নতুন দরিদ্রের সংখ্যা হতে পারে ১ কোটি ৭৫ লাখ

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:১৭ এএম

করোনা ও আম্পানে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণকৃত সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া এসব সহায়তা নানা কারণে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের কাছে সময় মতো পৌঁছে না। এতে অনেক ক্ষেত্রেই অপচয় হচ্ছে। সহায়তা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তা জানাতেও পারছেন না ভুক্তভোগীদের অনেকে। গতকাল সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি, অক্সফাম ইন বাংলাদেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন আয়োজিত সংলাপে এসব তথ্য উঠে আসে। এ সময় উত্থাপিত মূল প্রতিবেদনে সহায়তা বিতরণে ৭ ধরনের সমস্যা এবং এগুলো দূরীকরণে সুপারিশ দেওয়া হয়।

সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে- বরাদ্দ ও বিতরণের অপর্যাপ্ততা, সেবা সম্পর্কিত প্রচার-প্রচারণার অভাব, সুবিধাভোগী নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণমূলক না হওয়া, সুবিধাপ্রাপ্তিতে কারিগরি ত্রুটি, তথ্য সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, নির্ধারিত ‘ডাটাবেজ’ না থাকা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ত্রাণ সম্পর্কিত অভিযোগ গ্রহণ এবং নিষ্পত্তির কোনো প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা। সিপিডি এসব সমস্যা সমাধানে কিছু সুপারিশ দিয়েছে।

সুপারিশে বলা হয়, করোনা মোকাবিলায় ত্রাণ কর্মসূচির কার্যকারিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বরাদ্দ নির্ধারণে একটি সূচকের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়ের দারিদ্র্যের হার, জনসংখ্যা, বেকারত্বের হার ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে বহুমাত্রিক মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে। ত্রাণ সেবা সংক্রান্ত প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ সম্পর্কে জনসাধারণের সচেতনতা বাড়াতে হবে। সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে বাস্তবায়ন নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রচার-প্রচারণার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণসহ ত্রাণ কর্মসূচি কার্যকরে আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন। এছাড়া ত্রাণ সেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য যেমন উপজেলা ও ইউনিয়নওয়ারী বরাদ্দ, বিতরণ, সুবিধাভোগীদের তালিকা, ‘হটলাইনের’ ব্যবহার, ডাটাবেসে সংরক্ষণ এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে।

‘আম্পানের’ মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষি পুনর্বাসন বা প্রণোদনা কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তার অধিকতর কার্যকর ব্যবহার এবং অপচয় রোধে সার ও বীজ বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে এবং স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা, ফসল উৎপাদনের বিন্যাসে গুরুত্ব দিতে হবে।

ইউনিয়ন বা উপজেলাভিত্তিক একটি তথ্যভান্ডার (ডাটাবেস) তৈরি করতে হবে। সেখানে কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থা থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদনের যাবতীয় তথ্য নিয়মিতভাবে সংগৃহীত হতে থাকবে। এতে তাদের চাহিদা অনুযায়ী সাহায্য দেওয়া ও যোগ্য ব্যক্তি চিহ্নিত করা সহজ হবে।

সরকারি কৃষি প্রণোদনাগুলো দুর্যোগে অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে জিও-এনজিও সমন্বয় বাড়াতে হবে। কৃষকের তালিকা হালনাগাদ করে নতুনভাবে কৃষিকার্ড বিতরণের উদ্যোগ নিতে হবে। নিবিড় তদারকির ভিত্তিতে কৃষকের জন্য জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি সহায়তাগুলো সুষ্ঠুভাবে বিতরণের জন্য মাঠ পর্যায়ে বরাদ্দকৃত সরকারি চাকরির নিরিখে কৃষিকর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে হবে। কৃষিঋণ বিতরণে বর্গাচাষি এবং ত্রাণ বিতরণে গ্রামে ফেরা মানুষের জন্য বিশেষ উদ্যোগের প্রয়োজন।

করোনা ও আম্পান মোকাবিলায় ত্রাণ কর্মসূচি এবং কৃষি প্রণোদনা : সরকারি পরিষেবার কার্যকারিতা শীর্ষক ভার্চুয়াল সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। এ সময় জানানো হয়, কভিড-১৯ এর কারণে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে আছেন ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ, যা সর্বশেষ জরিপকৃত শ্রমশক্তির (২০১৬-১৭) প্রায় ২০ দশমিক ১ শতাংশ। সিপিডি (২০২০) প্রাক্কলনে এই মহামারী (উচ্চ) দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে নিয়ে যাবে। এই ‘নতুন দরিদ্র’র সংখ্যা হতে পারে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। উপকূলীয়  জেলাগুলোতে সাম্প্রতিক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংলাপে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার একটি জরিপ তুলে ধরে বলা হয়, ২ হাজার ৫০০ টাকা মানবিক সহায়তা পাওয়ার যোগ্য এমন ৪ হাজার জনের একটি তালিকা জাতীয় পর্যায়ে পাঠানো হয়। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন  থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে প্রেরণকৃত তালিকার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশ মানুষ সহায়তা পায়নি। পেয়েছে ৬০ এর কাছাকাছি মানুষ।

ইউনিয়ন পর্যায়ে সুবিধাভোগীদের সঙ্গে আলোচনায় জানা যায়, চাল বিতরণের স্থান বা গোডাউন কাছাকাছি হওয়ায় সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়নি। ২ হাজার ৫০০ টাকা (নগদ) সহায়তার ক্ষেত্রে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরেও সাহায্য না পাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ৫০ শতাংশের বেশি তালিকাভুক্ত হওয়ার পরেও নগদ টাকা পাননি বলে সিবিওদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

প্রতিজন কার্ডধারী কৃষক ৫০৮ টাকা করে বীজ বাবদ বরাদ্দ পেয়েছেন। এক্ষেত্রে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত কৃষি প্রণোদনার তথ্য বিশ্লেষণে মোট কার্ডধারী কৃষক এবং উপজেলাওয়ারি প্রাপ্ত কৃষকের হারের মধ্যে কিছুটা অসামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। যেমন নেছারাবাদ এবং পিরোজপুর সদরে মোট কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়া সত্ত্বেও হাইব্রিড বোরো ধানের বীজ পেয়েছেন এমন কৃষকের হার বেশি ছিল।

সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান ও সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, মোস্তফা আমির সাব্বিহ সংলাপে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জনগোষ্ঠীভিত্তিকের চেয়ে দরিদ্রতা ও বিপন্নতাভিত্তিক ত্রাণ তৎপরতা অনেক বেশি কার্যকর হয়। এই কার্যকারিতা নিশ্চিতে আরও তথ্য-উপাত্ত ও প্রশাসনিক সমন্বয় প্রয়োজন। যোগ্য মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রচার-প্রচারণার প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত