বিকেল গড়াতেই বদলে যেতে থাকে রাজশাহী নগরীর পদ্মার পাড়ের চেনা দৃশ্য। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে আসে। নদীর পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। কেউ আসেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। কেউবা প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটেন নদীর পাড় ধরে। শিশুরা মেতে ওঠে খেলায়। কেউ বসে গল্প করেন, কেউ তাকিয়ে থাকেন পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে।
সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লে নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আভা। হালকা বাতাসে দুলতে থাকে নৌকা। নদীর বুক থেকে ভেসে আসে মাঝিদের ডাক। প্রকৃতির এই আবহে কর্মব্যস্ত নগর জীবনের ক্লান্তি কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখতে পদ্মার পাড়ে ভিড় করেন মানুষ।
বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পদ্মার পাড় যেন পরিণত হয় নগরবাসীর উন্মুক্ত বিনোদনকেন্দ্রে। শুধু রাজশাহী নগরীর মানুষই নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেকে ছুটে আসেন এখানে। ছুটির দিন ভিড় বাড়ে আরও বেশি।
রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মা নদীর প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে এমন এক বিনোদনবলয়। এর মধ্যে টি-বাঁধ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এর বাইরে আই-বাঁধ, বড়কুঠি, ফুদকিপাড়া ও ফুলতলা এলাকাতেও বিকেল হলেই জমে ওঠে মানুষের আড্ডা।
নদীর পাড় ঘিরে জীবিকার গল্প : পদ্মার পাড়ে মানুষের এই আনাগোনা শুধু বিনোদনের সুযোগই তৈরি করেনি, গড়ে তুলেছে ছোট একটি অর্থনৈতিক বলয়ও। বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে বসে অস্থায়ী দোকান। কোথাও ফুচকা-চটপটি, কোথাও ঝালমুড়ি, মুড়িভাজা কিংবা বাদামের পসরা। শিশুদের আকৃষ্ট করতে থাকে খেলনা ও নানা সামগ্রী। কোথাও আবার বসে কসমেটিকসের দোকান।
দর্শনার্থীর সংখ্যা যত বাড়ে, ততই বাড়ে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যস্ততা। কয়েক ঘণ্টার এই বিকিকিনিই অনেকের কাছে হয়ে ওঠে দিনের গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। কেউ প্রতিদিন দোকান নিয়ে বসেন, কেউ আবার শুধু বিকেলের কয়েক ঘণ্টার জন্য পসরা সাজান।
ঝালমুড়ি বিক্রেতা তানজিলা বেগম বলেন, ‘বিকেল হলেই মানুষজন আসতে শুরু করেন। পরিবার নিয়ে যারা আসেন, তাদের অনেকেই ঝালমুড়ি খান। এই ব্যবসা করেই যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার।’ সময়ের সঙ্গে পদ্মার পাড়ে মানুষের আনাগোনা বাড়ায় ব্যবসার পরিধিও বাড়ছে বলে জানান তিনি।
নদীর পাড়ের মুক্তমঞ্চ এলাকায় কসমেটিকসের দোকান চালান নিলা বেগম। প্রায় ৫ বছর ধরে সেখানে ব্যবসা করছেন তিনি। নিলা বলেন, সময়ের সঙ্গে পদ্মার পাড়ে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। ফলে ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
খেলনা বিক্রেতা জালাল উদ্দিন বলেন, ‘মুক্তমঞ্চের এই এলাকায় দোকান দেওয়ার পর থেকে ভালো আয় হচ্ছে। এই ব্যবসা করেই সংসার চলে। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছি।’
ছোট ছোট এই দোকানের আড়ালে তাই শুধু কিছু পণ্যের কেনাবেচা নয়, জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের সংসারের হিসাব। পদ্মার পাড়ে মানুষের অবসর কাটানোর অভ্যাসের সঙ্গে সেখানে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি।
নৌকায় ভেসে নদীর বুকে : পদ্মার পাড়ের বিনোদনের অন্যতম বড় আকর্ষণ নৌকাভ্রমণ। বিকেল যত বাড়ে, নদীতে ততই বাড়ে নৌকার ব্যস্ততা। পাড়ে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করে থাকে নৌকা। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে তাতে ওঠেন দর্শনার্থীরা।
কেউ অল্প সময়ের জন্য নদীতে ঘুরে আসেন। কেউ আবার পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে দীর্ঘ সময় নৌকায় কাটান। বিকেলের শেষভাগে সূর্যের আলো যখন নদীর পানিতে পড়ে, তখন নৌকায় বসে সেই দৃশ্য উপভোগের আকর্ষণও বাড়ে।
দর্শনার্থীর এই আগ্রহের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে মাঝিদের জীবিকা। প্রতিদিন বিকেলে নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন তারা। যাত্রী নিয়ে নির্ধারিত সীমানার মধ্যে ঘুরিয়ে আবার পাড়ে ফিরিয়ে আনেন। যাত্রী বাড়লে বাড়ে তাদের আয়ও।
পদ্মার এক নৌকার মাঝি হোসেন আলী বলেন, ‘পদ্মা নদী আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। আমরা তাদের সুন্দরভাবে নৌকায় তুলি। আমাদের যে নির্ধারিত সীমানা আছে, তার মধ্যে ঘুরিয়ে আবার এখানে নামিয়ে দিই। নৌকা চালিয়েই আমাদের জীবিকা নির্বাহ হয়। তবে, নদীতে যখন পানি কম থাকে, তখন আয় বেশি হয়। ভরা পদ্মায় মানুষ নৌকায় ঘুরতে ভয় করেন।’
নদীর পাড় কারও কাছে অবসর বিনোদন, আবার কারও কাছে জীবিকার অবলম্বন। একই নদীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিনোদন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের এক আন্তঃসম্পর্ক।
বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা : পদ্মার পাড় বিকেল হলেই মানুষের মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠলেও বিনোদনপ্রত্যাশীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা গড়ে ওঠেনি। কোথাও বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, কোথাও হাঁটার জায়গা সংকুচিত। শিশুদের খেলাধুলার জন্যও নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। মানুষের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের মতে, রাজশাহী নগরীতে বিনোদনের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত। ফলে পদ্মার পাড়ের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। পরিকল্পিতভাবে এ এলাকার উন্নয়ন করা গেলে এটি শুধু নগরবাসীর জন্য নয়, আশপাশের জেলার মানুষের কাছেও আকর্ষণীয় বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
এ প্রসঙ্গে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, পদ্মার পাড়কে ঘিরে সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যেখানে দর্শনার্থী ও পর্যটক বেশি হচ্ছে, সেসব জায়গায় তারা যেন নিরাপদে থাকতে পারেন, সুন্দর পরিবেশে হাঁটাহাঁটি, খেলাধুলা ও বসার সুযোগ পান, সে পরিকল্পনা আমরা করছি। জায়গাগুলোকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে ভাগ ভাগ করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে কর্মসংস্থানেরও কিছু ব্যবস্থা হবে বলে আমরা মনে করি।