জাতীয় ঐক্য ও শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রচিন্তা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৭ এএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশ এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটে নিমজ্জিত হয়। পরবর্তী কয়েক মাসে ধারাবাহিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চরম অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। এমন এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি পুনরায় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় ভিন্নতা থাকলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে দিনটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এর তাৎপর্য বুঝতে হলে দিনটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং জাতীয় ঐক্য, সংহতি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নেও দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত নাম। মুক্তিযুদ্ধে তার অসমসাহসী ভূমিকা, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় নির্মাণের উদ্যোগ তাকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ অবস্থান দিয়েছে। তার প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় চালুর উদ্যোগ, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারণা আজও রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শনের এসব দিক পর্যালোচনা করার মধ্য দিয়েই জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব।

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর পরিচয়ের ভিত্তি কী হবে তা নিয়ে নানা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ছিল। জিয়াউর রহমান এই প্রশ্নের উত্তরে ভাষাগত পরিচয়ের পাশাপাশি ভূখণ্ড, নাগরিকত্ব, সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল দর্শন হলো, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অধিবাসী সব নাগরিকের একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয় থাকবে। তাদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, জাতিসত্তা কিংবা সামাজিক পরিচয়ে ভিন্নতা থাকলেও রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিক অধিকার ও দায়িত্বের জায়গায় তারা সমান। এই চিন্তার মাধ্যমে তিনি বাঙালি পরিচয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের পাহাড়ি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সব নাগরিককে একটি বৃহত্তর জাতীয় কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার ধারণা সামনে আনেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা নানা সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশালব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে প্রচলিত বহুদলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমের পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দলীয় রাজনীতির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়। গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বহুত্বের পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে শুরু হয় নতুন এক অভিযাত্রা। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৭৯ সালের সংসদীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়।

জিয়াউর রহমানের উন্নয়নচিন্তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার বড় অংশ গ্রামনির্ভর। তাই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এ ছাড়া গণশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, গ্রাম সরকার এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ তার কর্মসূচির অংশ ছিল। তিনি মনে করতেন, উন্নয়ন কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া ছিল তার উন্নয়ন ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তার ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচিতে উৎপাদন বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা সম্প্রসারণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। বিশেষ করে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি ছিল তার উন্নয়ন ভাবনার একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত।  কৃষির আধুনিকায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গণমানুষের আকাক্সক্ষা ছিল একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে তা ছিল বিপরীত। স্বাধীন হয়েও বাংলাদেশ প্রায় পরাধীন হয়ে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশকে তলানিতে নিয়ে গিয়ে ঠেকায়। সৌভাগ্যক্রমে জিয়াউর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে উদ্যোগী হন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর বিস্তারের চেষ্টা করেন তিনি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে চীন, মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা দেশ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সম্প্রসারিত হয়। অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বৈদেশিক সহায়তা, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি পায়। প্রবাসী শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার নীতি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার ধারণা জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক চিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সেই ধারণা বাস্তব রূপ পেতে থাকে। ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সার্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার এই প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। যদিও সার্ক প্রতিষ্ঠার সময় তিনি জীবিত ছিলেন না, তবু এর ধারণা ও প্রাথমিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। সমকালীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জিয়াউর রহমানের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দর্শন পর্যালোচনা করা জরুরি। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিচয় প্রয়োজন, যেখানে ধর্ম, ভাষা, জাতিসত্তা ও রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্ত্বেও প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদা পাবেন। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়নকে টেকসই করতে কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে, পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও মর্যাদা বজায় রাখতে হবে। অবশ্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সেসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে রাষ্ট্রগঠনে কাজ করছে।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের সম্মিলিত শক্তির গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক সংহতির কোনো বিকল্প নেই। মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং মানুষের কল্যাণের প্রশ্নে আমাদের অভিন্ন অঙ্গীকার থাকা জরুরি। ৭ নভেম্বর আমাদের সেই বৃহত্তর ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। শহীদ জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার প্রাসঙ্গিক দিকগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, সেগুলো নিয়ে গবেষণা ও গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত রাখা এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে এ দিবসের প্রতি আমাদের অর্থবহ শ্রদ্ধা নিবেদন।

লেখক :  অধ্যাপক ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত