ইউরোপজুড়ে ৩৪ ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি, নাশকতার শঙ্কা

ইউরোপের ১৬টি দেশের বিভিন্ন ফ্লাইটে অন্তত ২৫টি বোমা হামলার হুমকি আসে।

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এক সপ্তাহে অন্তত ৩৪টি উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এসব হুমকির বেশির ভাগই ভুয়া বলে প্রমাণিত হলেও কয়েকটি উড়োজাহাজকে জরুরি অবতরণ ও গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়েছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় ইউরোপের আকাশপথে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

বৃহস্পতিবার ইউরোপের ১৬টি দেশের বিভিন্ন ফ্লাইটে অন্তত ২৫টি বোমা হামলার হুমকি আসে। দেশগুলো হলো ইতালি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ফ্রান্স, গ্রিস, সার্বিয়া ও চেকিয়া।

এসব হুমকির মুখে পড়ে রায়ানএয়ার, অ্যার লিঙ্গাস, উইজ এয়ার, ফিনএয়ার, ইজিজেট, এজিয়ান এয়ারলাইনস, আইবেরিয়া, স্কাই এক্সপ্রেস, এয়ার সার্বিয়া ও লট পোলিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট। তবে সব উড়োজাহাজই নিরাপদে অবতরণ করেছে। তল্লাশি চালিয়ে কোনো সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাজ্যে লন্ডনের প্রধান বিমানবন্দর হিথ্রো ও বার্মিংহাম বিমানবন্দরেও বৃহস্পতিবার রাতে বোমা হামলার হুমকি আসে। পরে মেট্রোপলিটন পুলিশের এভিয়েশন পুলিশ কমান্ডের বিশেষজ্ঞ তদন্তকারীরা সেগুলো ভুয়া বলে নিশ্চিত করেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হিথ্রো থেকে ছেড়ে যাওয়া বা সেখানে অবতরণ করতে যাওয়া চারটি উড়োজাহাজকে লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে নিরাপত্তা মূল্যায়নে কোনো ঝুঁকি পাওয়া যায়নি।

এর আগে মঙ্গলবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাতটি উড়োজাহাজে একই ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। সেগুলোর কয়েকটিতে তল্লাশি চালানো হয় এবং কয়েকটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। সোমবার যুক্তরাজ্য থেকে বুলগেরিয়াগামী একটি ফ্লাইটও বোমা হামলার হুমকির পর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে ওই হুমকির কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

তবে এসব ঘটনার পেছনে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কিংবা রাশিয়া বা ইরানের মতো কোনো রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ এখনো মেলেনি বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ নিয়ে তদন্ত চলছে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) এসব ঘটনায় সৃষ্ট বিঘ্নের নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে হুমকিগুলোর উৎস শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। আইএটিএর পরিচালনা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট নিক কেরিন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিমান চলাচল খাতের কাছে নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা প্রতিটি হুমকিকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহনবিষয়ক কমিশনার অ্যাপোস্তোলোস জিজিকোস্তাস বলেন, ঘটনাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হুমকি অগ্রহণযোগ্য।

ইতালির রোম ও বুলগেরিয়ার সোফিয়া বিমানবন্দরে ই-মেইলে পাঠানো বোমা হামলার হুমকিতে ‘মেল স্টেটের যোদ্ধারা’ স্বাক্ষর করেছিল বলে জানিয়েছে রোমের দুটি বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অ্যারোপোর্তি দি রোমার সূত্র। বার্তা সংস্থা এএফপিও এ-সংক্রান্ত একটি বার্তা দেখেছে।

‘মেল স্টেট’ রাশিয়ার একটি উগ্র ডানপন্থী, চরম জাতীয়তাবাদী ও নারীবিদ্বেষী আন্দোলন। ২০১৬ সালে ভ্লাদিস্লাভ পোজনিয়াকভ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সমর্থক হিসেবে পরিচিত পোজনিয়াকভ তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে এসব হুমকির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি কিংবা দায় স্বীকার করেননি।

ই-মেইলে পাঠানো বার্তায় লেখা ছিল, ‘আমরা মেল স্টেটের যোদ্ধারা আজকের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইতিহাস তৈরি করব। তোমাদের নারীবাদী শাসনব্যবস্থা চিরকাল আমাদের মনে রাখবে। ৬০ মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটবে। আজ তোমাদের আকাশ রক্তিম হয়ে উঠবে।’

আয়ারল্যান্ডের কর্ক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে ফোনে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কাছ থেকে একটি হুমকি পাওয়া যায়। এতে একটি ফ্লাইটের যাত্রা বিলম্বিত হয়। সেটি লন্ডনের স্ট্যানস্টেড থেকে আসা রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইট বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ইতালির পেসকারা থেকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস-চার্লেরোয়া বিমানবন্দরগামী রায়ানএয়ারের আরেকটি উড়োজাহাজে তল্লাশি চালানো হয়। এর শৌচাগারের দেয়ালে ‘বোমা’ শব্দটি লেখা পাওয়া গিয়েছিল।

এসব ঘটনার প্রভাবে ফ্লাইট চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও ইউরোপের আকাশপথে নির্ধারিত মোট ২৭ হাজার ৪০০টি ফ্লাইটের তুলনায় আক্রান্ত ফ্লাইটের সংখ্যা খুবই সামান্য বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোকন্ট্রোল।

এদিকে ডাবলিন থেকে রোমগামী অ্যার লিঙ্গাসের একটি ফ্লাইট গতিপথ পরিবর্তন করে ফ্রান্সের এভ্রুতে অবতরণ করে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রথমে একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে ওই ফ্লাইটের পাইলটকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।

এ সপ্তাহে ইউরোপের বিভিন্ন সুপারমার্কেটের হিমায়নব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনার পরপরই এসব বোমা হামলার হুমকি এল। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসনকে সুপারমার্কেটের ফ্রিজে সাইবার হামলার জন্য দায়ী করাকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে সবকিছুর সঙ্গে দেশটিকে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এখন প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। কখনো সুপারমার্কেটের ফ্রিজ, কখনো ফ্রান্সের রক্ত সরবরাহব্যবস্থা, আবার কখনো এসব ভুয়া সতর্কবার্তা।’

এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটিকে বলা হয় সীমার নিচের যুদ্ধ (আন্ডার-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার)। কারণ, দায় নির্দিষ্ট করে শনাক্ত করার সীমার নিচেই এসব কর্মকাণ্ড রাখা হয়। ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনভাবে করা হয়, যাতে কাউকে দায়ী করা না যায়।’

আক্রান্ত ফ্লাইটগুলোর বেশির ভাগই স্বল্প খরচের বিমান সংস্থার হলেও ঘটনাগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো যোগসূত্র বা ধরন এখনো স্পষ্ট নয়।

বিমান চলাচল খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন উড়োজাহাজে ভুয়া হুমকির ঘটনা ঘটে। তবে অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক বিশ্বাসযোগ্য হুমকি পাওয়া সমন্বিত কোনো তৎপরতার ইঙ্গিত দিতে পারে। যদিও এসব হুমকি শেষ পর্যন্ত ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরের একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ও তল্লাশিব্যবস্থা এড়িয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরক উড়োজাহাজে নেওয়া কঠিন। তবে সাধারণত ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায় চলাচলকারী উড়োজাহাজে কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে তার ভয়াবহতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

নিরাপত্তার স্বার্থে উড়োজাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করা বিমান সংস্থাগুলোর জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি যাত্রীদের জন্যও ভোগান্তিকর। তবে বিশ্বাসযোগ্য কোনো হুমকি পাওয়া গেলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিমান সংস্থাগুলোর সামনে কার্যত বিকল্প থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ইন্টারনেটে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালনাসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য হওয়ায় এখন যে কেউ ফ্লাইটের সময়সূচি, উড়োজাহাজের ধরন ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারে। কয়েক দশক আগেও এ ধরনের তথ্য কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের কাছেই সীমাবদ্ধ ছিল।

বিমান চলাচলবিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান অসপ্রে ফ্লাইট সলিউশন্সের বিশ্লেষক রাইস জোনস বলেন, এসব ভুয়া হুমকির পর ইউরোপের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আস্থা থাকলেও স্বাভাবিক নিরাপত্তা প্রটোকলে কোনো পরিবর্তন আনা উচিত হবে না। তবে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হবে এবং সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের কারণে বিমান ভ্রমণ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়তে পারে।

তার মতে, হুমকিগুলোর মধ্যে যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত মিললেও পুরো অভিযানটি ছিল বিশৃঙ্খল প্রকৃতির। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলকে লক্ষ্য করে এসব ঘটনা ঘটানো হয়নি। তবে বারবার এ ধরনের হুমকি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হলে ভবিষ্যতে প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকির প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর শুধু বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করাই এসব ভুয়া হুমকির পেছনে থাকা ব্যক্তিদের কাছে সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত