রাজনীতির ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম

জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনের বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করতে শুরু করতে হয় একই বছরের ১৫ আগস্ট থেকে, যেদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান একটি ছোট সেনাদলের হাতে নির্মমভাবে পরিবার-পরিজনসহ নিহত হন। অবাক করার বিষয় হলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৫ সালে এ হত্যাকা-ের পর কোনো ধরনের প্রতিবাদ হয়নি। বিশাল দল আওয়ামী লীগ নিশ্চুপ-নীরব ছিল। আর দলের কিছু নেতা একই দলের  খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। 

৭৫-এর ঘটনাবলির স্মৃতিচারণ করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধরনের ড্রামাটিক ঘটনা আর ঘটেনি। যারা এটি ঘটিয়েছিলেন, তাদের নায়ক ছিলেন সেনাবাহিনীর আরমার্ড কোরের প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফারুক-উর-রহমান এবং দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টের আর্টিলারির কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশীদ। হত্যাকা-ের পর এতে অংশগ্রহণকারী সাত-আটজন অফিসার বঙ্গভবনে অবস্থান নেন। খন্দকার মোশতাককে তারা নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। ফারুক-রশীদের নেতৃত্বে এই ছোট গ্রুপটি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও হস্তক্ষেপ করে। তারা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং তার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে শক্ত করার জন্য বিভিন্নভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারা প্রতিদিনই সেনাবাহিনীতে কিছু রদবদল করতে থাকেন, যাতে তারা ঢাকায় আরও শক্তিশালী হতে পারেন।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগের সদস্যদের নিয়ে প্রতিদিনই বঙ্গভবনে মিটিং করতেন। ১৫ আগস্ট যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগের সিনিয়র ২-৩ জন ছাড়া বাকিরা মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণ করেন। খন্দকার মোশতাক ধীরে ধীরে দলকে নতুনভাবে গড়ার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। অপরদিকে ফারুক-রশীদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টাও চলতে থাকে। মাসখানেকের মধ্যেই দেখা গেল সেনাবাহিনীতে দুটি গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছে। একটি ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ে অংশগ্রহণকারী গ্রুপ যারা চেইন অব কমান্ড ভেঙে হত্যাকা-ে অংশ নিয়েছিল। আরেকটি হলো সেনাবাহিনীর বাকি অফিসাররা, যারা চেইন অব কমান্ডের মধ্যে ছিলেন। চেইন অব কমান্ড ভঙ্গকারীরা যেহেতু বঙ্গভবনে অবস্থান করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করছেন, সেহেতু তারা  একটি বিতর্কিত কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করেছেন।

আওয়ামী লীগের আমলে যারা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন তাদের রেডিও অফিসে ডেকে এনে নির্যাতন করে তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা আদায় করা হতো। রেডিও স্টেশনে একটি হত্যাকা-ও ঘটে। তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের এপিএস মিন্টুকে রেডিও স্টেশনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তার লাশ বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়। এসব কর্মকা-ের ফলে সেনাবাহিনীতে ধীরে ধীরে এদের বিরুদ্ধেও একটি গ্রুপ সোচ্চার হয়ে ওঠে। কার্যত সেনাবাহিনী এই দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

 সে দিনের স্মৃতিচারণ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরও বলেন, সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশ জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বলে যে, আপনি হত্যাকারী গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করুন। তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। আমরা একটি আর্মি দেখতে চাই, দুটি আর্মি নয়। তাদের কথা শুনে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ট্যাংকগুলো বঙ্গভবন থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং কর্মকর্তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসতে লিখিত আদেশ জারি করেন। ফারুক ও রশীদের গ্রুপ লিখিত নির্দেশ অমান্য করে। এসব নিয়েও সেনাবাহিনীতে নানা ধরনের মতবিরোধ ছড়িয়ে পড়ে। চেইন অব কমান্ড ছাড়া একটি সেনাবাহিনী কার্যকর হতে পারে না। নানা কারণে এ দুটি বিভক্ত গ্রুপের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। তখন একজন সাবেক অফিসার রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হলেন। তার নাম লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহের। তিনি জাসদের একজন নেতা ছিলেন। নারায়ণগঞ্জে ‘বেজা’ সংস্থার চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৭১ সালে মেজর [আবদুল] জলিল মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। পরে তিনি জাসদের সভাপতি হন। তিনি ১৯৭৪ সালে সেনাবাহিনীতে একটি গোপন সংস্থা তৈরি করেন নাম বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, যারা একসময় সিপাহিদের নিয়ে বিপ্লব করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে। জাসদ তখন নানা ধরনের রোমাঞ্চকর কর্মকা-ে নিয়োজিত ছিল। এদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাদের চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। মোট কথা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপ তাদের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত ছিল।

মেজর জলিল জেলে যাওয়ার পর কর্নেল তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্ব নেন। তিনি দেখলেন ১৫ আগস্ট একটি অভ্যুত্থান হলো, যেখানে তিনি বা জাসদ অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

সে বছরই ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান হয়; যেটা ১৫ আগস্ট থেকে বঙ্গভবনে অবস্থানরত অফিসারদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বর দুটোতেই কর্নেল তাহের অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তিনি ক্রমেই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অসহিষ্ণু হয়ে পড়েন। তিনি জাসদ নেতাদের নিয়ে ঢাকায় পরপর কয়েকটি বৈঠক করেন নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সাল থেকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তিনি গঠন করে লালন পালন করে আসছেন। কীভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া যায়? সিপাহিদের দিয়ে তিনি একটি বিপ্লব করাবেন। অফিসারদের সরিয়ে বা হত্যা করে ক্ষমতা দখল করবেন। জাসদের কেউ কেউ এ প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়েছেন। অধিকাংশই একমত হতে পারেননি। এহেন অবস্থায় পরোয়া না করে কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীতে একটি লিফলেট ছড়িয়ে দিলেন  খালেদ মোশাররফ ৩ নভেম্বর যে অভ্যুত্থানটি করেছেন, খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সংসদ ভেঙে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি সরিয়ে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মো. সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করেছেনএগুলো সবই ভারতীয় কর্মকা-। তিনি [খালেদ] প্রকৃতপক্ষে ভারতের এজেন্ট। এই লিফলেট ক্যান্টনমেন্টে ছড়িয়ে দেওয়ার পর এটি দাউ দাউ করে ছড়িয়ে পড়লে এবং সাধারণ সৈনিকরা বিশ্বাস করলেন না। তার কারণ, ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ রেডিও স্টেশন দখল করে চুপ করে বসে রইলেন। এই নীরবতা তার জন্য কাল হয়েছে। জনগণের মনে বিশ্বাস জন্ম নিলো খালেদ মোশাররফ হয়তো আবার আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে ভারতের উদ্যোগে ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানটি করেছেন। বিশ্বাস করার কারণ হলো খালেদ মোশাররফের মা এবং তার ভাই [রাশেদ মোশাররফ] ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগের হয়ে একটি মিছিল করেন, শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। এতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্য ও জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে খালেদ মোশাররফ ভারতীয় এজেন্ট হিসেবে একটি অভ্যুত্থান করেছেন। তখন জনগণ আজকের  মতো এত সচেতন ছিল না। জনগণ ও সৈনিকদের মধ্যে বিশেষ করে কর্নেল তাহেরের লিফলেটের প্রচ- প্রভাব পড়ে। ফারুক ও রশীদ বিদেশে চলে গেলেও তাদের দুটি ইউনিট, যারা ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন, অত্যুৎসাহী হয়ে পড়েন; সুযোগ কাজে লাগিয়ে শাসন ক্ষমতায় ও সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডে যদি পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে আবার তাদের অফিসাররা দেশে ফিরতে পারবেন।

 হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, খালেদ মোশাররফের লক্ষ্য ছিল সেনাপ্রধান হওয়া, যেটি তিনি হয়েছেন। তার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল না এবং রাজনৈতিক জ্ঞানও ছিল না। জনগণের মনে কী চলছে, রেডিও স্টেশন বন্ধ থাকায় যে কত ধরনের গুজব ডালপালা মেলেছে, সে সম্পর্কে তিনি ছিলেন নির্বিকার। খালেদ ভেবেছেন যে, তার অবস্থান সংহত হয়েছে। জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন গৃহবন্দি ছিলেন। ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নির্দেশে সাধারণ সৈনিকরা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ঘটান। সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে টু ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসেন। তিনি সেনাবাহিনী প্রধানের পদে বসেছেন এবং সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। কর্নেল তাহের তখন জিয়াউর রহমানের হেডকোয়ার্টারে যান এবং তাকে শহীদ মিনারে যেতে অনুরোধ জানান, যেখানে জাসদ কর্মীরা অপেক্ষায় ছিলেন; সেখানে তিনি যেন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। জিয়াউর রহমান উত্তর দেওয়ার আগেই তার আশপাশের অফিসাররা বললেন শহীদ মিনারে সেনাপ্রধানের যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো কিছু বলতে হলে আপনারা রেকর্ডের জন্য নিয়ে আসেন। কর্নেল তাহের প্রাণপণ চেষ্টায়ও জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে নিতে সক্ষম হলেন না। এখানেই অভ্যুত্থানের দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই তার পরাজয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। প্রকৃতপক্ষে, ’৭২ সালে অবসর নেওয়া কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীতে অনেকটাই অপরিচিত ছিলেন। সেনাবাহিনীর বিশাল অংশ পদাতিক বাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের, যারা মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ’৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন। যেহেতু সেনানিবাসে কর্নেল তাহেরের কোনো অবস্থান নেই, তিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে সলিমুল্লাহ হলের হাউজ টিউটরের বাসায় বসে পরবর্তী ছক করেন কীভাবে জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে আবারও সেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ব্যবহার করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া যায়। কিন্তু জিয়াউর রহমান মনে-প্রাণে একজন সৈনিক ছিলেন। তার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ তখন ছিল না। এক কথাটি বলতেই হচ্ছে যে, সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন প্রধানত তার ’৭১-এর স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কারণে। পরে একজন সৎ দক্ষ অফিসার হিসেবে তার ইমেজ ভালো ছিল। সেই কারণে তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করে সেনাবাহিনীকে আবার শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনেন ৭ নভেম্বরের পর। এ সময় অন্য কোনো কর্মকর্তার পক্ষে এই সিপাহিদের শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল না। যাই হোক এক-দুই দিনের মধ্যেই জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। বিদ্রোহী সৈনিকদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। জাতির উদ্দেশে তিনি ক্যান্টনমেন্টে বসেই রেকর্ডারের মাধ্যমে ভাষণ দেন। যেটি সারা দেশের জনগণকে প্রভাবিত করেছে। জনগণকে আশ্বস্ত করেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত