শিক্ষকরা কি বসে বসে বেতন নিচ্ছেন

আপডেট : ২৮ মে ২০২১, ১০:৪৯ পিএম

ইউক্রেনীয় শিক্ষাবিদ ভাসিলি সুখমলিনস্কি (১৯১৮-১৯৭০) অনেক দিন আগেই বলেছিলেন, ‘আমরা এমন এক কালে বাস করছি, যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্ত না করে শ্রমনিয়োগ, মানবিক সম্পর্কের প্রাথমিক চর্চা, নাগরিক কর্তব্য পালন, কোনোটাই সম্ভব নয়।’ আর সে কারণেই তিনি এমন মানুষ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, ‘যারা হবে উচ্চশিক্ষিত, কর্মঠ, অধ্যবসায়ী।’ পুরোপুরি না-হলেও আমাদের  দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে তোলার পেছনে এ-রকম একটা আদর্শ ও উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। হয়তো এখনো করছে। বিভিন্ন সময়ে এই আদর্শ বাস্তবায়নে নানান বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে। এখন যেমন একটা বড় বাধা দেশের করোনা-পরিস্থিতি। 

এই করোনাকালে আমরা সবাই কম-বেশি বিপর্যস্ত, শারীরিক-মানসিক-আর্থিক নানাভাবে। করোনায় ব্যক্তিগতভাবে শোকের অভিজ্ঞতা হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সবাই নানাভাবে একটা নাজুক পরিস্থিতি পার করছি।

২. এটা সত্যি যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই অর্থনৈতিকভাবে একটা নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাও এখানে যোগ্যতা ও মেধার শক্তি নিয়ে লেখাপড়া করতে আসেন। এদের বেশিরভাগই দেখা যায়, টিউশনি করিয়ে, নোটবই লিখে, পত্রিকার প্রুফ রিডারের কাজসহ এটা-ওটা করে নিজেদের পড়াশোনার খরচ জোগান। এই খরচ মেটানোর পাশাপাশি অনেককেই তাদের বাড়িতেও বাবা-মাকে খানিকটা সহায়তা করতে হয়। এতে দোষের কিছু নেই। আজ যারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তাদেরও অনেকেই ছাত্রাবস্থায় এসব কাজ করেছেন। দুঃখের বিষয় এই যে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠিত মানুষ সেসব দিনের কথা ভুলতে পারলে স্বস্তি পান। আজকের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করতে চান না।

৩. করোনায় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সঙ্গত কারণে বন্ধ থাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিকভাবে নাজুক শিক্ষার্থীরা দুই দিক থেকে বিপদে রয়েছেন। প্রথমত, তাদের নিজেদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দ্বিতীয়ত, যে-অর্থনৈতিক উপার্জনটুকুর কথা বলেছি, সেটিও বন্ধ রয়েছে। আমাদের গ্রামগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি উপার্জনের সুযোগ একদমই নেই বললে চলে। ফলে, তারা যে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর বাস্তব জীবনের এই অনিশ্চয়তা থেকে অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার জন্ম নিচ্ছে। যে হতাশাটা মারাত্মকভাবে সংক্রামক।

৪. আবার এ-ও ঠিক যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মচারীদের সবাইকে করোনা ভ্যাকসিনের আওতায় না এনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়াটা হবে একাধারে হঠকারী এবং আত্মঘাতী। এর নেতিবাচক ফলাফল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই নয়, পুরো জাতিকে বহন করতে হবে। কিন্তু করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত আজ শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয়, দেশের প্রতিটি নাগরিককেই আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য ছিল না।

৫. দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। অনলাইনে ক্লাস হলেও পরীক্ষা-পদ্ধতি নিয়ে নানান জটিলতা, সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা এখন দারুণভাবে ক্ষুব্ধ। আর তাদের সেইসব ক্ষোভ যতটা না তারা সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের ওপর প্রকাশ করছেন, তারও চেয়ে বেশি দোষ দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকদের।

গত কয়েক দিনে ফেইসবুকে একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে, শিক্ষকেরা বসে বসে হারাম বেতন নিচ্ছেন। হারাম খাচ্ছেন!

৬. এটা ঠিক যে ক্ষোভ ও হতাশা বেশিরভাগ সময় মানুষকে যুক্তি-বুদ্ধি আর বিবেচনার পথ থেকে সরিয়ে দেয়। এক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটেছে বলে মনে করি।

শিক্ষকেরা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন?

তাহলে দিনের পর দিন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে অনলাইনে যে ক্লাসগুলো নেওয়া হলো, সেগুলো কি একেবারে বৃথা গেল? অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি অনেক শিক্ষক তাদের কোর্সের বিষয়গুলোর বইপত্র, পত্রিকার অংশবিশেষ পিডিএফ ফাইলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে নিয়মিত পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেসব পরিশ্রমের কি কোনো মূল্যই নেই? এসবের প্রস্তুতি নিতে শিক্ষকদের কি পড়াশোনা করতে হয়নি? প্রযুক্তিগত, কারিগরি বিদ্যা সামান্য হলেও কি আয়ত্ত করতে হয়নি? তাহলে বসে বসে বেতন নেওয়া, হারাম খাওয়ার কথা কীভাবে উঠতে পারে?

৭. বসে বসে বেতন নেওয়া?

ক্লাস নেওয়াটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটা বড় দায়িত্ব বটে; কিন্তু এর পাশাপাশি গবেষণা, লেখালেখির কাজে ব্যস্ত থাকাটাও তাদের চাকরির শর্তের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। এটা অনেক সময়ই আমরা মনে রাখি না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকেই যেমন সেটা ভুলে যান, আবার শিক্ষার্থীদের অনেকেরই হয়তো বিষয়টা জানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা বিষয়টি শুধুই ক্লাস নেওয়া আর ক্লাস করবার ওপর নির্ভর করে না। এই শিক্ষা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মনোজগতের নির্মাণের জন্য শিক্ষকদের মধ্যেও যে একটা ‘তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি’ গড়ে তোলার দরকার, এইটা ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাউলো ফ্রেইরি (১৯২১-১৯৯৭) ঠিকই বুঝেছিলেন। এর জন্য শিক্ষকদের জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চার বিষয়টিও খুব জরুরি।

৮. বসে বসে হারাম খাচ্ছেন?

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ মানে শিক্ষকদের জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চার বিষয়টি একেবারে থেমে রয়েছে, এমনটি যদি কেউ ভেবে থাকেন, তাহলে বলতেই হয়, তিনি ভুল ভাবছেন। তার চিন্তাপ্রণালীতে বেশ খানিকটা ভুল রয়েছে।

কেননা, বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় তো খুলবে। করোনা-পরিস্থিতি আশা করা যায় আর খুব বেশি স্থায়ী হবে না। তখন তো ঠিকই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিছিয়ে থাকা ক্লাসগুলোর জন্য শিক্ষকদের বাড়তি সময় দিতে হবে, তার জন্যও তো মানসিক প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন অনেক শিক্ষক। তারা দিনের পর দিন রাত জেগে পড়াশোনা করছেন; শুধু তা-ই নয়, নতুন করে শুরু করা সেইসব ক্লাসের অবয়ব কেমন হবে সেসব নিয়ে ভাবছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন। তারপরও কিনা শুনতে হবে এই অভিযোগ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বসে বসে বেতন তুলছেন?

৯. সময়টা এখন পারস্পরিক দোষারোপের নয়, এটা সবার আগে সবাইকে বুঝতে হবে। শিক্ষকেরা চাইলেই এখন যেমন বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিতে পারেন না, তেমনি খুলে দিলেই শিক্ষার্থীরা সব দলে দলে এসে হাজির হবেন সেটাও মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ, করোনার প্রভাব দেশের সর্বত্র। বিশ্ববিদ্যালয় তো দেশের, সমাজের বাইরে নয়। আর বাইরের নয় বলেই জনগণের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষককে কারাবরণ করতে হয়েছে এই করোনাকালে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে প্রতিবাদ জানানোর দায়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষককে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এইসবও তো মনে রাখতে হবে।

১০. সবাইকেই এখন শান্ত থাকতে হবে। বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। যেমন, রাজশাহীতে এখন করোনা-পরিস্থিতি রীতিমতো উদ্বেগজনক। এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিলে কোন সচেতন অভিভাবক তাদের সন্তানকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে সম্মত হবেন? হবেন কি আদৌও?

১১. ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যুদ্ধের নয়। বরং পারস্পরিক নিবিড় আর সৌহার্দ্যরে। এখানে কেউ কারও শত্রু নয়। শিক্ষার্থীদের জন্যই শিক্ষক, আবার শিক্ষকদের জন্যই শিক্ষার্থী। এভাবেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যুগ যুগ ধরে এগিয়ে চলেছে। সবাই সুস্থ ও নিরাপদে থাকুন।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত