বেসরকারি হাসপাতালে সীমাহীন চিকিৎসা-ব্যয়

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২১, ১১:০৪ পিএম

আমাদের দেশে অনেক নিয়ম ও নীতি আছে, কিন্তু জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা কোথাও নেই। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আরও নেই। এক ধরনের জুলুমতন্ত্র কায়েম হয়েছে হাসপাতালগুলোতে। আর এ জন্য সর্বস্বান্ত হতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় নানা অনিয়ম আর বিপুল ব্যয়ের সংবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। শুধু করোনাকালে নয়, এইসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে আকাশছোঁয়া বিল হামেশাই হয়। কেবল চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের ওপরে এই বিশাল খরচ নির্ভর করে না, বেসরকারি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। সেখানে রোগীকে সুস্থ করার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই মুনাফা বড় হয়ে ওঠে। চিকিৎসায় প্রচুর অর্থব্যয়ের পরেও অনেক রোগী বাঁচেন না। বাঁচলেও, অনেককেই পরবর্তী সময়েও ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়, অনেককে আবার পরিজনদের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে হয়। প্রিয়জনরা যখন রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান, তখন তারা জানেন না কোন চিকিৎসায় কত খরচ হতে পারে। স্বজনকে বাঁচানোর তাড়নায় তারা সাধারণত হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে বলে থাকেন, ‘রোগীকে বাঁচানোর জন্য যা ভালো বোঝেন করুন।’

তখন কর্র্তৃপক্ষ যদি রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে বলে দেন, চিকিৎসার খরচ ২০-২৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে, এবং রোগী বাঁচলেও সে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারবেন না, তখন তার পরিজনরাই হয়তো ওই খরচের কথা ভেবে পিছিয়ে আসতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ চিকিৎসার ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নিতেন সেটা জানা গেলে, সাধারণ মানুষের পক্ষে একই পরিস্থিতিতে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো। রোগী এবং তার পরিজন উভয়েরই সুবিধা হতো। কিন্তু আমাদের দেশে তেমনটা হয় না। সম্ভাব্য ব্যয়ের বিষয়টা কখনোই রোগী বা তার পরিবারকে আগেভাগে জানানো হয় না। বরং তারা রোগীকে নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দেন। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেই বিপুল পরিমাণ টাকা চলে যায়। এত ব্যয়ের পর রোগীর পরিবার আর মাঝপথে ক্ষান্ত দিতে চায় না। তারা ধারদেনা করে হলেও চিকিৎসা চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, রোগী হয়তো সুস্থ হয়েছে, কিন্তু তার পুরো পরিবারটাই নিঃস্ব হয়ে গেছে। পরে সামান্য অসুখেরও চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য পরিবারটির আর থাকে না। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নিঃস্ব হওয়ার এ প্রক্রিয়া এখন খুবই সাধারণ ঘটনা।

সম্প্রতি একজন ভুক্তভোগী লিখেছেন, ‘বেসরকারি বড় হাসপাতালগুলো এক একটা দানবে পরিণত হয়েছে। একবার ভর্তি হওয়া মানে আপনি আর বের হতে পারবেন না। আপনার সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার সব ব্যবস্থা সেখানে আছে। পরিবারের হাতে থাকা শেষ টাকাটা নেওয়ার জন্য আপনাকে ‘লাইফ সাপোর্টে’ পাঠাবে। প্রথমে তারা মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। আপনার চিকিৎসার (নাকি হত্যা ও লুট করার) একটা পরিকল্পনা করে। শুরু হলো পরিকল্পনা অনুযায়ী এগুনো। একজন (ডাক্তার) এসে বললেন, পানি কম খাওয়াবেন, কিডনি ভালো না। একই দিন আরেকজন এসে বললেন, ‘পানি একটু বেশি খাওয়ান, লিভার ভালো না’। পরের দিন আরেকজন বলেন, রক্তে সোডিয়াম কম, লবণ খাওয়াতে হবে। পরে আরেকজন এসে জানালেন, লবণ খাওয়ানো যাবে না, কারণ হার্ট ভালো না। এরা সবাই কথিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য। আপনার পরিবারের কাছে যখন বিল আসবে তখন দেখা যাবে এই বোর্ড গঠনের জন্যও অনেক টাকা ধরা হয়েছে। আমার ভাই একটানা ২৪ দিন রাজধানীর একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেন। ২৪ দিন শেষে ভাই আমার হিমঘরে আর আমি ৪০ লাখ টাকার বিল হাতে দাঁড়িয়ে। আমার সামনে এক বিশাল শূন্যতা। বাইরের চাকচিক্য দিয়ে সাজানো মাফিয়া দানবগুলোর কোথাও জবাবদিহি করতে হয় না। স্বাস্থ্য খাতের অনেক অব্যবস্থাপনা নিয়ে ইদানীং অনেক আলোচনা হয় কিন্তু বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানগুলো দৃষ্টির বাইরেই থেকে যায়।’

বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ও চিকিৎসা-ব্যয় নিয়ে এমন অভিজ্ঞতা বহুজনের। ওদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোও অনিয়মের আখড়া হয়ে রয়েছে। সেখানে কোনো রেফারেন্স ছাড়া সিট পাওয়া দুষ্কর। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর, রোগীতে ঠাসা, দালালচক্রের হাতে বন্দি সরকারি হাসপাতালে নেহাত সংগতিহীন না হলে অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে যান না। বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হয় প্রায় বিনামূল্যে। করোনার ক্ষেত্রেও সরকার বলছে, চিকিৎসা তারা বিনামূল্যেই দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। অনেক পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হয়। ওষুধও বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। উচ্চমূল্যের ওষুধগুলোর ব্যয় রোগীকেই বহন করতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক কিছু ওষুধ আছে (যেমন-মেরোপেনেম) যেগুলো রোগীর অবস্থা যখন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে তখন দিতে হয়। এই ওষুধগুলোর উচ্চমূল্যের কারণে সরকারি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ওষুধের পুরো ডোজ রোগীকে দিতে পারে না। আবার কিছু কিছু দামি ইনজেকশন আছে যেমন রক্ত পাতলা করার একটি ইনজেকশন (এনোক্সাপিরিন) এটিও কিনে আনতে হয়। এর এক-একটি ইনজেকশনের দাম ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। যা রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে দৈনিক একটি বা দুটি দিতে হয়। আর মেরোপেনেম-এর একটি ওষুধের দাম ১৩০০ টাকা। যা এটি রোগীকে প্রতিদিন তিনটি করে দিতে হয়। রেমডেসিভির নামের আরেকটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ একটি রোগীকে সাধারণত ছয়বার দিতে হয়। এর প্রতিটি ইনজেকশনের দাম সাড়ে ৪ হাজার টাকা। করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলো। সিট ও আইসিইউ খালি না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে ভর্তি হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। তাই বেসরকারি হাসপাতালেও এখন রোগীর ব্যাপক চাপ। মহামারীর এই সময়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়া অনেকের অভিযোগ: পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাড়তি চিকিৎসা ব্যয় নেওয়া হচ্ছে রোগীদের কাছ থেকে। অনেকে চিকিৎসা শেষে বিল দিতে গিয়ে সংকটে পড়ছেন।

অনেক বেসরকারি হাসপাতালে এখন সাধারণ বেড নেই। সাধারণ বেডগুলোকে আইসিইউতে রূপান্তর করা হয়েছে। কেবিনের বিছানাতেই দুটি যন্ত্র লাগিয়ে একে আইসিইউ বেড বানানো হচ্ছে। আর আইসিইউতে থাকলেই অতিরিক্ত মেশিন বিল, অক্সিজেনের বিল দিতে হয়। অর্থাৎ সাধারণ হাসপাতালে একটি কেবিন বেডের দৈনিক খরচ যেখানে ৬ হাজার টাকা, এর সঙ্গে ওষুধসহ যাবতীয় খরচ গড়ে ১০ হাজার টাকা। সেখানে একই হাসপাতালে আইসিইউতে থাকলে দৈনিক গড়ে খরচ হবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এভাবে সাধারণ কেবিনে থাকা রোগীরও প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিল আসছে। আইসিইউতে দিনে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল আসছে। সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদেরও দিনে ১০ হাজার টাকার বেশি বিল আসে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বেড ভাড়ার পাশাপাশি নার্স, ওয়ার্ডবয়, চিকিৎসক সেবা মিলিয়ে আলাদা ২৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়। মধ্যমানের একটি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত আশঙ্কাজনক কোনো রোগী পাঁচ দিন থাকলে গড়ে বিল ২ লাখ টাকা অতিক্রম করে। আর ‘উচ্চমানের’ হাসপাতালে কোনো রোগী পাঁচ দিন থাকলে গড় চিকিৎসা খরচ ৫ লাখ টাকার বেশি হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক খবরে দেখা যায়, ভুক্তভোগী একটি পরিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হাসপাতালে করোনা রোগীকে ভর্তি করিয়ে ১২ দিনে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ গুনেছে।

করোনা চিকিৎসা নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কত বিল হবে তা নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। এটা দুঃখজনক যে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা না দিয়েও অনেক হাসপাতাল শুধু ব্যবসার জন্য রোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। আমাদের দেশের পুরো চিকিৎসা সেবাকেই যেন একটা মাফিয়াতন্ত্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যারা বাণিজ্যিক স্বার্থে দেশের ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোকে ব্যবহার করছে। এই মহামারীকালেও কি রোগীদের জিম্মি করে ‘রক্তচোষা’র এই প্রবণতা বন্ধ হবে না? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর কত দিন চোখ-কান বন্ধ রাখবে?

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত