দ্রোণাচার্য হাসান আজিজুল হক

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২১, ১০:১৭ পিএম

ক’মাস ধরে বন্ধ কলমটা হাতে নিয়ে আর খুলবেন না হাসান আজিজুল হক। অন্তত চার দশক ধরে যিনি বাংলাদেশের ছোটগল্প লেখকদের কাছে দ্রোণাচার্যের ভূমিকায়। সেই ছোটগল্প লেখক পা-ব-কৌরব হলে একেবারে প্রকাশ্য তার শিষ্যসাবুদ। আর একলব্যের মতন গহিন অরণ্যবাসী হলে তিনি চেনেন না তার সেই ছাত্রকে। অনুমান করি, এক্ষেত্রে একলব্যের সংখ্যাই বেশি। এই বেশি অনুমাননির্ভর কোনো সংখ্যা নয়, অনুমানের বাইরেও তো একপ্রকার অনুমাননির্ভরতা থাকে, সেভাবে ভেবে নেওয়া। এই হিসেবে হাসান আজিজুল হক হয়তো শুরুতে তাদের জানেন না বা চেনেন না, দেখা হওয়ার ও জানার সুযোগও ঘটে না, ঘটে না সেসব একলব্যের সঙ্গে কোনো প্রকার সংযোগ।

কথাগুলো মহাভারত থেকে একপ্রকার রূপকের আশ্রয়ে হাজির করলাম বটে, কিন্তু এর কিছু বিস্তার তো নিজের ও নিজেদের কালের। অগ্রজ লেখকদের অনুমান থেকে অভিজ্ঞতা ও অভিযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া। তাতে এই রূপকের অভিপ্রায়ের বাইরে নিজেদের গল্প লেখার অভিজ্ঞতার কোনো না কোনো হিসাবও মিলিয়ে দেখা হবে।

ভীম অর্জুন আচার্য দ্রোণের ছাত্র, ছাত্র দুর্যোধন আর দুঃশাসনও। বাইরে থাকে প্রথম পার্থ কর্ণ অধিরথ সূতপুত্র। একদিন কুরুকুলের রাজকুমারেরা জঙ্গলে গেলে সেখানে তাদের কুকুরকে বাণ মেরে বাকরহিত করে দিলে তারা আবিষ্কার করে একলব্যকে। দ্রোণাচার্যকে রাজপুত্ররা শুধায়, বাণ ছোড়ার এই কৌশল তাদের কেন শেখাননি তিনি! যা জানে ওই ভূমিপুত্র অজ্ঞাতকুলশীল একলব্য। আবিষ্কৃত হয়, একলব্যের কুটিরের সামনে দ্রোণাচার্যের মূর্তি। রাজকুমার সে নয়, শস্ত্রগুরু দ্রোণের কাছে অস্ত্রচালন শেখা সম্ভব হয়নি তার, তাই এই মূর্তি বানিয়ে এভাবে শরচালন শিখেছে সে। এরপর আছে গুরুদক্ষিণার চরম নিষ্ঠুর নিদর্শন।

মহাভারতের কাহিনী মনে রেখে, হাসান আজিজুল হককে দ্রোণাচার্য হাসান আজিজুল হক উল্লেখের কারণ এখানেই। পৈতৃক নিবাস তার বর্ধমান, দেশবিভাগের কয়েক বছর পরে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে এসে ভর্তি হয়েছেন খুলনার ব্রজলাল কলেজে, তারপর রাজশাহীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। কাজ করেছেন, অর্থাৎ পড়িয়েছেন এদেশের দক্ষিণ ও উত্তর মিলিয়ে সিরাজগঞ্জ, খুলনা আর রাজশাহীতে। স্বাধীন বাংলাদেশ আর অখ- বাংলার ভূগোল মিলিয়ে এই জায়গাটুকু যদি মাইল কি কিলোমিটারে আটকে দিতে চাই তাহলে তা কোনোভাবেই শ’ তিনেক চারেকের বেশি হবে না। খুলনার উত্তরে রাজশাহী, রাজশাহীর পশ্চিমে বর্ধমান বৃহত্তর বাংলাদেশকে মনে রেখে একটি বাহু বাড়িয়ে দিলে তার পৈতৃক ভিটে যবগ্রাম থেকে রাজশাহী হয়ে মধ্যবঙ্গ ঢাকা সেখানে পূর্ব বাংলা কি পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের একজন লেখকের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা। মোটামুটি এই তার জগৎ।

কিন্তু দ্রোণাচার্যের যে হিসাবটা নিজের ভেতরে লতিয়ে উঠছে, তা নাড়িয়ে দেখলে দেখা যায়, খুলনা কি রাজশাহীতে কেউ কেউ তাকে খুব কাছে পেয়েছেন। ধরে নিতে পারি, মহাভারতের ওই কাহিনীর মতো। একেবারে সামনে, আচার্যর সামনে শিষ্যকুল, পান্ডব কৌরব। এই পান্ডব এই কৌরব সবই বলার জন্যে বলা, রূপকের আশ্রয়। এর বাইরে, গোটা বাংলাদেশে যারা কাছ থেকে তাকে দেখেননি, সামনে পাননি (সে সুযোগ সাধারণত লেখার শুরুতে ঘটেই না) তারা অন্তত তার লেখা পড়ে, আগের প্রজন্মের লেখকদের কাছে শুনে আর সাহিত্যিক অভিযাত্রী বন্ধুদের কাছে থেকে জানা অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তৈরি করে নিচ্ছেন এক গড়ন সেই কৌশলটি তখন তাদের কাছে এক একক একলব্যের। যখন গল্প লিখতে শুরু করেছেন তারা, যখন গল্প লিখবার কৌশলগুলো হাতে তুলে নিতে মশগুল নিজের কাছে তখন, রাস্তায় মানুষ দেখে, প্রকৃতিতে বৃষ্টি খরা শীতও দেখে। গাছের পাতা দেখে, পাতা ঝরাও দেখে। পিতার সঙ্গে কন্যাকে দেখে। খাল খনন হতে দেখে। দাঁড়িপাল্লায় ভাত মাপতে দেখে। হাসপাতাল দেখে। কৃষককে গরু কিনতে যেতে দেখে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছে গাছতলায় মা ও মেয়েকে দেখে। ওই ক্যাম্পাসে পিতা আর কন্যাকেও দেখে। রাষ্ট্রপতিকে দেখে। যুবসমাজ দেখে। যুব উন্নয়ন কমপ্লেক্স দেখে। কত শত দেখা! এর বাইরে এই বাংলায় দেখার তো কোনো শেষ নেই। ওই তরুণ গল্পলেখক এই একটু আগেকার দেখাগুলোর সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখে, নিজের দেখার চোখ খুলে, চোখের সামনে এনে, চশমা খুলে বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তর নদী জল সব দেখে, দেখে শতেক শোষণ আর বঞ্চনা, খেতে না পাওয়া মানুষ আর খেতে পেয়ে পেয়ে বা খেয়ে খেয়ে পেট ফুলে ঢোল মানুষ আর এক একখানা গল্পে তা লিপিবদ্ধ করার নিজস্ব প্রয়াস নেয়। কিন্তু তখনই বাধে গোল।

রবীন্দ্রনাথ হয়ে বিভূতি তারাশঙ্কর মানিক বাড়ুজ্জের গল্পের পৃষ্ঠা ততদিনে কম উল্টানো হয়নি। অথবা, একটু উল্টো হাঁটার চেষ্টায় জগদীশ গুপ্ত থেকে প্রেমেন মিত্তির কি কমলকুমার থেকে ওয়ালীউল্লাহ-ও। খুব কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার আরও লেখকের লেখা তো আছেই। কিন্তু নিজেদের সেই নবিশি অভিজ্ঞতা থেকে জানি, অনেকের সামনে তখন দ্রোণাচার্যের মতো শস্ত্রশিক্ষক হয়ে উপস্থিত থেকেছেন হাসান আজিজুল হক।

অল্প বাতাসে কলাপাতার একবার বুক দেখানো পিঠ দেখানো অভিজ্ঞতা শুধু নয়। কিংবা সরল হিংসার খোঁজও নয়, নয় সারা দুপুরের অভিজ্ঞতাও। তখন নিজস্ব চেষ্টায় সেই অক্লান্ত একলব্যের সামনে সাদা পৃষ্ঠা কিন্তু নিজের ভেতরের চেষ্টায় কোথায় যেন এক স্থিরীকৃত দৈর্ঘ্য-প্রস্থের হিসাব গল্প লিখতে হবে ও রকম। ফলে, বই পড়ে শেখা, বইয়ের গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা আর এর সঙ্গে নিজের চেষ্টা সব মিলেমিশে গেলেও হাসান আজিজুল হক গাঁট হয়ে সামনে বসে থাকেন, হাতে গুরুর ছড়ি, প্রত্যেকে ভিন্ন এক একজন একলব্য। একই সঙ্গে শরচালন যেমন শিখছে, ওদিকে কাদামাটি দিয়ে হাসান আজিজুল হকের থেকে দূরে বহু দূরে বসে তার মূর্তি বানিয়ে নিজের চেষ্টাকে দক্ষিণা হিসেবে সমর্পণ করে চলেছে।

ওপরের কথাগুলো সমষ্টিতে মিলিয়ে বললেও, নিজের কাছে একেবারে একান্তে তা ই ছিল। তা ই আছে। আত্মজা ও একটি করবী গাছের গল্পগুলো লেখা হয়েছিল সংবাদপত্র বিছানো একটি এবড়ো-থেবড়ো টেবিলে, সে টেবিল তখন হয়ে যায় যেন নিজের টেবিল। একটি সরু নিবের শেফার্স ঝরনা কলমে হাফ একসারসাইজ খাতায় লিখেছেন শকুন । যেন, নিজের গল্প লিখবার চেষ্টায় সেই খাতার কালো কালো পেঁচানো দুষ্পাঠ্য অক্ষর হয়ে ওঠে নিজের লিখবার, লেখা শিখবার কৌশল। আর প্রকাশমাত্র তার এক একটি লেখা পড়ার আকুতি বলে দেয়, এই একলব্যত্ব কোনোভাবে ছেড়ে যাওয়ার নয়। আচার্য দ্রোণ তো জানতেন না একলব্যের সাকিন, কিন্তু একলব্য জানত গুরুকে। তেমনি হাসান আজিজুল হকও জানেন না, গত চার দশক ধরে আর কতজন একলব্য একটি গল্প লেখার চেষ্টায় কী গভীর নিষ্ঠায় তাকে দ্রোণাচার্য মেনে শরচালন শিখছে। হয়তো, সে শেখা কোনোভাবে হয়ে উঠছে না। হয়তো হবেও না। অথবা, হবে গুরুর চেয়েও নিপুণ। কিন্তু, দূর থেকে গুরু হিসেবে তাকে একটি একটি গল্প লিখবার ভেতর দিয়ে প্রণতি জানাতে কোনো বাধা নেই তার।

বিনম্র শ্রদ্ধা, দ্রোণাচার্য হাসান আজিজুল হক। একলব্যেরা এখনো আপনাকে সামনে রেখে অস্ত্রচালন শিখবে, কিন্তু আপনি আর তা জানবেন না!

লেখক কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত