। সব ঠিক থাকলে আশা করি ভালোমানের কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসবে।
সাধারণভাবে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পেলে কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি মূলধন পায়। এর ফলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পের সম্প্রসারণ, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি ভালো আর্থিক ভিত্তি ও সম্ভাবনাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বাজারে তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের সামনে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হয়। এতে বাজারের পরিধি ও গভীরতা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।