সারা বিশ্বের মতো করোনা মহামারী মোকাবিলা করেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশের ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই করোনাকালীন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি তথা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এই প্যাকেজগুলো ব্যাংকনির্ভর, বলতে গেলে ঋণনির্ভর। এসব প্যাকেজের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এসব মোটামুটিভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, যা দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে ঘোষণা করা হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্যমতে, কভিড-১৯ মহামারীর কারণে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- পুনরুজ্জীবিতকরণ, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে বহাল রাখা এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণœ রাখার লক্ষ্যে সরকার এসব আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। পরে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) এর মাধ্যমে প্রদত্ত প্রণোদনা প্যাকেজ আরও বাড়ানো হয়, যার পরিমাণ মোট ১৭ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক এসিডি (এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট ডিপার্টমেন্ট) সার্কুলার ০২/২০২০ এর মাধ্যমে কৃষিঋণ প্রদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বেকার যুবকদের মধ্যে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের জন্য তহবিল বরাদ্দ এবং আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের জন্য তহবিল বরাদ্দ সংক্রান্ত প্রণোদনা প্যাকেজসহ আরও কিছু প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায় যে, কভিড-১৯ মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারীদের ৩ মাসের বেতন-ভাতা এবং ২০২০ সালের এপ্রিল ও মে মাসের ঋণের বিপরীতে সুদ ভর্তুকি বাবদ মোট ৫ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, এই সুবিধাভোগীর সংখ্যা যথাক্রমে ৩৮ লাখ ও ৭৩ লাখ। এছাড়াও ১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, এক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৭৩ লাখ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্যাকেজ ঘোষণার পর ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজের মোট বরাদ্দের প্রায় ৮৩ শতাংশ অর্থই ইতিমধ্যেই বিতরণ হয়েছে। এই প্রণোদনা প্যাকেজের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১ কোটি ২৪ লাখ গ্রাহক। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প, কৃষি খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, নিম্ন আয়ের পেশাজীবী কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শস্য ও ফসল খাতে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদ হারে কৃষিঋণ, ৫ বছর মেয়াদি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ঋণ, বঙ্গবন্ধু যুবঋণ, আনসার ও ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচন ঋণ খাতসমূহে মোট বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার ২১০ কোটি টাকা। এই খাতগুলো থেকে সরাসরি সুবিধাপ্রাপ্তের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ গ্রাহক হলেও পরোক্ষভাবে এর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। এর মধ্যে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে ২০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৯৫ হাজার ৭৩৩ জন। আর পরোক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১১ লাখ। কৃষি খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ। এই প্যাকেজের বিপরীতে মোট বিতরণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ৩ হাজার কোটি টাকা প্যাকেজের বিপরীতে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার গ্রাহক। শস্য ও ফসল খাতে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদ হারের কৃষিঋণ প্রদান প্যাকেজ হবে চাহিদা অনুযায়ী। এক্ষেত্রে মোট বিতরণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৬ কোটি টাকা; প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ গ্রাহক। আনসার ও ভিডিপি ব্যাংকের অনুকূলে কৃষি উৎপাদন ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে কৃষি খাতে ৩০০ কোটি টাকার বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ১৫৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণে ২০০ কোটি টাকার বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৭২ কোটি টাকা। এ উপখাতে মোট প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৭ হাজার।
মহামারীর শুরুতে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান পোশাক কারাখানার বেতনভাতা পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল সরকার। মালিকদের দাবির মুখে সেই ঋণ আরও বাড়িয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি করা হয়। প্রায় ১৮শ কারখানা মালিক এ ঋণ সুবিধা নিয়ে শ্রমিকদের বেতনভাতা দিয়েছেন বলে জানা যায়। মহামারীর শুরুতে কয়েকমাস কর্মীরা তাদের বেতন-ভাতা মোবাইল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পেয়েছেন। বেতনভাতাদির পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষও কিছু ক্ষেত্রে ই-ব্যাংকিংয়ের সুবিধা ভোগ করেছে। এ কথা সবার জানা যে করোনা মহামারীতে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যই ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জনে দেশের ব্যাংকি খাত যে ভূমিকা পালন করেছে, তা এখন কেমন যেন কিছুটা থমকে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য দেখা যাচ্ছে। কারণ বিনিয়োগের সুযোগ কমেছে। ব্যাংকগুলোর খরচ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও পর্যাপ্ত ছাড় দিয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোয় ঘাটতি কমিয়ে আনা গেলেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে ব্যাংকিং খাতের আরেকটু সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত। পাশাপাশি গ্রাহকদের ব্যাংকিং খাতকে সাহায্য প্রদানে আরও উদার মানসিকতা প্রদর্শন করা দরকার। দেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পেছনে ব্যাংকিং খাতের অনেক অবদান রয়েছে; কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাত নিজেই ধুঁকছে, যার নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপরই পড়েছে। এর মধ্যে দেশের অর্থনীতির জন্য বড়সড় ধাক্কা হয়ে আসে করোনাভাইরাস মহামারী। শিগগিরই এই মহামারীর শেষ দেখা না গেলেও একে মোকাবিলা করেই আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতকে আবারও সামনে এগিয়ে আসতে হবে। এই এগিয়ে আসার পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার।
বিরাজমান বৈরিতার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক অন্যান্য দেশের তুলনায় সন্তোষজনক মাত্রায় অবস্থান করছে বলা যায়। যেমন, এই মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশে ৫.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে যেখানে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ ধারণা করেছিল জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে যথাক্রমে ১.৬ শতাংশ এবং ২ শতাংশ। ওয়েজ আর্নার রেমিট্যান্স-এর পরিমাণ ২০২০-২০২১ অর্থবছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এপ্রিল ২০২১ এর শেষার্ধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৪৪.৯৫ বিলিয়ন ডলার যা ২০২০ এর এপ্রিলের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। মুদ্রাস্ফীতির হার ৫.৪৭ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের প্রাক্কলিত বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, ব্যাংকিং খাতে যদি শ্লথগতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়, তাহলে তা সামগ্রিক আর্থিক খাতকেই গ্রাস করে। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের সংকট সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতে ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদনশীলতা, অন্যান্য অর্থনৈতিক তৎপরতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, এমনকি জীবনযাত্রা সব জায়গায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম অর্থনৈতিক তৎপরতাকে গ্রাস করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমরা দেখেছি ২০০৭-০৮ সালের বিশ্বমন্দায়। তখন এ খাতে অনেক দুর্নীতি ও অনিয়ম সংঘটিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহনির্মাণ খাতে ধস এবং সেখানকার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলোতে ধস নেমেছিল। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। মহামারীকালে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য যে ঋণ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল তার ধরন ছিল চলতি মূলধন, যা দিয়ে দৈনন্দিন খরচ মেটানোর কথা। ঐ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছিল, এই প্রণোদনার ঋণের টাকায় অন্য ঋণ শোধ করা যাবে না। ঋণের টাকার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। তবে কেউ কেউ এই পরোয়া না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রণোদনার টাকা ভিন্ন ভিন্ন কাজে লাগিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের গোচরীভূত হওয়ায় তারা এখন নড়েচড়ে বসেছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রদত্ত ঋণ যথাযথ খাতে ব্যবহার না হয়ে কিছু কিছু অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ঋণ দিয়ে ঋণগ্রহীতার অন্য কোনো ঋণের দায় সমন্বয় করা হচ্ছে। এছাড়া মঞ্জুরিকৃত ঋণের টাকা ছাড়ের ক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যাংক সময়ক্ষেপণ করছে মর্মে অভিযোগ রয়েছে। এখন দ্বিতীয় দফায় ঋণ বিতরণ শুরুর আগে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে আবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। ঋণের ব্যবহার যাতে যথাযথ পরিপালিত হয়, সেদিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশে চলছে করোনা মহামারী। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নানা ধরনের লকডাউন, বিধিনিষেধে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। বড় থেকে ছোট অনেক শিল্পকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হয়েছে আর্থিক দুর্যোগ।
মহামারীতে সৃষ্ট এই বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সরকার এখন পর্যন্ত ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এসব প্যাকেজের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হচ্ছে স্বল্প সুদে ঋণ। অর্থনীতিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার চলমান মহামারীর শুরু থেকেই সচেষ্ট ও সতর্ক দেশের বড়, মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তাদের নিয়ে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপৎকালীন অর্থ প্রদানে সরকার সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি প্রদর্শন করেনি। শর্ত অনুযায়ী প্রাপ্ত ঋণের অর্থ প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন হিসেবে ব্যয় হওয়ার কথা। দুঃখজনকভাবে শর্ত ভঙ্গ করে অনেক অর্থ চলে যাচ্ছে ভিন্ন খাতে। এটা স্পষ্টতই অপব্যবহার ও অনিয়ম বৈকি। বিশেষ এক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে দেওয়া হচ্ছে এ প্রণোদনার অর্থ। এর অপব্যবহার ও অনিয়ম কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
লেখক ব্যাংকার ও গবেষক