সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা মহামারীর কারণে টিউশনি সংকটে পড়েছেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। ফলে তাদের বাড়তি আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসারে টানাটানি বেড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা সাধারণত মসজিদে চাকরির পাশাপাশি বাসা-বাড়িতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের সহিহ-শুদ্ধভাবে কোরআন ও প্রয়োজনীয় ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এর বিনিময়ে তারা একটা হাদিয়া (অর্থ) পান। এই বাড়তি অর্থ তাদের সংসারের চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। করোনার কারণে এই আয় বন্ধ হয়ে গেছে।আলোচ্য সংবাদটি নিশ্চয়ই সুখকর নয়। তবে এটাও বাস্তব যে, সংসারের প্রয়োজন মেটাতে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের টিউশনিতে নামতে হচ্ছে। এর দ্বারা সহজেই অনুমান করা যায়, তাদের আয়-রোজগার সম্পর্কে। ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে মসজিদের সংখ্যা দুই লাখ ৫০ হাজার ৩৯৯টি। এর মধ্যে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, জমিয়াতুল ফালাহ (চট্টগ্রাম), আন্দরকিল্লাহ শাহি মসজিদ (চট্টগ্রাম) ও রাজশাহীর হেতেম খাঁ মসজিদের ইমামরা সরকারি স্কেলে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন পান। অন্য মসজিদগুলো স্থানীয়ভাবে জনসাধারণের সাহায্য-সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। তাই ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নির্দিষ্ট কোনো বেতন কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি। এর পরও তাদের যে বেতন দেওয়া হয়, এর পরিমাণও খুব বেশি নয়। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে টিউশনি করেন কিংবা উপার্জনের জন্য ভিন্ন পথ অবলম্বন করেন। এ পথে উপার্জন হালাল, তবে তা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। তবুও করতে হয় জীবনের তাগিদে। যদি ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা হতো, তাহলে তারা পুরো সময়টা মসজিদকেন্দ্রিক সমাজের মানুষের জন্য, সমাজের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করতে পারত। তাতে সমাজ আরও বেশি উপকৃত হতো।
ইসলামের দৃষ্টিতে ইমামতি একটি মহান দায়িত্ব। এটি সুন্দর ও সম্মানজনক পেশাও বটে। শেষ নবী হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে ইমামতি করেছেন। সাহাবিরাও এই মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। ইমামতির রয়েছে অনেক ফজিলত। হজরত রাসুলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন দুই শ্রেণির মানুষ মেশকের তৈরি টিলার ওপর অবস্থান করবে। এক. ওই গোলাম যে আল্লাহ ও তার মনিবের হক আদায় করেছে। দুই. এমন ইমাম যে কোনো সম্প্রদায়ের ইমামতি করছে, আর তারা তার প্রতি সন্তুষ্ট। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বাংলাদেশে ইমামদের সামাজিক সম্মান-মর্যাদা থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তারা চরমভাবে অবহেলিত। নেই প্রয়োজন পূরণের মতো সম্মানী, নেই আবাসন। জীবনে বাড়ি-গাড়ি করবেন তো দূরের কথা, কোনো রকম টেনে চালাতে হয় সংসার। বার্ধক্য এলে ফিরতে হয় খালি হাতে। বেশিরভাগ মসজিদ কমিটির লোকজন মসজিদের অবকাঠামোগত খরচকে যতটা গুরুত্ব দেন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ব্যাপারে তার সিকি ভাগও চিন্তা করেন না।
একজন যে পরিমাণ বেতন পান, তা ভদ্র সমাজে উল্লেখ না করলেই ভদ্রতা বজায় থাকবে। এই যৎসামান্য টাকা দিয়ে পুরো মাস তাকে সংসার চালাতে হয়। সন্তানদের আবদার পূরণ করতে হয়, বাবা-মার জন্য ওষুধ কিনতে হয়। স্ত্রীর মুখে হাসি ফোটাতে হয়, সামাজিকতা রক্ষা করতে চলতে হয়। কিন্তু সেই বেতন দিয়ে ঠিকঠাক দুই বেলা পেট ভরে খাবার জোটে কি না তাই তো সন্দেহ! আমি-আপনি সংসারের খরচ নিয়ে যেমন দুশ্চিন্তা করি, সন্তান ও স্ত্রীর গোমড়া মুখ দেখে লজ্জাবনত হই, ওই ইমামেরও তেমনই হয়। কিন্তু সেটা অনুভব করে না কেউ, প্রতিকারে এগিয়ে আসে না কেউ। ইমামদের সম্মানজনক বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা কোনো করুণা নয়। এটা তাদের অধিকার। কারণ, ইমামরা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। তারা আমাদের ধর্মীয় কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা নিশ্চিন্তে তাদের অনুসরণ করছি। এখন তারাই যদি উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত থাকেন- তাহলে সমাজ সংস্কার থেকে শুরু করে ধর্মোপদেশ কে দেবেন আমাদের? বিষয়গুলো মাথায় রেখে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কল্যাণে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রায় সব গ্রামেই মসজিদ রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে বিদ্যালয় নেই, সেখানেও মসজিদ আছে। মসজিদের ইমামরা যদি সামাজিক ও নৈতিক বিষয়ে মানুষকে জানানোর উদ্যোগ নেন, তাহলে জনগণের অনেক ভুল ভাঙবে; সমাজ উপকৃত হবে। এক্ষেত্রে শুধু ইমামদের একার দায় নেই, দায় রয়েছে মসজিদ পরিচালনা কর্তৃপক্ষেরও। প্রথমত তাদের দায়িত্ব হলো, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানজনক বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা। যেন তারা অন্যসব ব্যস্ততা বাদ দিয়ে মসজিদকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচি তথা ছেলেমেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষা, বয়স্কদের কোরআন শিক্ষাসহ সব কাজ করতে পারেন। তাহলে মসজিদগুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে, সমাজ আলোকিত হবে, ইমাম-মুয়াজ্জিনরাও নিশ্চিন্তে তাদের কাজ করতে সক্ষম হবেন।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক