জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (নিকডু) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় পরিচালিত ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী ২৯ নভেম্বর এ সেবা পরিচালনার চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রায় ৫০০ দরিদ্র ও অসচ্ছল কিডনি রোগীর নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় যেকোনো উপায়ে সেবা চালু রাখার দাবি সংশ্লিষ্টদের। অন্যথায় এসব রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।
গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে রোগী ও তাদের স্বজনরা এ দাবি জানান। ‘ডায়ালাইসিস সেন্টার (পিপিপি) রক্ষা ও রোগী কল্যাণ কমিটি’ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। লিখিত বক্তব্যে কিডনি রোগীর স্বজন মো. লুৎফুর রহমান রিপন বলেন, ‘সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেবা নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে রোগীদের নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। সরকারি ব্যবস্থায় স্বল্প খরচে চিকিৎসার যে ধারণা দেওয়া হয়, বাস্তবে তার সঙ্গে মেলে না। পরোক্ষ ও আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রতিবার ডায়ালাইসিসে কমপক্ষে দুই হাজার টাকা ব্যয় হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে সরকারি ডায়ালাইসিস ব্যবস্থার পাঁচটি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয়। আয়োজকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের জন্য শুরুতেই ২০ হাজার টাকা অগ্রিম জমা দিতে হয়। এতে মাত্র ছয় মাস সেবা পাওয়া যায়। এর মধ্যে রোগীর মৃত্যু হলে জমাকৃত টাকার অবশিষ্ট অংশ ফেরত পাওয়া যায় না। এ ছাড়া সপ্তাহে দুবার ডায়ালাইসিসের সুযোগ থাকায় যেসব রোগীর সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস প্রয়োজন, তারা বিপাকে পড়েন। একজন রোগীর জন্য মাসে মাত্র দুটি ডায়ালাইজার বরাদ্দ থাকে। ফলে একই ডায়ালাইজার হাতে ধুয়ে বারবার ব্যবহার করতে হয়। যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করার কারণে এতে রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র প্রায়ই অকার্যকর থাকে। এ কারণে নির্ধারিত চার ঘণ্টার পরিবর্তে অনেক সময় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করেই সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টেপ, গ্লাভস, স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডায়ালাইসেটও রোগীদের নিজেদের টাকায় কিনতে হয়। নতুন রোগীদের ডায়ালাইসিস শুরুর আগে হেপাটাইটিস পরীক্ষা না করানোর অভিযোগও করেন স্বজনরা। তাদের আশঙ্কা, এতে হেপাটাইটিস নেগেটিভ রোগীরাও পরবর্তী সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে লুৎফুর রহমান রিপন বলেন, ‘গত আট বছর ধরে পরিবারের সদস্যের ডায়ালাইসিসের খরচ জোগাতে গিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস করানোর ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন। সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে গেলে নানা ধরনের হয়রানি ও অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়তে হয়। প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আমাদের আকুল আবেদন, আমাদের বাঁচা-মরার বিষয়টি বিবেচনা করে পিপিপির মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেন্টারটি সচল রাখুন।
আরেক রোগীর স্বজন মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও সেবার মান নিয়ে রোগীদের হতাশা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সময়সূচি পাওয়াও কঠিন। অন্যদিকে পিপিপি প্রকল্পের আওতায় তুলনামূলক কম খরচে যত্নসহকারে সেবা পাওয়া যায়। শারমিন মির্জা নামে আরেক স্বজন বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় পিপিপি সেন্টার বন্ধ হয়ে গেলে রোগীদের জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, চিকিৎসা পাওয়া নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে মুমূর্ষু কিডনি রোগীদের চিকিৎসা যেন বন্ধ না হয়। তাই নিকডুসহ দুই হাসপাতালের পিপিপি ডায়ালাইসিস সেন্টারের কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।