আসামে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল

আপডেট : ২৬ জুন ২০২১, ১১:৫৪ পিএম

ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবরেটরি বা গবেষণাগার হচ্ছে আসাম। সেটা আজকের কথা নয়। অখণ্ড উপমহাদেশের ইতিহাসে মনুবাদী রাজনীতি নানা সময়ে নানা নামে বহুভাবে নিরীক্ষা চালিয়ে গেছে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে। আজ মওলানা ভাসানী নেই। তার লড়াইয়ের সৈন্যরাও কেউ নেই। অন্যদিকে প্রবল শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বিজেপি বা ভারতীয় জনতা পার্টি।

তখন বিজেপি ছিল না। কিন্তু মনুবাদ বা উচ্চবর্গের আধিপত্যবাদী রাজনীতি ছিল। ওই উচ্চকোটির রাজনীতির বিরুদ্ধে গরিব হিন্দু ও মুসলমানদের মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।

বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল হচ্ছে এক পা এক পা করে এগিয়ে তারপর আচমকাই সমস্ত শক্তি দিয়ে বিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া। ভোটে জেতা না জেতা বিজেপি রাজনীতির একটা দিক মাত্র। নিঃসন্দেহে ভোটে জিতলে সংবিধান বা আইনসভার দোহাই দিয়ে ‘গণতন্ত্রের’ নামে যাবতীয় অন্যায় অবিচার করার এক প্রকাশ্য যুক্তি বা যা করছি বেশ করছিএ রকম ভাব বুক ফুলিয়েই করা যায়। অবশ্য আমাদের দেশের অন্যান্য দলেরও একটা প্রবণতা আছে যে, ভোটে যখন জিতেই গেছি তখন যা ইচ্ছে করার অধিকার আমার আছে।

বিজেপি রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কিন্তু বরাবরই আরএসএস সংঘ পরিবারের হাতে। তাদের লক্ষ্য কিন্তু আগাগোড়াই এ দেশে হিন্দুরাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া। ফলে ভোটের হার-জিতের উত্তেজনায় অলক্ষ্যে পেছনে চলে যায়গোপনে গোপনে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং চালিয়ে কীভাবে দিন দিন রাজ্যগুলোতে উচ্চবর্গের দাপট বাড়ছে। এই উচ্চবর্গীয় রাজনীতি পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক, মনুবাদী ও সামন্তবাদী। আসামে আর একবার বিজেপি ক্ষমতায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তারা যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে সোচ্চার হয়েছে তার তালিকাটা অভিনব এবং গুরুত্বপূর্ণ।

ভোটের প্রচারেও অবশ্য বিজেপি খোলাখুলিই এই সব ইস্যু নিয়ে প্রচার করেছে। তা নিয়ে, আর তাদের সাম্প্রদায়িক তাস খেলার সাহস নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি তাত্ত্বিকদের বাহবাও কুড়িয়েছে তারা।

এখন জেতার পরে অর্থনীতি, শিক্ষা স্বাস্থ্যের মতো ‘তুচ্ছাতিতুচ্ছ’ বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার যে চারটি জিনিস সামনে এনেছেন তা হচ্ছে আসামে মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া, জমি থেকে ‘বেআইনি’ অভিবাসী উচ্ছেদ ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন চালু করা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাবাবেগে আঘাত লাগতে পারে বলে গো-হত্যা বন্ধ করা। একজন শিশুও বুঝবেন এই চার বিষয় নিয়ে অতি তৎপরতার অভিমুখ কোন দিকে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে দায়ী করা হয়। এই মিথ্যে কথা বলে বলে একটা মিথ তৈরি করা হয়েছে সারা দেশেই।

স্বাধীনতার পর থেকে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ফলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস পাল্টে গেছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন অনেকেই দলবদ্ধভাবে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। এই সহজ সত্য অনেক প্রগতিবাদীরাও মানতে না পেরে কোথাও কোনো ক্রাইম হলেই তার সঙ্গে মুসলিম ঘেটোর সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। ঠিক এইজন্য কলকাতার লাগোয়া মেটে বুরুজ খিদিরপুর বা রাজাবাজারের গায়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়।

এর ফলে সাধারণ মননে দুটো বিষয় ঢোকানো হয়১. থিকথিকে ভিড় করে থাকার মানে প্রবল জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ২. এত ভিড় মানেই ওপারের বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ।

আসামেও শিলচর হাইলাকান্দি করিমগঞ্জ ধুবড়ি লালা বরপেটা ও বিপুল বিস্তীর্ণ চর এলাকাকে মুসলিম ঘেটো বলে চিহ্নিত করে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিকামী মানুষদের মনে একধরনের ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুরনো কৌশল। দুটোই ডাহা মিথ্যা। একের পর এক সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে তা প্রমাণ করা কোনো কঠিন কাজ নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মুসলিমদের মধ্যে ইদানীং কম তা সরাসরি তথ্যেই স্বীকৃত। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে শিক্ষার একটা ভূমিকা থাকে। ফলে মুসলিম ও নিম্নবর্গের হিন্দুদের মধ্যে জন্মের হার বেশি। এর থেকে এটা স্পষ্ট যে এদেশের সরকার এলিট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ওপর ওপর সমস্যা দেখছে। গভীরে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। গরিব এলাকায় শিক্ষা প্রসারে সরকারের লক্ষ্য নেই। ইচ্ছে করে একেবারেই ভুয়ো অভিযোগে একটা সম্প্রদায়ের মানুষকে অপরাধের কাঠগড়ায় তোলা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের একমাত্র কাজ।

আসামে সরকারের সবচেয়ে গর্হিত কাজ লকডাউন, কভিভ মহামারীতে মানুষ যখন দিশেহারা তখন বেআইনি অভিবাসী উচ্ছেদের অজুহাতে জেলায় জেলায় গরিব মানুষের বাসস্থান ভেঙে দিয়ে তাদের নিরাশ্রয় করে দেওয়া। অধিকাংশ উচ্ছেদের পেছনেই সেই পুরনো আখ্যান যে জোর করে জমি দখল করে বেআইনি বসবাস।

আসামে ভূমিধস ও বন্যা বছর বছর যে লাখ লাখ জনগণকে আশ্রয়হীন করে তোলে সে ব্যাপারে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। সেই বাস্তুচ্যুত অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিতেই সে সক্রিয়।

এমনিতেই তথাকথিত উন্নয়নের প্রয়োজনে সারা দেশে প্রতি বছর যে লাখ লাখ লোক উচ্ছেদ হন তার একশ শতাংশই দলিত আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। আসামে এই উচ্ছেদ যেন এক সরকারি পার্বণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গো-রক্ষার নামে একটি সম্প্রদায়ের অধিকার কেড়ে নেওয়া তা কয়েক বছর ধরেই ভারতের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন লোকজন বুঝতে পারছেন। অবিভক্ত বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকায় একসময় বর্ণ হিন্দু জমিদারদের রাজত্বে গো-হত্যা নিষিদ্ধ ছিল। শুধু নিষিদ্ধ ছিল তাই নয়, কেউ খাবার জন্য গরু নিয়ে যাচ্ছে এই সন্দেহে তাকে জমিদারের কাছারি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে প্রবল অত্যাচার করা হতো এ রকম অজস্র নজির আছে।

দেশভাগের পেছনে এই গো-রাজনীতিরও যে একটা ভূমিকা ছিল তাও ইতিহাস আজ মেনে নিয়েছে। মুশকিল হচ্ছে শাসকরা এই সব ইতিহাস জানেন না। ক্ষমতার অহংকারে পুরনো সামন্তরাজ কায়েম করতে বড় বেশি তাড়াহুড়ো করেন। স্বৈরতন্ত্র যে কখনো শেষ কথা বলে না, এটা তাদের পারিষদেরা মনে করিয়ে দিলে গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত