কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারছে না বাংলাদেশ। পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অভাব, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং দক্ষতার ঘাটতিতে জনসংখ্যাগত সুবিধার বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট কর্মীর ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এমনকি স্নাতক ডিগ্রিধারী ৪৪ শতাংশেরও কাজের ক্ষেত্র অনানুষ্ঠানিক। অন্যদিকে, ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণপ্রধান সমাজে পরিণত হতে পারে। ফলে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বর্তমান সুবিধা কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া : ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরিন আহমেদ মাহবুবের সঞ্চালনায় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ বিষয়ে একটি প্যানেল আলোচনা হয়। এতে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিসহ অর্থনীতি বিশ্লেষকরা আলোচনা করেন। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেসমের সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী,
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ১১৭ কোটি কর্মক্ষম মানুষ রয়েছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেই সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো প্রায় দুই দশক সময় রয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে জনমিতিক সুবিধা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করা কঠিন হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে মূল কর্মক্ষম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ক্রমবর্ধমান হার দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ অবদান রেখেছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। তবে জনসংখ্যার এই ইতিবাচক অবদান ধীরে ধীরে কমে আসবে। ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জনমিতিক পরিবর্তনের অবদান কমে শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের ঘাটতি জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমিত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে ঘাটতির কারণে দেশটি অনুকূল বয়স কাঠামোর পূর্ণ সুবিধা নিতে পারছে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যা মোট কর্মীর প্রায় ৮৪ শতাংশ। এমনকি স্নাতক ডিগ্রিধারীদের প্রায় ৪৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতিও ধীর। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে কর্মী ছাঁটাই করছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যবসায়িক নিয়মনীতি সহজ করা এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা দূর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বর্তমান জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রবীণ জনগোষ্ঠীকেও অর্থনীতির অংশ হিসেবে ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করছে এখন কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তার ওপর। উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের বাধা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা জোরদার ও বৃদ্ধ বয়সে আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি নিতে হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, গত প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনা হলেও তা মূলত তরুণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। কিন্তু তরুণ বয়স পেরিয়ে মানুষ যখন বার্ধক্যে উপনীত হবে, তখন কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি এ ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা। বর্তমান জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বয়োবৃদ্ধ সমাজের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু মানুষকে কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করলেই হবে না, তাদের চাকরি পেতে হবে এবং অর্থবহ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে হবে। এ জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে। বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মডেলে দুটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি এবং প্রবৃদ্ধির সুফল দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচনে রূপ নেয়নি। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হলেও দারিদ্র্য কমার গতি ছিল ধীর, একইভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও ছিল মন্থর।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর জন্য শিশু থেকে প্রবীণ পর্যন্ত সব বয়সী মানুষের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জীবনচক্রভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। সরকার ইতিমধ্যে এ ধরনের নীতি গ্রহণ করেছে। শুধু প্রবীণদের জন্য নয়, শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একজন নারীর গর্ভধারণ থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে এসব কর্মসূচিতে প্রায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর বড় অংশ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অগ্রাধিকার তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নকে সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একজন নারীকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করা গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। এ জন্য দরিদ্র, অতিদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তৃণমূল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একক মা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রচলিত পারিবারিক কাঠামোর বাইরে থাকা মানুষদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, সক্ষমতা ও দুর্বলতার দিকগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।