শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলা ধ্বংসস্তূপ

নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১ লাখ হতে পারে : ইউএসজিএস

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৩:২১ এএম

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুই দফা শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রকম্পিত হয়েছে ভেনেজুয়েলা। স্থানীয় সময় গত বুধবার সন্ধ্যায় দেশটির ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরও শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় নিহতের সংখ্যা ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৯৭১ জন। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে বুধবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে জরুরি অবস্থা জারি করেন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস। তিনি জানিয়েছেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ তদারকির জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। দেলসি রদ্রিগেজ আরও বলেন, রাজধানী কারাকাসের কাছে সিমন বলিভার বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধ থাকবে। রেল যোগাযোগ এবং জরুরি নয় এমন সব কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আভাস দিয়েছে। ইউএসজিএসের ধারণা মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার থেকে এক লাখের মধ্যে হতে পারে। ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটি কারাকাস থেকে ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে মরোন এলাকায় উৎপত্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির উৎপত্তিও একই এলাকায়। মূল ভূমিকম্প দুটির পর থেকে কারাকাস ও অন্যান্য স্থানে প্রায় ২০টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে। ভেনেজুয়েলার কর্র্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো পরিসংখ্যা দেয়নি। কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তারা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বহু ভবন ধসে পড়েছে বলে খবর দিয়েছেন। উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার মধ্যে বাড়তে থাকা হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কারাকাসেও বহু ভবন ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পটিগুলো এতটাই শক্তিশালী ছিল যে উৎপত্তিস্থল থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়াতেও কম্পন টের পাওয়া গেছে। আরেক প্রতিবেশী দেশ ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছে, দেশটির কিছু অংশে ভূকম্পন টের পাওয়া গেছে।

ভেনেজুয়েলার যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরও অনেক স্থাপনা ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কিছু ভবনে সরাসরি গ্যাস সরবরাহও বন্ধ করার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম লা গুয়াইরা রাজ্য। বিপুলসংখ্যক ভবন ধসে পড়ায় ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ এই অঞ্চলটিকে ‘দুর্যোগপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেলসি রদ্রিগেজ জানান, একাধিক অঙ্গরাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সিএনএনের যাচাই করা একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, কারাকাস, উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মারসহ বিভিন্ন এলাকায় ভবন ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ের ঢালে কয়েকটি ভবন ধসে পড়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।

আতঙ্কিত বাসিন্দাদের পরিবার ও পোষা প্রাণী নিয়ে ভবন থেকে বের হয়ে রাস্তায় জড়ো হতে দেখা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন থেকে বেরিয়ে আসা কারাকাসের এক বাসিন্দা বলেন, পুরো দৃশ্য যেন কোনো ভৌতিক চলচ্চিত্রের মতো ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে সুনামির কোনো হুমকি নেই। ভূমিকম্পের পর পুয়ের্তো রিকো, ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ এবং ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে উপকূলীয় এলাকাগুলোর জন্য জারি করা সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ক্যারিবীয় প্লেট ও দক্ষিণ আমেরিকা প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ভূ-কম্পনগতভাবে একটি সক্রিয় এলাকায় অবস্থান ভেনেজুয়েলার।

রাস্তায় অসংখ্য মানুষ, ভয়ে ফিরছে না ঘরে

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আঘাত হানা ভূমিকম্পের পর পুরো শহরজুড়ে চরম আতঙ্ক ও বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রাণভয়ে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন এবং সম্ভাব্য আফটারশক বা অনুকম্পনের ভয়ে কেউ আর ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। গতকাল সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে কারাকাসের স্থানীয় সাংবাদিক নরিস আরগোত্তে সোতো এই আতঙ্কের চিত্র তুলে ধরেছেন। সোতো বলেন, ‘এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনগণের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে। আমরা সবাই নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি’। কারাকাসের চাকো মিউনিসিপ্যালিটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এই সাংবাদিক জানান, সেখানকার অন্তত আটটি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত