পুরো করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নাম ঘুরে-ফিরে আলোচনায় এসেছে। কভিড ১৯-এর সুতীব্র আঘাতে বিশ্বব্যবস্থা প্রভাবিত হয়েছে, শ্লথ হয়ে গিয়েছে অগ্রগতির চাকা। অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই করোনা প্রতিরোধী লড়াইয়ে সেনাপতিত্বের ভার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাঁধে অর্পিত ছিল। করোনা সংক্রমণের বিস্তারের কারণে দেশে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত একটি জরুরি অবস্থা তৈরি হয়। সংগত কারণেই বলবৎ হয়েছে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮। আমরা জানি আইনটি বলবৎ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই আইনের বিধিগুলোই প্রাধান্য পাবে। দেশের প্রচলিত অন্য আইনগুলোর কোনো ধারা, উপধারা বা বিধি সংক্রামক রোগ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রহিত হয়ে যাবে। সংক্রামক রোগ আইন অনুযায়ী করোনার প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মূলের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করার বিধান রয়েছে। এই কমিটির অন্যতম দুটি দায়িত্ব হচ্ছে :
১. ‘সংক্রামক রোগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিস্তার হইতে জনগণকে সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে কর্মকৌশল প্রণয়নে অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান।’
২. ‘আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান।’ (স্বাস্থ্য) অধিদপ্তরের দায়িত্ব হচ্ছে উপদেষ্টা কমিটির দেওয়া পরামর্শ ও নির্দেশ বাস্তবায়ন করা।
কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এখন পর্যন্ত নেতৃত্বদানকারীর ভূমিকায় দেশবাসী প্রত্যক্ষ করে নাই। পক্ষান্তরে এই মন্ত্রণালয়কে নিয়ে অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
গত বছর একটি দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় এক বছর হতে চলেছে সে কমিটির রিপোর্ট এখনো আলোর মুখ দেখে নাই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সংঘটিত দুর্নীতি নিয়ে দেশের মানুষের উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং হতাশা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বিষয়টির প্রতি গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। দেশের প্রথম শ্রেণির বাংলা দৈনিক প্রথম আলোয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দুর্নীতি নিয়ে বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টগুলো জনমানসে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে জনসম্মুখে গ্রহণযোগ্য কোনো বক্তব্য হাজির করতে সমর্থ হয়নি।
প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলাম এই রিপোর্টগুলোর নির্মাণশিল্পী। তিনি দায়িত্বপালন উপলক্ষে গত ১৭ মে বিকেল ৩টার দিকে সচিবালয়ে স্বাস্থ্যসচিবের কক্ষের সামনে গমন করেন। কর্তব্যরত কর্মচারীরা আগের অতিপরিচিত সাংবাদিক রোজিনাকে সচিবের সহকারীর কক্ষে নিয়ে আসেন। তিনি সেখানে আসন গ্রহণ করেন। সচিবের সহকারী কিছুক্ষণ পর কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান এবং কয়েক মিনিট পর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ফিরে আসেন। তারা ‘নথি চুরি’ ও ‘রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নথির ছবি তোলা’র অভিযোগে রোজিনা ইসলামকে অভিযুক্ত করেন। সচিবের সহকারীর কক্ষে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় তাকে আটকে রেখে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত ৮টার পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর নাম করে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিব্বির আহমেদ ওসমানী নামের একজন উপসচিব একটি ফরোয়ার্ডিং লেটার প্রদান করেন। রাত ১২টায় জানা গেল রোজিনার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ফরোয়ার্ডিং লেটারের সঙ্গে মামলায় করা অভিযোগের ব্যাপক গরমিল লক্ষ করা যায়। ইতিমধ্যে রোজিনার মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার দৃশ্য এবং তার বুকে চাপ প্রয়োগ ও গলা টিপে ধরার দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের সঙ্গে হওয়া পুরো ঘটনাটি জনসাধারণের মনে ব্যাপক ক্ষোভের উদ্রেক করে। দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার জন্য আক্রোশের কারণে রোজিনাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছেএ রকম একটি ধারণা জনমনে এবং সচেতনমহলে দৃঢ়বদ্ধ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিবাদী কর্মসূচিতে ধূমায়িত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে থাকে। পুরো ঘটনার অভিঘাতে দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি হয়।
রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন উপসচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী। রোজিনাকে আটক করে ফোন ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া, ব্যাগ ও ফোন তল্লাশি করা ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত ছিল বেশ কয়েকজনের একটি দল। যাদের কারও কারও চেহারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের ভাষ্য অনুযায়ী এরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছে। রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরি করে পালাচ্ছিল জেমস বন্ড ধরনের এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তাকে আটক করে বাগে আনতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি লেগে যায় আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চৌকস কর্মবীর বাহিনীর। এই বাহিনীর মুখপাত্র হলেন উপসচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী। নিশ্চয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী তিনি অভিযোগকারীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এত বীরোচিত কাজের জন্য ওসমানী সাহেবসহ পুরো দলকে ফুলেল সংবর্ধনা দেওয়া উচিত ছিল। সঙ্গে উচ্চপদস্থদের অর্থানুকূল্যে একটি ঈদোত্তর ভূরিভোজনের আয়োজন থাকতে পারত।
সেসব না-করে ১৮ মে শেষবেলায় তাকে অন্য দায়িত্বে বদলি করা হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে আরও পাঁচজন। একটি বিতর্কিত পরিস্থিতিতে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কাউকে তৎক্ষণাৎ বদলি করাকে ভালোভাবে নেওয়া হয় না। সরকারি চাকরিতে ঐতিহ্যগতভাবে সেটাকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। জনাব ওসমানীর বদলিকে অনেকে সে রকমই মনে করছেন। প্রশ্ন উঠেছে শিব্বির আহমেদ ওসমানীকে কি বলির পাঁঠা বানানো হলো? অনেকেই মনে করছে গভীর জলে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে রোজিনাকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমাদের প্রশ্নসত্য কি উদ্ঘাটিত হবে? থলের বিড়াল কি শেষ পর্যন্ত বের হবে?
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একজন মারমুখী নারী রোজিনা ইসলামের বুকে চাপ প্রয়োগ করছে, তার গলার নিচের অংশ চেপে ধরেছে। রোজিনা পেছনে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তার চোখে ভয়ের জীবন্ত প্রকাশ। পীড়নভয়ে ভীত একজন মানুষ তার ব্যাগ থেকে সবকিছু বের করে তুলে দিচ্ছে আক্রমণকারী নারীর হাতে। তামিল সিনেমার টর্চার চেম্বারের দৃশ্য যেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মারমুখী ওই নারীকে অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসা বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। নানা সূত্রে জানা গিয়েছে ওই নারী মিস জেবুন্নেসা নন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও বলেছেন নিপীড়নকারী নারী অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেসা নন। তাহলে সে কে? সে নিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যসচিবের অফিসে কর্মরত একজন। মন্ত্রী সচিবসহ সবাই তার পরিচয় জানে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘গলা চেপে ধরা’ নারীর পরিচয় প্রকাশ করে দিলেই তো একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা অহেতুক গ্লানির হাত থেকে মুক্তি পেতেন। মাননীয় মন্ত্রী বা সচিব মহোদয় কি নির্যাতনকারী নারীকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছেন?
তথ্যপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করলে কেবলই কু-তথ্য ও ভুলের বিস্তার ঘটবে। থলের ভেতরে কি কোনো বিড়াল আছে? দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে দুর্নীতি নামের একটি কালো বিড়াল থলের ভেতর ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে। যার খোঁজে রোজিনা ইসলাম বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন করেছেন এবং তার অনুসন্ধান জারি রেখেছিলেন।
দেশের মানুষের ন্যায়প্রত্যাশী আকাক্সক্ষা পূরণ করা গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান দায়িত্ব। আমরা মনে করি, একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির তদন্ত করা উচিত। দেশবাসীকে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না এখন পর্যন্ত প্রচুরসংখ্যক তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি।
মনে রাখা দরকার কল্যাণের প্রথম শর্ত হলো সত্যের প্রকাশ। সত্যকে ঢেকে রাখার চেষ্টা যত বেশি করা হবে অকল্যাণ ও অনিয়ম তত বেশি ঘটবে। মানুষ কল্যাণী প্রত্যাশী।
লেখক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ