‘বিসিএস শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে। কলেজের এক ব্যাচ সিনিয়র বড় ভাইয়ের মুখে। বাকৃবিতে কেন পড়ব, এটা বুঝাতে উনি বিসিএস-এর প্রসঙ্গ এনেছিলেন। সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথন যে একদিন আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে, তা তখন ভাবিনি।’
বলছিলেন ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সদ্য যোগদান করা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শাহীদুল ইসলাম। তবে তার স্বপ্ন ছিল বিদেশে উচ্চশিক্ষার, করেছিলেন আইইএলটিএস। সেখান থেকে ৪৪তম বিসিএসে ছিলেন পশুসম্পদ ক্যাডার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরটা তার কেটেছে একাডেমিক পড়াশোনা নিয়ে। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার শুরু। একপর্যায়ে গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত নেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দেবেন। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রস্তুতিও শুরু করেন। ভার্সিটির স্যারদের ল্যাবে কাজের সুযোগ খুঁজছিলেন।
কিন্তু শাহীদুলের পরিকল্পনায় বিপত্তি বাধায় কোভিড-১৯। চতুর্থ বর্ষের ক্লাস শুরু হতেই কোভিডের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় জিআরই একটি অনলাইন কোর্সের জন্য বাবার কাছে টাকা চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা রাজি হলেন না। এরপর বাবার ইচ্ছাতেই সিদ্ধান্ত নেন, দেশে থেকে ক্যারিয়ার গড়বেন। তিনটি অপশন। ব্যবসা, বেসরকারি চাকরি কিংবা বিসিএস।
তখনো গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে প্রায় এক বছর বাকি। তাই ভাবলেন, এই সময়টা কাজে লাগিয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া যাক। এই ভাবনা থেকেই বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন শাহীদুল।
প্রথম প্রচেষ্টা
শাহীদুল ইসলামের প্রথম বিসিএস ছিল ৪৪তম। সেবার অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিসিএসেই লাইভস্টক ক্যাডার অর্জন করেন তিনি। পশুপালন অনুষদে তার ব্যাচে একমাত্র তিনিই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর লিখিত ও ভাইভা শেষে ১৭তম অবস্থান নিয়ে যোগদান করেন বান্দরবানে।
তবে শাহীদুলের লক্ষ্যটা ছিল আরও বড়। তিনি বলেন, ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি। বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও সাধারণ বিজ্ঞানে বিশেষভাবে মনোযোগ দিই। ৪৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার পর আমার নিজের কাছেই মনে হয়েছিল, জীবনের অন্যতম সেরা একটা পরীক্ষা দিলাম। প্রস্তুতির সময় যে পরিকল্পনা করেছিলাম, পরীক্ষার হলে প্রায় পুরোপুরি সেটি বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলাম। নিজের পরিশ্রম ও সাধনার দিকগুলো নিয়ে তিনি বলেন, ভাইভার আগে আমি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি করতাম। সেখানে কাজ করার সুবাদে ইংরেজিতে কথা বলার সাবলীলতা তৈরি হয়েছিল। আমার পছন্দক্রমে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ক্যাডার প্রথমে থাকায় ভাইভার বড় একটি অংশ ইংরেজিতে হয়েছিল। ইংরেজিতে কথা বলার অভ্যাস তখন আমাকে সাহায্য করেছে বলে মনে করি।
বিসিএস প্রার্থীদের জন্য পরামর্শ
নতুন বিসিএস প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে শাহীদুল বলেন, বিসিএসের প্রস্তুতিতে প্রত্যেকেরই কিছু শক্তিশালী ও দুর্বল বিষয় থাকে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কোনো একটি বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আমার পরামর্শ হলো, প্রথমে প্রতিটি বিষয়ে একটি ন্যূনতম সক্ষমতা অর্জন করুন। এরপর নিজের শক্তিশালী বিষয়গুলোতে আরও ভালো করার চেষ্টা করুন। দুর্বল বিষয়কে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে অন্তত এমন প্রস্তুতি নিন, যাতে সেখান থেকেও কিছু নম্বর পেতে পারেন। লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার ক্ষেত্রে শুধু পড়াশোনা করাই যথেষ্ট নয়, পরীক্ষার খাতায় কতটা উপস্থাপন করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরপত্রের উপস্থাপনা ভালো করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবার যাত্রা এক রকম হবে না, সবার পারিবারিক পরিস্থিতি, পড়াশোনার পরিবেশ কিংবা প্রস্তুতির সময়ও এক হবে না। তাই অন্য কারও প্রস্তুতির পদ্ধতি হুবহু অনুসরণ করার চেয়ে নিজের জন্য কার্যকর একটি পদ্ধতি তৈরি করা বেশি জরুরি। একটি পরীক্ষার অভিজ্ঞতাকে পরের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কাজে লাগাতে হবে।