 অবৈধ বালু উত্তোলন

আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

উপকূল কিংবা নদ-নদীর বালু হলো রক্ত-মাংসের মতো। অনিয়ন্ত্রিতভাবে তা তুলে  অথবা ব্যক্তি কিংবা মহল বিশেষের লাভের-লোভের গ্রাসে মূলত উপকূল-নদ-নদীর হৃৎপিণ্ডটাই উপড়ে ফেলছে। প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর কষাঘাত আমাদের দেশে নতুন নয় এবং নিয়মনীতি উপেক্ষা-অবজ্ঞা করে হীনস্বার্থবাদী বলবানদের আগ্রাসন চলছেই। এর বিরূপ প্রভাব কতটা বহুমাত্রিক হয়ে দাঁড়িয়েছে এরই ফের নজির মিলেছে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ৬ নভেম্বর ‘বালু উত্তোলনে বিপন্ন উপকূল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগরে ভাসছে বাল্কহেড ও ড্রেজার। উপকূলে বসানো হয়েছে বুস্টার মেশিন। দিন-রাত সমানে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। এর ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের মোহনা ও পর্যটনকেন্দ্র পারকি সমুদ্রসৈকত তো বটেই, হুমকিতে পড়েছে ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এলাকাও। যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে, তাতে পারকি সৈকত ও কোটি টাকার ব্যয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ ছাড়াও ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি হতে পারে আরও ভয়াবহ।

নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের মোহনা ও পর্যটনকেন্দ্র পারকি সমুদ্রসৈকতের এই আত্মঘাতী কর্মকান্ড কোনো খন্ডচিত্র নয়, বরং দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা ও নদ-নদীতে পড়েছে বলবানদের এমন থাবা। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, কর্ণফুলী নদী থেকে অভিনব কায়দায় বালু তুলছে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের জন্য। দেশ রূপান্তরের কাছে তাদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই কর্ণফুলী নদীর নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু উত্তোলন এবং বাল্কহেড থেকে তা খালাস করা হচ্ছে। আর আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভাষ্য, ‘পারকি সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। কারা বালু উত্তোলন করছে, খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে। জিজ্ঞাস্য হলো, অনুমোদনহীন এমন কর্মকাণ্ড চলছে কীভাবে? যে বিষয়টি সাধারণ মানুষের সামনে দৃশ্যমান প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের অগোচরে তা থাকে কী করে! তাৎক্ষণিক প্রতিবিধান করা হয়নি কেন? প্রশাসনের গৎ বাঁধা ভাষ্য ‘হবে’, ‘হচ্ছে’র জটাজাল কি কখনই ছিন্ন হবে না? আমরা আগে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সদুত্তর চাই। সমান্তরালে চাই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের ‘উটপাখি নীতি’র ব্যাখ্যাও। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে কোনো সংকট, অনিয়ম বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার পর দায়িত্বশীল কর্র্তৃপক্ষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা স্বীকারই করে না! রহস্যজনকভাবে নীরব থেকে অভিযুক্তের কদাচার এড়ানোর কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধামাচাপা দেওয়ারও নজির কম নেই। উপকূলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যর সত্যাসত্য যাচাইক্রমে কালক্ষেপণ না করে আইনানুগ প্রতিবিধান করতে হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দায়িত্বশীল মহলের অসাধুদের অন্য কোনো সমীকরণ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখে প্রতিকার করা বাঞ্ছনীয়। আমরা জানি, বালুমহাল ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের একক কর্র্তৃপক্ষ ভূমি মন্ত্রণালয়ের। বালু বা মাটি উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনার মূল নীতিমালা পরিচালিত হয় ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ এবং সর্বশেষ প্রকাশিত ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বহুলাংশেই কেন তা প্রতিপালিত হচ্ছে না এর ব্যাখ্যার দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বলে আমরা মনে করি।

অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু উপকূলীয় এলাকা কিংবা নদীভাঙন সৃষ্টি করে জনপদই তলিয়ে নিচ্ছে না, জীবনও কেড়ে নিচ্ছে। গত বছর কক্সবাজার জেলার মাতামুহুরী নদীতে এমন মর্মন্তুদ ঘটনাই ঘটেছে। সেখানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তৈরি হওয়া গর্তে পড়ে একই পরিবারের দুই শিশু প্রাণ হারায়। প্রশ্ন হচ্ছে, অবৈধ বালু উত্তোলনকারী চক্রগুলো কি অপকর্ম চালিয়ে যাবে? প্রাণহানির দায় কি তাদের নিতে হবে না? উপকূল ও নদ-নদীর সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বদা তৎপর থাকতে হবে। অবৈধভাবে ও অবাধে বালু তোলার কোনো সুযোগ নেই। বালুখেকো চক্রগুলোর বেআইনি কর্মকাণ্ডের আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে। অপতৎপরতাকারী কেউ যেন অনুকম্পায় ছাড় না পায়। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এ যেন আপ্তবাক্য হয়ে না থাকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত