অ্যারিস্টটলের ভাষায় বিপ্লব বলতে কেবল সশস্ত্র অভ্যুত্থান, রক্তপাত বা সরকারের পতন বোঝায় না; বরং রাষ্ট্রে যেকোনো ধরনের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক বা ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তনই হলো বিপ্লব। আর কার্ল মার্কসের ভাষায় বিপ্লব হলো, সমাজ পরিবর্তনের একটি অবশ্যম্ভাবী ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া, যার মূল ভিত্তি হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রাম। মার্কসবাদ অনুযায়ী, বিপ্লব নিছক কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়, বরং উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং শোষিত শ্রেণি কর্র্তৃক শোষক শ্রেণির হাত থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মতে আরও যা মাইল তা হলো, সবসময়ই সমাজে দুটি বিরোধী শ্রেণি থাকে, একটি উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক (শোষক) এবং অন্যটি যারা কায়িক শ্রম দেয় (শোষিত)। এই দুই শ্রেণির স্বার্থের সংঘাত থেকেই বিপ্লবের জন্ম হয়। বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন একটি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কোনো ধরনের শ্রেণিভেদ, ব্যক্তিগত মালিকানা বা রাষ্ট্রযন্ত্র থাকবে না। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।
পুরনো রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন অর্থাৎ এই রূপান্তরই হলো আমাদের চেনা-জানা বিপ্লব। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিপ্লব কেন হয়। বিপ্লবের অনেক কারণ থাকে। সমাজে যখন অনিয়ম-দুর্নীতি-বৈষম্য-দমনপীড়ন-নির্যাতন উৎকট হয়ে পড়ে তখন বিপ্লবের কারণ পুষ্ট হতে থাকে। আমাদের অভিজ্ঞতায় বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে অন্য ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটে থাকে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লব যে ঘটেছিল এর সঙ্গে ওই কারণগুলো মিলে যায়। একনায়কতান্ত্রিক কিংবা একদলীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে ওই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটে। আমরা যদি পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে যাই তাহলে আরও পেছনে যেতে হবে। স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে জনমনে সংগতই প্রত্যাশা ছিল একটি বিকশিত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে। সেই ব্যবস্থা হবে বৈষম্যহীন, সুষম বণ্টনমূলক, আইনের শাসনের আলো ছড়াবে, মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তা হলো না, যা অনাকাক্সিক্ষত-অনভিপ্রেত।
আমরা দেখলাম অনিয়ম-লুণ্ঠন-ভীতির পরিবেশ তখন জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে থাকল। ভিন্নমত দমন, বাকস্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করাসহ হত্যার রাজনীতি চালু হতে থাকে। এমনকি ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কারচুপি ও অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগও ওঠে। ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একা ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্যে ১১ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগে যে ট্যালেন্ট রাজনীতিক ছিলেন তাদের কারচুপির আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন ছিল না। তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হলেও শাসক মহলের ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এসব অভিযোগ আমলেই নিলেন না। সরকারের অনেকেই কদাচার-অনাচারে মত্ত হয়ে পড়ার অভিযোগও পুষ্ট হলো এবং অনেক কিছু দৃশ্যমান হতে থাকল, যা বলা যায় জনবৈরী। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। যে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত দেশ-সমাজ, বিকশিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তা তারা পায়নি; সব প্রত্যাশা হোঁচট খেয়ে মাটিতে মিশে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে দুর্ভিক্ষ, অনাহারে প্রাণহানি; অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের অনেকের অপ্রত্যাশিত কর্মকা- তৈরি করে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট।
সংবিধান সংশোধন (চতুর্থ সংশোধনী) করে চালু করা হয় একদলীয় ব্যবস্থা। বাকশাল গঠন করে এক দলীয় ব্যবস্থা চালু করে গণতন্ত্রের মূলে করা হয় কুঠারাঘাত। চারটি সংবাদমাধ্যম রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দিয়ে মিডিয়ার কণ্ঠরোধ করা হয়। পরমত কিংবা ভিন্নমত দমনের কুনজির স্থাপিত হয়। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ প্রচ-ভাবে ক্ষুব্ধ ছিল, কিন্তু এর প্রকাশটা হতে একটু সময় গড়ায়, কিন্তু দমনপীড়নের অভিঘাতে মানুষের জেগে উঠার শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট স্বাধীন দেশের ইতিহাসে যা ঘটল এরও তো প্রেক্ষাপট কম বিস্তৃত নয়। এরপরও জনগণ স্বস্তির স্পর্শ পেল না। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে মানুষের সামনে প্রশ্ন আসে এরপর কী হবে! সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান যখন সেনাপ্রধান হন তখন সেনাদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় হিসেবে খুশির আবহ তৈরি হয়। ১৯৭১ সালে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের জন্য জনগণের মধ্যেও ছিলেন সমাদৃত।
সব মহলেই তিনি পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন তার কৃতকর্মের জন্যই। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে বাংলাদেশে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। খন্দকার মুশতাকের পতন ঘটে। ওই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সিপাহী-জনতার মধ্যে একটি সেতু গড়ে এই প্রশ্ন সামনে রেখে যে, আবার কি একদলীয় সরকারের মুষ্টিবদ্ধ হতে হচ্ছে দেশ? এসব নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৭ নভেম্বর সাধারণ সৈনিকরা রাস্তায় নেমে আসে এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সাধারণ জনগণও। বিপ্লবের স্পুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান তখন বন্দি অবস্থা থেকে তাদের যূথবদ্ধ প্রচেষ্টায় মুক্ত হন। সিপাহী-জনতা তাকে শাসকের আসনে অধিষ্ঠিত করে। তিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর যে আবহ তৈরি হয় তাতে স্বস্তি ফিরে আসে। দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক পর্যায়ে গঠন করেন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। যে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল তা রদ করে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পথ সুগম করেন। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে তার ১৯ দফা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
দেশ-জাতির কল্যাণে তিনি আরও বহুমুখী কর্মসূচি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত করেন নব অধ্যায়। ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ উপাখ্যান আর সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানকে এই প্রেক্ষাপটে সময়ই তার দাবি ও তাগিদে তাকে মানুষের অন্তরে প্রোথিত করে। তিনি সবার কথা চিন্তা করে জাতীয়তা বাংলাদেশি করলেন। এটি মূলত ভৌগোলিক সীমানার ভেতর বসবাসকারী সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের আত্মিক বন্ধন এবং সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শ। এটি মূলত ভৌগোলিক সীমানার ভেতর বসবাসকারী সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের আত্মিক বন্ধন এবং সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শ। দেশের সব জনগণকে একই আইডেন্টিটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের একই মানসিকতায় তৈরি করার যে প্রয়াস আমরা জিয়াউর রহমানের মধ্যে দেখেছি তা অনুসরণযোগ্য। তিনি জাতির ভীত মজবুত করতে পালন করেছেন অনন্য ভূমিকা।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতির সুফল দেশ-জাতির জন্য নিশ্চিত করার ফের দায়িত্ব বর্তেছে বিএনপির ওপর। সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানুষের অধিকারসহ প্রত্যাশিত সব কিছুর নিশ্চিতকরণে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা কল্যাণ বয়ে আনুক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে এই প্রত্যাশা। নৈতিকতা-সততার যে পথ জিয়াউর রহমান দেখিয়ে গেছেন তা প্রতিফলিত হোক। নিষ্ঠাবান, সৎ ও আধুনিক শাসনব্যবস্থার রূপকার সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধা। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতির ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনকারী সবাইকেও শ্রদ্ধা।
লেখক : অধ্যাপক ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়