আসছে নভেম্বরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজক দেশ যুক্তরাজ্য। এর আগে ২০২০ সালে করোনার কারণে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়। ২০২১ সালের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত হচ্ছে, ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তির পর এই প্রথম পাঁচ বছরের প্রথম চক্র সম্পন্ন হওয়ার পর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেকটি দেশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করবে। প্রতি পাঁচ বছর পর পর এই লক্ষ্যমাত্রাসমূহ পর্যালোচনা হওয়ার কথা। এই চুক্তিতেই এই শতাব্দীর মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
২০২০ সালের ব্লুমবার্গ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এই পৃথিবী ইতিমধ্যে শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী যুগ থেকে প্রায় ১.২ ডিগ্রি উত্তপ্ত অবস্থায় আছে আর যারা প্রতিফলন দেখে যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘন ঘন বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা যত বাড়বে ততই পৃথিবীব্যাপী বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে। ২০২১ সালের আইপিসিসি-এর প্রতিবেদনে এ জলবায়ু পরিবর্তনকে বৈজ্ঞানিকভাবে অনেক দৃশ্যমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে আইপিসিসি প্রকাশিত এক বিশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছিল, এই শতাব্দীর মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রির বেশ নিচে রাখার জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ অবস্থা অর্জন করতে হবে। অন্যথায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সীমা ২০৩০ সাল থেকে ২০৫২ সালে মধ্যে অতিক্রম হয়ে যাবে। আইপিসিসি-এর নতুন রিপোর্ট অনুযায়ী এখনই যদি কার্বন নিঃসরণ কমানো না যায় তাহলে ২০৪০ সালের মধ্যেই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ওই সীমারেখায় পৌঁছে যাবে এবং এক দশকের মধ্যেই ১.৫ ডিগ্রি সীমা অতিক্রম করতে পারে। এই একই রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই শতাব্দীর মধ্যে অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলার মধ্য দিয়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ২ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে যদি না সঠিক উদ্যোগ না গ্রহণ করা হয়।
কার্বন নিঃসরণের জন্য বিশ্বের বড় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর দায় ও দায়িত্ব অনেক। কারণ এই দেশগুলোই মূলত কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী। এই দেশগুলোর মধ্যে চীন একাই ২৮ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে থাকে, দ্বিতীয় স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ শতাংশ, তৃতীয় স্থানে ভারত ৭ শতাংশ। বিশ্বের ২০টি দেশ ৭৯ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে থাকে, বাকি দেশগুলো সবাই মিলে করে থাকে ২১ শতাংশ। এই কার্বন নিঃসরণের একটি বড় কারণ হচ্ছে ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত ভোগবাদিতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও শক্তিদ উৎপাদন। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ শুধু পশ্চিমা দেশগুলোই করছে না। চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো এখন কার্বন নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যে দেশগুলোই দায়ী থাকুক না কেন, এর জন্য দায়ী সব দেশের ধনিক শ্রেণি। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা সম্পদ যেভাবে কেন্দ্রীভূত করেছে সেটা তাদের এক ধরনের ভোগবাদী জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে তুলেছে। তাই বলা যায়, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বাড়তেই থাকবে। ২০২১ সালের আইপিসিসি রিপোর্টে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখনো সম্ভব কিন্তু এর জন্য চাই মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কাঠামোগত পরিবর্তন। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভুক্তভোগী হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, নানা কারণেই যাদের জীবন বিপর্যস্ত। এই জনগোষ্ঠীর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা কম ফলে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এদের অনেকেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে না। ফলে যা হয় এই জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ অসহায় ও হতদরিদ্র অবস্থায় জীবনযাপন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ার করণে সেখানকার জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। নদীভাঙনের কারণে অনেককেই বাস্তচ্যুত হতে হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনের আলোচনার একটি বড় বিষয় হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া। প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী এই ক্ষতি মোকাবিলায় ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে প্রতি বছর একশ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা। কিন্তু প্যারিস চুক্তির পর ধনী দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আসছে জলবায়ু সম্মেলনে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে। তত্ত্বগতভাবে বলা হচ্ছে, এই আর্থিক সাহায্যের একটি অংশ হতে হবে অভিযোজনের জন্য এবং আরেকটি অংশ হতে হবে প্রশমনের জন্য। আবার আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখি এই আর্থিক সাহায্য ধনী দেশগুলো নিজেদের প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আর্থিক সুবিধা অর্জনের জন্য শর্তযুক্তভাবে ব্যয় করার প্রস্তাব দিয়ে থাকে।
শুধুমাত্র অভিযোজন ও প্রশমনের জন্য জলবায়ু তহবিলের ব্যয় যতটা যুক্তিসম্মত তার থেকে বেশি যুক্তিসম্মত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দরিদ্র অবস্থার মধ্যে জীবন যাপন করছে তাদের সুরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে নিয়ে আসা। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে কার্যকরী সামাজিক সুরক্ষা তাদের যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিসমূহ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে একই সঙ্গে এই তহবিলের মাধ্যমে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। আরেকটা বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শুধুমাত্র অন্যদের দায়ী করেই শেষ করা যাবে না নিজেদের জায়গা থেকেও করণীয় বিবেচ্য বিষয়সমূহ সামনে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের এখন নিজেদের জীবন যাপনের ধরন নিয়ে আলোচনা করার সময় এসেছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে জলবায়ু সম্পর্কিত বিশ্ব সম্মেলন এই করোনাকালীন বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাধর দেশগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে। যেখানে বিশ্বের প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের জীবনের করুণ গল্পগুলো খুব একটা জায়গা করে নিতে পারবে না। এ জন্য সম্মেলনের বর্তমান কাঠামো একটি বড় প্রতিবন্ধকতা এখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ও জীবনের গল্প বলার কোনো সুযোগ নেই। অংশগ্রহণের সুযোগ আছে তাদেরই, যারা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করতে পারে বা যারা বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর রাজনৈতিক মঞ্চে নিজেদের হাজির করতে পারে।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
psmiraz@yahoo. com