কং দায়ী গ্রেপ্তার-জামিনে!

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২১, ১১:০০ পিএম

‘... হারাইয়া গেলে, পুড়িয়া গেলে কং দায়ী নহে।’ এমনটাই লেখা থাকত সেকালে লন্ড্রির রসিদে। এখনো থাকে হয়তো-বা ইংরেজিতে। কর্র্তৃপক্ষ কীসের দায় এড়াচ্ছে! ‘বেইলি’ (Bailee-জিম্মাদার)-এর। লন্ড্রিতে, দর্জির দোকানে কাপড় দেওয়া-নেওয়ার মতো কারবারগুলো চুক্তি আইনের ১৪৮ ধারায় ‘বেইলমেন্ট’ (Bailmen-জিম্মা)। ১৫১-১৫২ ধারায় জিম্মাদারের দায়-দায়মুক্তি আছে। ব্যবসার অনেক কারবারেই এমন জিম্মা চলে। ব্যাংক-ঋণেও চলে ‘প্লেজ’ (Pledge) নামে। জমা রাখা মালামালকে বলে ‘বেইল’ (‘জমানত’, ‘জামানত’ দুরকমই বানান চলে, মহামুশিবত!)। বে-আক্কেলেও পড়তে পারেন জিম্মাদারের দায়ে, ‘পড়ে পাওয়া মাল করো ইস্তামাল’ ভেবে আপন করে নিলেই হয়ে গেল। পরে কিছু পুণ্যি করে শরিয়তি বিধান পুষিয়ে নেবেন ভাবলে ছাড়বে না চুক্তি আইন (৭১ ধারা)। আপনার কাছে ভুলে কেউ কিছু ফেলে গেলে, মোবাইল ফোনে, ‘নগদ’ কিংবা ‘বিকাশ’-এ (ব্যাংক-অ্যাকাউন্টে তো বটেই) টাকা পাঠিয়ে ফেললে হয়ে পড়লেন জিম্মাদার (৭২ ধারা)। খুঁজে এনে ফেরত দিতে হবে সেই ভুলোমনাকে। ফেরত পাওয়ার প্রস্তাবও নাকি সে রেখে যায় সংগোপনে। কুড়িয়ে নিয়ে প্রস্তাবে সায় দিয়ে দায় গিলেছেন বেখেয়ালে। আটকে গেছেন চুক্তি জালে। জবর যুক্তি-চুক্তি আইনের! দেওয়ানিই শুধু নয়, আত্মসাতে আছে ফৌজদারির দু-বছর পর্যন্ত জেল, সঙ্গে জরিমানাও (দণ্ডবিধির ৪০৩ ধারায়)। লন্ড্রিওয়ালা, দর্জিওয়ালার আত্মসাতে তিন বছর পর্যন্ত জেল আর জরিমানা (দন্ডবিধির ৪০৬ ধারায়)। আস্থার লোক হয়ে আস্থাভঙ্গ (Criminal breach of trust), সাজাও বেশি একটা বছর। পড়ে পাওয়াগুলোয় হয়েছিল অসদ্ভোগ (অসৎমতির ভোগ -Dishonest misappropriation)।

“পালাবে না স্যার, ভালো ‘সিউরিটি’ দেব স্যার” চলে ফৌজদারিতে। উকিল সাহেব কী চান? ‘বেইল’ (ইধরষ), জামানত রেখে আসামির হাজতমুক্তি। সোজা কথায় জামিন। চুক্তিভঙ্গের দেওয়ানি তো নয়, একেবারে আইনভঙ্গের ফৌজদারি। অপরাধ প্রমাণ হলে আসামিকে কাটাতে হবে জেলে, পড়তে হতে পারে ঝুলেও (ফাঁসিতে)। বিচারের আগেই ভেগে গেলে রাষ্ট্র-সমাজের রক্ষা হবে কীসে! বদলি কাউকেও ঢোকানো-ঝোলানো চলে না। তবে কি বিচারের আগেও কাটবে জেলে! তাহলে, ‘বিচারে দোষী প্রমাণ হওয়ার আগে পর্যন্ত আসামিকে নির্দোষ বলে ধরার’ সনাতন বাণী (১৯৪৮ সালের ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস’-এ ঢুকেছে পরে) কোথায় যাবে! দু-কুল সামলাতে তাই জামিনে মুক্তি, আছেও অনাদিকাল থেকে। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জ্যামাইকার মতো অনেক দেশেই আলাদা ‘বেইল অ্যাক্ট’ আছে। রাবণের দেশ শ্রীলঙ্কায় আছে, যবনের দেশ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে তো আছেই। ব্রিটিশ তার নিজ দেশে সেটা করেছিল ১৮৯৮ সালেই। আর, সে-বছর আমাদের (ব্রিটিশ-ভারতে) শুধু ফৌজদারি কার্যবিধি (Code of Criminal Procedure) দিয়ে তার ভেতরেই জামিনের বিধিবিধান ঢুকিয়ে গেছে। তাতেই চলছে আমাদের, চলছে পাকিস্তানেও। ভারতেও জামিন আছে ১৯৭৩ সালের নতুন করে সাজানো কার্যবিধিতেই।

আদালতে টাকাকড়ির জামানত রেখে তারিখে তারিখে হাজিরার শর্তে বিচারের আগে আসামি মুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারে। নগদ জমার বিধান আছে অনেক দেশে। আমাদেরও আছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১৩ ধারায়। চল নেই মোটে। টাকাকড়ি দেওয়ার কেবলই কথা জমা দেওয়া হয় বন্ডে লিখে। সে-কথা পাকা করতে থাকে জামিনদার (Surety)। শর্ত খেলাপ করে আসামি ভেগে গেলে বাজেয়াপ্ত হবে বন্ডে লেখা টাকা। আসামি বা জামিনদার যে-কারোর থেকেই কিংবা দুজনের থেকেই সে-টাকা আদায়যোগ্য (চুক্তি আইনের ১২৮ ধারা)। স্বেচ্ছায় না দিলে ঘটি-বাটি (অস্থাবর-সম্পদ) ক্রোক করে নিলামে বেঁচে আদায় করবে আদালত। তাতেও না হলে ছয় মাসের সিভিল জেল। কার্যবিধির ৫১৪ ধারার এসব বিধান কার্যকরে যাওয়া হয় না প্রায়। জামিনদার দুজনের একজন তো আইনজীবী নিজে। তার আয় আছে, সায় নেই দায় নিতে! আইনজীবীর সঙ্গে বিবাদে বিচার হয় না বলে তার দিকে নজরই দেওয়া যায় না। একযাত্রায় তো পৃথক ফল করা যায় না বিচারে; সুতরাং, গণ্যমান্য আরেকজনও অধরা। জামিন বাতিলে পলাতকের বিচার চালিয়ে শেষ। এই বিচার সারতেই পেরেশানির একশেষ, পরে ধরা পড়লেও আসামির থেকে জামানতের টাকা আদায়ে যাওয়া হয় না। অতএব, জামিনে মুক্ত ‘পালাইয়া গেলে কেহই দায়ী নহে’! কখন কাকে গ্রেপ্তার করা যায় আর জামিনে ছাড়া যায় তার বিধিবিধান আছে আমাদের ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধিতে। ভাগ করা হয়েছে অপরাধকে; গুরুতরগুলো অ-জামিনযোগ্য, লঘুগুলো জামিনযোগ্য। জামিনযোগ্য হলে বাছ-বিচার নেই, চাহিবামাত্রই ছাড়তে হবে জামিনে। পুলিশকেও বাধ্য করা আছে ৪৯৬ ধারায়। পুলিশ অবাধ্য হয়ে আদালতে সঁপলে বিচারকের আর অবাধ্য হওয়া চলে! জামিনযোগ্য অপরাধে জামিনে মুক্তি পাওয়া অনুগ্রহের ব্যাপার রাখেনি ব্রিটিশ, আইনি অধিকার করে গেছে। সাবেক প্রজা স্বাধীন ক্ষমতা পেয়ে আসামির অধিকার অস্বীকার করে! ম্যাজিস্ট্রেসি জুডিশিয়ারিভুক্ত হওয়ার আগের জমানায় জামিনযোগ্য অপরাধেও জামিন দেননি এবং দায়রায় আসামির জামিন হলেও তাদের কিচ্ছুটি হয়নি বলে বড়াই করতে দেখেছি প্রাক্তন দুজনকে। তাদের একজন কমিশনের চেয়ারম্যান আরেকজন সচিব হয়ে বসেন। বিস্ময়ের ঘোর কাটবে কি বিস্ফারিত হয় চোখ, এই জমানায়ও কখনো-সখনো তেমনই চলছে, কিচ্ছুটি হচ্ছে না দেখে। উল্টো আবার অ-জামিনযোগ্য ধারায় জামিন নামঞ্জুরে মুহূর্তেই হাকিমসুদ্ধ হুকুম নড়ে দায়রায়। কোন জমানায় ফেললে খোদা চক্ষুই না খুলে পড়ে!

অ-জামিনযোগ্য অপরাধে জামিন নেই নির্বিচারে, হবে বাছ-বিচার করে (৪৯৭ ধারা)। মৃত্যুদন্ডের কিংবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অপরাধে দায়ী বলে বিশ্বাসের জোরালো কারণ দেখা গেলে জামিন হবে না মোটে। বিশেষ ছাড় পেতে পারে শুধু নারী, শিশু (ষোলো বছরের কম বয়সী), অসুস্থ (সত্যি কি না তা বিশ্বাসের ব্যাপার!) এবং চলাফেরার শক্তিহীনরা (তদন্ত-বিচার এত দিন চললে আসামির চলার শক্তি থাকে!)। তবে, আপাতদৃষ্ট-নির্দোষের এক দিনও হাজতে না থাকার পাকা বন্দোবস্ত ব্রিটিশ রেখে গেছে আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে। বিনা পরোয়ানায় সন্দেহের বশে গ্রেপ্তারের ক্ষমতটাও অবাধ রাখেনি পুলিশের। সন্দেহ, সংবাদ, অভিযোগ যেটাই হোক যুক্তিযুক্ত ভিত্তি থাকতে হবে তার, যা দেখে বে-আক্কেল ছাড়া সবারই গ্রেপ্তার করাটাই সংগত মনে হবে। এমনই কথা ৫৪ ধারার। গ্রেপ্তার করে রাখতে চব্বিশটা ঘণ্টা সময় ফালতু দেয়নি ৬১ ধারায়। এর মধ্যে সেই ভিত আরও পাকা করতে হবে আসামি কোথায় কীভাবে কী ঘটিয়েছে তা খোলাসা করে। তাতে সন্দেহ ঘোর হলেও ঘোর অপরাধী বলে বিশ্বাসের ভিত খুঁজতে বাকি থাকলে সোপর্দ নয় আদালতে, পুলিশই ছাড়বে জামিনে। ১৬৭(১) ও ৪৯৭(২) ধারা মিলালে তাই আসে। সোপর্দ করলেও আদালত নিজের বিশ্বাসের ভিত না পেলে ছাড়বে জামিনে। অ-জামিনযোগ্য একটা ধারা বসিয়ে আদালতে সঁপে দিলেই তো শেষ নয়। বিচারকের সেটা দেখার আছে, যে-ঘটনার কথা বলা হয়েছে তা সত্যি সেই ধারায় পড়ে কি না, যে-কথা বলে আসামির ওপর দায় চাপানো হচ্ছে তাতে সত্যি তার দায় আসে কি না। ব্রিটিশ ৪৯৭(১) ধারায় ‘may’ (পারা না পারা) বসালেও ৪৯৭(২) ধারায় ‘shall’ (অবশ্যই) বসিয়ে গেছে। চব্বিশ ঘণ্টার পরেও আটক রাখার কারণ থাকলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করার আর ‘রিমান্ডে’ নিয়ে আসার বিধান দিয়ে মাত্র চারটি উপধারায় ১৬৭ ধারা শেষ করেছিল। তদন্তকালের জামিনও রেখেছিল ৪৯৭ ধারায়। ১৬৭ ধারার বাকি উপধারাগুলো লাগানো হয় ১৯৮২ সালে, ষাট দিনে শেষ না হলে তদন্ত বন্ধ আর আবার চালানোর ব্যবস্থা করতে। তদন্তকালে জামিনের বাড়াবাড়ি ঠেকাতে ১৯৯২ সালে ৫ নম্বর উপধারা সংশোধন করে এজাহারের দিন থেকে ১২০ দিন পার না হওয়া পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেটের হাত থেকে জামিন কেটে দেওয়া হয়েছে দায়রায়। এই কড়াকড়িতে প্যাঁচ বেঁধেছে ৪৯৭(২) ও ১৬৭(৫) ধারায়, বেঁধেছে ১৬৭ ধারার বাকি উপধারাগুলোরও সঙ্গে। জামিন দিতে চাইলে ৪৯৭(২) ধারা, না দিতে চাইলে ১৬৭(৫) ধারা দেখায়! জামিনযোগ্য অপরাধেই জামিন নামঞ্জুরের নয়াতত্ত্ব ঝাড়ছেন নাকি ম্যাজিস্ট্রেটই! আতঙ্কে আগাম জামিনের ভিড় বাড়ছে উচ্চ আদালতে। ‘কং দায়ী নহে’!

আদালত ব্যস্ত জামিনে, আইনজীবী ব্যগ্র জামিনে। জামিন হলে গ্রেপ্তারকারী নাখোশ। বিচারে সাজার চেয়ে হাজত খাটানোই যেন আমাদের ফৌজদারি! ঘটে যদি জামিনযোগ্য অপরাধ, মিথ্যার ভেজাল ভরে মামলা লাগায় অ-জামিনযোগ্য ধারাজুড়ে। কারটা হয়রানি করতে আর কারটা হয়রান হয়ে করা সেটা আঁচ করার আছে শুরুতে। ১৮০ দিনে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে, ৩৬০ দিনে দায়রায় বিচার শেষ না হলে জামিনের বিশেষ বিধান এসেছে ১৯৮২ সালে ৩৩৯ সি ধারায়। কারাদণ্ড হলে হাজতবাসটা কারাদণ্ডের মেয়াদ থেকে কাটা যাবে বলে গায়ে গায়ে শোধের ভরসা আছে কসুরের (১৯৯১ সালে ঢোকানো ৩৫-এ ধারায় ২০০৩ সালে আনা সংশোধনীতে)। মৃত্যুদন্ড কিংবা শুধু অর্থদন্ড হলে আর বেকসুরের খালাস হলে কিন্তু হাজতবাসের জন্য ‘কং দায়ী নহে’!

আইনের পরিপন্থীভাবে হাজতে রাখার দায়মুক্তি নেই পুলিশের কিংবা বিচারকের। দন্ডবিধিতে দন্ড বসিয়ে গেছে ব্রিটিশই (২১৯-২২০ ধারা)। মামলা হয় না চালানোর ভয়ে! আপাতদৃষ্ট-নির্দোষের জামিনে মুক্তি অনুগ্রহ নয়, আইনি অধিকার তার। নিরপরাধ একজনের ভোগান্তি ঠেকাতে নাকি দশটা (একশোটা নয়, হিসাব কষে দশটাই বলেছিলেন ব্রিটিশ আইনশাস্ত্রকার বিচারপতি উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন, ১৭২৩-১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ) অপরাধীরও ছাড়া পাওয়া চলে। নির্দোষ কারও এক দিনেরও হাজতবাসে ‘কং দায়ী নহে’ চলে না।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত