দেশের খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) আবারও অস্থির হয়েছে উঠেছে মার্কিন মুদ্রা ডলার। হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় এক বছরের ব্যবধানে ফের অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়তে শুরু করেছে ডলারের। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে মুদ্রাটির দাম ৫ থেকে ৬ টাকা বেড়ে ১১৭-১১৮ টাকা বিক্রি শুরু হয়। বিষয়টি নজরে এলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে নামে। ফলে মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে ডলার কেনাবেচা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশগামী যাত্রীরা পড়েছেন বিপাকে।
বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দরে ডলার বিক্রি করায় গত সপ্তাহে বন্ধ করে দেওয়া হয় ৭টি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান। আর কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয় আরও ১০টিকে। এমন পরিস্থিতিতে ভয়-আতঙ্কে ডলার বেচাকেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে খোলাবাজারে ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল রবিবার রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, বায়তুল মোকাররম এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। একই দিন গুলশান, বনানীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়েও এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
ডলার বাজারের অস্থিরতা সম্পর্কে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় দেশে ডলার সরবরাহ কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে অভিযান করে লাভ নেই। এতে বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, হুন্ডি আর বিভিন্ন সুবিধার কারণে দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে। এই পাচার ঠেকানো ছাড়া ডলারের অস্থিরতা স্থায়ীভাবে ঠেকানো সম্ভব নয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, মানি চেঞ্জারগুলোর কর্মীরা অলস বসে আছেন। বেচাকেনার কোনো কার্যক্রম নেই। যারা ডলার কেনার জন্য আসছেন, তাদের সরাসরি বলে দিচ্ছেন ডলার নেই।
মতিঝিল পাইওনিয়ার এক্সচেঞ্জ হাউজে ডলারের দাম জানতে চাইলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা বলেন, আজকে ডলার রেট ১১২ টাকা ৫০ পয়সা। ‘২০০ ডলার কিনব’ বলতেই বলেন, ডলার নেই ভাই। আজকে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩০০ ডলার কিনেছিলাম, বিক্রি করে দিয়েছি। এখন কোনো ডলার নেই।
ক্রেতা সেজে আরেক মানি চেঞ্জারে ফোন দিলে সরাসরি বলে দেন, ‘ভাই, ডলার নেই। কেউ এখন ডলার বিক্রি করছে না। আমরা না কিনতে পারলে বিক্রি করব কীভাবে? কয়েক দিন বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে সবাই বেচাকেনা বন্ধ করে দিয়েছে। আজ এখন পর্যন্ত কোনো ডলার বেচাকেনা করতে পারিনি।’
মতিঝিলে ডলার কিনতে আসা ইলিয়াস মাহমুদ জানান, ভুটান যাব ৭ সেপ্টেম্বরের ফ্লাইটে। খরচের জন্য নগদ ডলার কিনতে কয়েকটি ব্যাংক ঘুরেছি কিন্তু পাইনি। এখন মানি চেঞ্জারে এসেছি, সেখানেও ডলার নেই। ডলার ছাড়া যাব কীভাবে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানি চেঞ্জারগুলোতে ডলার বিক্রি বন্ধ আছে এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে ব্যাংকগুলোতে ডলার বেচাকেনা হচ্ছে। যাদের কাছে ডলার আছে, তারা কেনাবেচা করছে। মানি চেঞ্জারগুলো একজনের কাছ থেকে কিনে আরেকজনের কাছে বিক্রি করে। হতে পারে তারা নিজেরা কম দামে ডলার কিনতে পারছে না বলেই বিক্রিও করতে পারছে না। তবে আমাদের নির্ধারিত দামে (১১২.৫০) বিক্রি করতে হলে তাদের কিনতে হবে ১১০-১১১ টাকায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ডলার বিক্রির অনেকগুলো মাধ্যমের মধ্যে মানি চেঞ্জার একটি। এখন কোনো মানি চেঞ্জার যদি ডলার বিক্রি করতে না চায় তাহলে তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিক। মানুষ ব্যাংক থেকে কিনবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও খোলাবাজারে ১১৭ থেকে ১১৮ টাকায় ডলার কেনাবেচা হয়েছে। যখন বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের রেট ১১২ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করে দিল, তখন থেকে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলো ডলার ধরে রাখছে। অপেক্ষা করছে দাম আরও বাড়ার। তাই সরবরাহ কম। তবে বাজারে যখন ডলার সরবরাহ বাড়বে, তখন কেনাবেচাও বাড়বে।
ব্যাংকাররা জানান, এখন ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে ডলার খরচ করা যায়। এখন কার্ডে প্রতি ডলারের মূল্য ১১১ টাকা ৫০ পয়সা। যেখানে ব্যাংকে প্রতি ডলার ১১২ টাকা আর খোলাবাজারে ১১৭ থেকে ১১৮ টাকা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত বছরের মার্চ থেকে দেশে ডলার-সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এই সংকট মোকাবিলায় শুরুতে ডলারের দাম বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এতে সংকট আরও বেড়ে যায়। পরে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। এ দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) ওপর। এ দুই সংগঠন মিলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় এবং আমদানি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের দাম নির্ধারণ করে আসছে।
