যে প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, সে প্রেক্ষাপট কতটুকু বদলেছে, বা আদৌ বদলেছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে, সেদিন যে প্রেক্ষাপটে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হলে আমাদের ১৯৭৫ সালের প্রেক্ষাপট অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। সে বছর মধ্য আগস্টে এক সামরিক অভ্যুত্থানে স্বজন-পরিজনদের কয়েকজনসহ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। সে শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে বা কে হবেন তার উদ্গাতা, এটা তখন কারও ধারণায় ছিল না। রাজনৈতিক স্থবিরতা ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল তখন বাংলাদেশ। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-কোন্দল এমনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল যে, তা সামাল দেওয়ার মতো নেতৃত্বের অভাব প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছিল।
১৫ আগস্ট মুজিব সরকারের পতনের পর ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তন আনেন। চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল সফিউল্লাহকে সরিয়ে উপ-প্রধান সেনাপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেন। জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পেয়ে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠিত করার কাজে হাত দেন। কিন্তু সে সময় ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দানকারী মেজর-কর্নেলরা বঙ্গভবনে বসে রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ে খবরদারি করছিলেন। এটা সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন অফিসাররা মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে চাপ দিচ্ছিলেন ওইসব সেনা অফিসারকে সেনানিবাসে এনে চেইন অব কমান্ডে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাকের কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। এ নিয়ে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের এ বিভক্তি ও অসন্তোষের সুযোগ নিতে তৎপর হয় দুটি গ্রুপ। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। অপরটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত, জাসদের গণবাহিনীর প্রধান কর্নেল আবু তাহের। তারা সেনা বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন। কর্নেল তাহেরের গোপন সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের সংগঠিত করে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে। অন্যদিতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বিদেশি শক্তির মদদে রাষ্ট্রক্ষমতা কবজায় নেওয়ার অভিপ্রায়ে ৩ নভেম্বর সেনা অভ্যুত্থান ঘটান। তিনি সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে জোরপূর্বক ইস্তফাদানে বাধ্য করে গৃহবন্দি করে রাখেন। খালেদ মোশাররফের এ অভ্যুত্থান সাধারণ সৈনিকরা মেনে নিতে পারেন না। তারা সংগঠিত হতে থাকেন পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য। আর এরই সুযোগ নেয় পূর্ব থেকে প্রস্তুতি নেওয়া কর্নেল তাহের-ইনু গং। তারা কথিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর ‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ সেøাগান দিয়ে অভ্যুত্থানের সূচনা করেন। শুরু হয় রক্তপাত। তারা খুঁজে খুঁজে অফিসারদের বের করে হত্যা করে ‘বিপ্লব’ সাধনে লিপ্ত হন। এদিকে খালেদ মোশাররফের ওপর ক্ষিপ্ত সৈনিকরা জিয়াকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে সেনাসদরে নিয়ে আসেন। জিয়া পুনরায় সেনাপ্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হন। খালেদ মোশাররফ তখন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে দর কষাকষিতে ব্যস্ত। ওদিকে যে সেনানিবাসে তার বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, সেটা তার গোচরে ছিল না। যখন খবর পেলেন তখন পালানো ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। পালাতে গিয়ে খালেদ মোশাররফ তার অন্যতম সঙ্গী কর্নেল এটিএম হায়দারসহ নিহত হন এবং কর্নেল শাফায়ত জামিল গুরুতর আহত হয়ে গ্রেপ্তার বরণ করেন। আর মেজর হাফিজউদ্দিন পালিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রশিক্ষণরত সেনাবাহিনী দলের কাছে আশ্রয় নেন। এভাবেই ব্যর্থ হয়ে যায় খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা। আর কর্নেল তাহেরের বিপ্লব-পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায় জেনারেল জিয়ার দূরদৃষ্টি ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে। সে ইতিহাসের বর্ণনা এ স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়।
৭ নভেম্বরকে ঘিরে দুই শক্তির ক্ষমতা দখলের মহড়ার যবনিকাপাতের পর সাধারণ সিপাহীরা সেনাপ্রধান জিয়াকে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন। অন্যদিকে ৩ নভেম্বর থেকে সারা দেশে যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি হয়েছিল, তারও অবসান ঘটে। ভোর না হতেই বিপ্লবী সৈনিকরা বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। তারা সেøাগান দেন ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’, ‘সৈনিক-জনতা ভাই ভাই’। তিন দিনের গুমোটবাঁধা পরিবেশ কেটে গিয়ে ৭ নভেম্বরের ভোরের সূর্য নতুন দিনের বার্তা নিয়ে তার আলোয় উদ্ভাসিত করে চারদিক। ঢাকার রাজপথে তখন সৈনিক-জনতার মিলনমেলা। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় মুষড়ে পড়া জাতি আবার জেগে ওঠে। মূলত এখানেই ৭ নভেম্বরের মহিমা। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে বাকশালি শাসনের অবসানকে মানুষ স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু মাত্র পৌনে তিন মাসের মাথায় খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থান তাদের হতোদ্যম করে দিয়েছিল। উপরন্তু অভ্যুত্থানের পরদিন খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশররফ ও তার মায়ের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে শেখ মুজিবের ধানম-ির বাড়িতে গমনকে দেশবাসী গ্রহণ করতে পারেনি। এ ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়ে যে, ভারতের ইন্ধন-ইঙ্গিতে খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন পুনরায় আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য। ফলে জনমত তার বিরুদ্ধে চলে যায়।
যদিও দালিলিক কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই, তারপরও জনশ্রুতি রয়েছে যে, খালেদ মোশাররফ ভারতের ইন্ধনেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তার মা ও ভাইয়ের মিছিল নিয়ে শেখ মুজিবের বাড়িতে গমন সে সন্দেহকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তবে এটা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে যে, শুধু নিজের শক্তির ওপর ভরসা করে খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুত্থানের মতো অমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে হাত দিয়েছিলেন, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। রাজনীতির অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণই মানুষের অজানা থেকে যায়। তেমনি খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানচেষ্টার পেছনের শক্তির পরিচয়ও হয়তো অজানাই থেকে যাবে। তবে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, মুজিব সরকারের অভিভাবকরূপী ভারত সরকার ১৫ আগস্টের পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারেনি। তাই যখন একটি গ্রুপ সে অভ্যুত্থানের পাল্টা আরেকটি অভ্যুত্থান করতে তৎপর হয়, তখন প্রতিবেশী দেশের সরকার তাদের সমর্থন-সহযোগিতা দিয়ে থাকতে পারে।
আজ একান্ন বছর পরেও ৭৫-এর সে প্রেক্ষাপট কি বদলেছে? এক কথায় এর ব্যাখ্যা অসম্ভব। তবে সেদিনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, বদলায়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিদেশি শক্তি ও তাদের এদেশীয় তল্পিবাহকরা তখনো যেমন চক্রান্ত করেছে, আজও তারা বসে নেই। তবে ধরন পাল্টেছে। পাল্টেছে তাদের পরিচিতিও। আগে পরিচিতি ছিল ‘সম্প্রসারণবাদী’, এখন ‘আধিপত্যবাদী শক্তি’। সে শক্তির থাবা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারে ৭ নভেম্বরের চেতনা। আর সে জন্য প্রয়োজন দেশপ্রেমিক নাগরিকদের দৃঢ় ঐক্য। প্রতিবছর ৭ নভেম্বর সে কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
লেখক : সাংবাদিক