প্রত্যাশা সব সময় পূরণ হয় না। প্রত্যাশা এগিয়ে থাকে প্রাপ্তি থেকে। স্বাধীনতা অর্জনের পরে প্রত্যাশা যেভাবে সমুদ্রের বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো ছুটেছিল সেটি এখন আর নেই। সেটি সব দেশেই হয়। একটি নব সূর্যের মতো নতুন দেশ যে প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করে সেটি আর অটুট থাকে না। যাত্রা শুরুতে যে প্রত্যাশা থাকে ৫০ বছর পার হওয়ার পরে সেই একই রকম প্রত্যাশা থাকে না, এটাই স্বাভাবিক। নতুন পতাকা এসেছে, মানচিত্র এসেছে দেশ স্বাধীন হওয়ার মুহূর্তের সঙ্গে আর কোনো মুহূর্তের তুলনা হয় না।
আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছিলাম। আমাদের নাট্যশিল্পের অগ্রযাত্রায় তাকে পেয়েছিলাম। তিনি নিজেও সংস্কৃতিমনা ছিলেন। আমরা যারা তখন নাটকের কাজ শুরু করেছিলাম তারাও নতুন নাটক নিয়ে নতুন দেশে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমার ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে নাটকের সঙ্গে যাত্রা শুরু সেই পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক আমল থেকেই। মুনীর চৌধুরী যাকে আমরা হারিয়েছি, পাকিস্তানিরা যাকে মেরে ফেলল তাকেও আমরা পেয়েছিলাম নাট্যচর্চার শুরুর দিকে। তিনি ছাড়াও যাদের দেখে আমরা গড়ে উঠেছিলাম তাদের সঙ্গেই ১৯৭২-এ আমরা নাটক শুরু করলাম মঞ্চনাটক। এর আগে টিভি নাটকেও আমি কাজ করেছিলাম। ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই নাটকটিতে আমি কাজ করেছি। সেই নাটক দিয়েই মঞ্চে কাজ শুরু।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে প্রবাসী সরকারের সময়েও অনেকেই নাট্যচর্চা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধেও কাজ করেছেন অনেক নাট্যকর্মী। মামুনুর রশীদ তাদের মধ্যে একজন। ‘আরণ্যক’-এর মধ্য দিয়ে তিনি তার কাজ শুরু করেছিলেন। একাত্তরের সময়ে তারা সেখানেও নাটক করেছেন। নাটকের মধ্য দিয়েও অনেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এরপরে ‘থিয়েটার’, ‘ঢাকা থিয়েটার’ কাজ করেছেন। আবদুল্লাহ আল মামুন, মান্নান হীরা তারা নাটক নিয়ে কাজ করেছেন। ঢাকা পদাতিক মঞ্চে বেশ কাজ করেছেন। এর কিছুকাল পরে সৈয়দ শামসুল হক এলেন মঞ্চনাটকে। তিনি কাব্যনাটক দিয়ে মঞ্চ জয় করেছিলেন। তখন আমরা নাটকের প্রদর্শনী করতাম মহিলা সমিতিতে, সেই পুরাতন বিল্ডিং। তখন আমাদের টাকা-পয়সাও লাগত না খুব আসলে। এখন মনে হয় মানুষের টাকা-পয়সা এসবই সব নয়। এর বাইরে সুখ ও প্রশান্তি আছে। সেটা তখন আমরা দেখেছি। আমি স্বাধীন হয়েছি, মুক্ত হয়েছি, শৃঙ্খল থেকে বেরিয়েছি, একটি অবদমিত জাতির মানুষ ছিলাম, পাকিস্তানি বন্দিদশায় ছিলাম সেখান থেকে মুক্তি পেয়েছি, স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। মুক্ত মানুষ, এই যে আমি স্বাধীন মানুষ এই আনন্দের তো আসলে কোনো তুলনা নেই। স্বাধীন দেশে আমরা নাট্যচর্চা করেছি যখন এই তুলনাটা বুঝতে পেরেছি গভীর থেকে। পাকিস্তানি আমলের নাট্যচর্চা এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের নাট্যচর্চায় এই পার্থক্যটা বেশ পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিল্পকলা একাডেমি নতুন রূপ লাভ করল। বাংলাদেশ টেলিভিশন নতুন করে রামপুরায় প্রতিষ্ঠিত হলো। টেলিভিশন নাটক এবং মঞ্চনাটক নিয়ে এক ধরনের বিপরীতমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছে বলে কেউ কেউ বলতে শুরু করল। গত ১০ বছরে নাট্যচর্চায় একটু ভাটা পড়েছে। তবে আমি বলব, আমরা যারা একটু প্রবীণ তাদের অনেকেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আলী যাকের চলে গেলেন, মান্নান হীরা চলে গেলেন। এই সময়টায় আমরা আরও অনেককে হারিয়েছি। প্রবীণরা এখন আর আগের মতো সক্রিয় থাকতে পারছেন না। এখন নাটক বা নাট্যচর্চা নতুন প্রজন্মের হাতে অর্পিত বলে আমি মনে করি। আমরা যারা প্রবীণ রয়েছি তারা নবীনদের দিকে তাকিয়ে থাকি। এখনকার নবীনরা চাইছে একটি পেশাদারিত্ব নিয়ে আসতে। পেশাদারিত্বের দরকার রয়েছে নিশ্চয়ই! আমরা টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করে যদিও অর্থ পাই, তবে মঞ্চনাটকে অভিনয় করে কেন নয়? এটা নিয়ে সরকার এখন ভাবছে। শিল্পকলা একাডেমি বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে। দেশের প্রতিটি জেলায় শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সবগুলো থানাতেও শিল্পকলা একাডেমি গঠিত হচ্ছে। নাট্যশিল্পের যেই ধারা আমাদের সংস্কৃতিতে রয়েছে তার সঙ্গে আমাদের নাটককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে বিশ্বমানের নাটকের দিকে। বিশ^মানের করে আমরা নাট্যচর্চা করব। সব সময় অর্থের দিকে দেখতে হবে এটাও ঠিক নয়। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ওরা যে নাটকের জন্য প্রমোদ কর দেবে, কোথা থেকে দেবে? ওরা তো ভিক্ষা করে নাটক করে। আমি বলতে চাই, রেনেসাঁ বা পুনরুত্থান এটা ঘন ঘন হয় না। আমরা যদি দেখি বিদ্যাসাগরের সময় একবার হয়েছিল, বঙ্কিমের সময় হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের সময় বাংলা সাহিত্যে হয়েছিল। তেমনি কলকাতা থিয়েটারে আমরা দেখেছি শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তদের। তাদের সেই থিয়েটার এখন আর নেই। এখন যারা নাটক করছেন তারা হয়তো নতুন উত্তেজনা নিয়ে নাটকে আগাচ্ছে। প্রত্যেকের একটি আয়ুসীমা থাকে। আমরা যারা এখন বয়স্ক তারা চাইলেও আগের মতো করতে পারব না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও মনে করেন নতুন প্রজন্মের হাতে আগামীর বাংলাদেশ। গত কয়েক দিন আগেই আমি রাজশাহীতে একটি নাটক উদ্বোধন করতে গিয়েছিলাম। মাসুম রেজা ‘জনকের অনন্ত যাত্রা’ নামে নাটক প্রস্তুত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরে তার লাশ দাফন করা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল সেই ঘটনা নিয়ে নাটকটি তৈরি করা হয়েছে।
কোনো শিল্পই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আমার রক্তকরবীও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আজকাল নতুন নতুন বিষয় নিয়ে নাটক হচ্ছে। যেমন ট্রান্সজেন্ডার কিংবা অটিজম নিয়ে নাটক তৈরি হচ্ছে। এগুলো নতুন প্রেক্ষাপট নাটকের। এগুলো কিছুই সমাজের বাইরের ঘটনা নয়। আমাদের দেশেও তৃতীয় লিঙ্গের একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। ভারতের বিচারপতি পর্যন্ত হয়েছেন। বাঙালির সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরাতন। আমাদের খুব একটি ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে সংগীত। যাত্রাপালা একদম কমে গিয়েছে। পালা গান কমে আসছে। এগুলোকে নতুন করে জনমানুষের সামনে হাজির করতে হবে। আবার পাশাপাশি শেকসপিয়ার থেকেও আমরা নাটক করতে পারি আমাদের মতো করে। শেকসপিয়ারের নাটক বিলেতের মতো করেই করতে হবে তা ঠিক নয়।
যেমন বলতে পারি, শেকসপিয়ার সর্বকালের সর্ব মানুষের। রবীন্দ্রনাথ সর্বকালের সর্ব মানুষের। জীবনানন্দ দাশ সর্বকালের সর্ব মানুষের। একজনের প্রতি আরেকজনের শ্রদ্ধা এবং আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেলেই সংস্কৃতি এগিয়ে। এর জন্য দরকার দরদ। স্বাধীনতার ৫০ বছরের নাট্য অভিযাত্রা আমি মনে করি পিছিয়ে নেই। নতুন প্রজন্ম এখন যে নতুন নাটক করছে আমি মনে করি, তারা বেশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে নাটক করছে। জাতি হিসেবে আমরা থেমে নেই। আমাদের হয়তো ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে কিন্তু আমরা সমুখে এগিয়ে চলেছি। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে এই প্রত্যাশা।
লেখক নাট্যকার ও অভিনেতা