আজ ২৪ জুন। ৩৯ বছরে পা দিচ্ছেন ইতিহাসের অবিসংবাদিত ফুটবলার লিওনেল মেসি। শোকেসে শোভা পাচ্ছে আট-আটটি ব্যালন ডি’অর, কোপা আমেরিকার ট্রফি, আর ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আকাক্সিক্ষত ও আরাধ্য সেই সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফি। শুধু কী ট্রফি? নামের পাশে এখন জ্বলজ্বল করছে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৮ গোল। গত সোমবার রাতে ডালাসের মাঠে অস্ট্রিয়াকে গুঁড়িয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের চার-চারটি বিশ্ব রেকর্ড যখন নিজের পায়ে লুটিয়ে পড়েছেন, তখন মিক্সড জোনে দাঁড়ানো এ জাদুকরের হাসিতে কোনো অহংকার ছিল না। কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত, ফুটবলের সব ট্রফি আর রেকর্ড নিজের পায়ে সঁপে দেওয়া এই জাদুকর এক অদ্ভুত মায়া আর পরম তৃপ্তি নিয়ে এখন যেন খুঁজছেন জীবনের আসল মানে।
জন্মদিনে ঈশ্বরের কাছে কি চান তিনি, সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মেসি পরম তৃপ্তি ও কিছুটা আর্দ্র চোখে বলছিলেন ‘সত্যি বলতে, আমি ঈশ্বরের কাছে আর নতুন কিছু চাইতে পারি না। ঈশ্বর আমাকে ফুটবল- সবকিছু দিয়েছেন, যা চেয়েছি তার চেয়েও বেশি দিয়েছেন। এখন জন্মদিনে আমার একমাত্র চাওয়া আমি নিজে, আমার পরিবার এবং আমার আশপাশের প্রিয় মানুষগুলো যেন সুস্থ থাকে।’
ব্যস্ত সূচির কারণে বিশ্বকাপের ক্যারিয়ারে অধিকাংশ জন্মদিনই মেসিকে কাটাতে হয়েছে পরিবার থেকে দূরে, সতীর্থদের সঙ্গে আর্জেন্টিনা ক্যাম্পে।
ফিরে দেখা যাক, ২০০৬ থেকে শুরু হওয়া তার সেই বিশ্বকাপ রাঙানো জন্মদিনগুলোর গল্প ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ মেসির ক্যারিয়ারের এক বিশেষ মুহূর্ত হয়ে আছে। কারণ এটিই ছিল তার সিনিয়র ক্যারিয়ারের একমাত্র জন্মদিন। যেদিন তাকে নিজের জন্মদিনে সরাসরি মাঠে নেমে ম্যাচ খেলতে হয়েছিল। লাইপজিগে মেক্সিকোর বিপক্ষে নকআউট পর্বের সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ৮৪ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ১৯ বছরের তরুণ মেসি। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে। ম্যাচে মেসির একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিলও হয়েছিল।
ম্যাচের আগের রাতে বেসক্যাম্প হোটেলে কোচ জোসে পেকারম্যান ও সতীর্থদের সঙ্গে কেক কাটেন মেসি। কাকতালীয়ভাবে আর্জেন্টিনার সেই সময়ের মহাতারকা হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে এবং মেসির জন্মদিন একই দিনে হওয়ায় রিকুয়েলমের ২৮তম এবং মেসির ১৯তম জন্মদিন যৌথভাবে উদযাপিত হয়েছিল।
২০১০ বিশ্বকাপ চলাকালে ২৩ বছরে পা দেওয়া মেসির প্রিটোরিয়া বেসক্যাম্পের জন্মদিনটি ছিল রূপকথার মতো, যার নেপথ্যে ছিলেন স্বয়ং ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা। জন্মদিনের ঠিক দুদিন আগে গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক মাশ্চেরানোকে বিশ্রাম দিয়ে ম্যারাডোনা ২৩ বছর বয়সী মেসির হাতে তুলে দেন অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। এতে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ অধিনায়ক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন মেসি।
২৪ জুন মাঝরাতে ম্যারাডোনা নিজে উপস্থিত থেকে মেসিকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানান এবং বড় বার্থডে কেক কাটা হয়। সে রাতে স্প্যানিশ-আর্জেন্টাইন খাবারের পাশাপাশি পিৎজা পার্টিরও আয়োজন করা হয়েছিল। ম্যারাডোনা সেদিন বলেছিলেন ‘মেসি ঠিক সেই পর্যায়ে খেলছে, যেভাবে আমি ১৯৮৬ বিশ্বকাপে খেলেছিলাম’। হোটেলের বাইরে শত শত সমর্থক ভুভুজেলা বাজিয়ে প্রিয় তারকাকে ভালোবাসায় সিক্ত করেছিলেন।
২০১৪ সালের ২৭তম জন্মদিনে মেসি ছিলেন ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রের বেসক্যাম্পে। নাইজেরিয়া ম্যাচের ঠিক আগের দিন হওয়ায় কোচ আলেজান্দ্রো সাবেলা ও সতীর্থদের নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে কেক কাটেন তিনি। এ জন্মদিনে তার স্পন্সর প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডিডাস’ তাকে একটি বিশেষ সংস্করণের রঙিন বার্থডে বুট উপহার দেয়, যা পরেই তিনি অনুশীলনে নামেন।
সেদিন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ম্যারাডোনাকে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে তিনি মেসিকে ‘আর্জেন্টিনার গর্ব ও এক অসাধারণ অ্যাথলেট’ হিসেবে উল্লেখ করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। এর ঠিক পরের দিনই নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসি জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানে জেতান। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ফাইনাল খেলেছিল সেবার। কিন্তু প্রথমবার ধরা দিতে গিয়েও বিশ্বকাপ ধরা দেয়নি মেসির।
২০১৮ বিশ্বকাপে ৩১তম জন্মদিনটি ছিল মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মানসিক চাপের সময়। আইসল্যান্ডের সঙ্গে ড্র এবং ক্রোয়েশিয়ার কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার পর আর্জেন্টিনা তখন বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার খাদের কিনারায়। চরম টেনশনের মাঝেই রাশিয়ার ব্রোনিৎসিতে মস্কোর একটি স্থানীয় পেস্ট্রি শপ মেসিকে তার অবিকল রূপ দিয়ে ৬০ কেজি ওজনের একটি লাইফ-সাইজ চকোলেট ভাস্কর্য উপহার দেয়। কোচ হোর্হে সাম্পাওলির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ তখন থমথমে থাকলেও সাম্পাওলি মেসিকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানান এবং সতীর্থরা কেক কাটেন। তবে জন্মদিনের আসল উপহারটি মেসি পেয়েছিলেন দুদিন পর ২৬ জুন, যখন নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জাদুকরী গোল করে দলকে অবিশ্বাস্যভাবে নকআউট পর্বে তোলেন।
২০২২ সালের ২৪ জুন লিওনেল মেসির ৩৫তম জন্মদিনটি ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এবং ফুরফুরে মেজাজের এক জন্মদিন। কারণ সে বছর কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের মাঝপথে নয়, বরং কাতার বিশ্বকাপের মাত্র কয়েক মাস আগে পিএসজির মৌসুম শেষ করে একদম ফ্যামিলি ভ্যাকেশনে থাকাবস্থায় তিনি এ জন্মদিনটি উদযাপন করেছিলেন।
আরেকটি বিশ্বকাপ চলাকালে জন্মদিন এসে গেছে মেসির। হ্যাটট্রিক আর জোড়া গোলে দলকে জিতিয়ে মেসির মন ফুরফুরে। তবু ফুটবলের রাজপুত্রের মন ভালো নেই। তার বাবা হোর্হে মেসি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ডালাসের ডেরায় বসে কোচ লিওনেল স্কালোনি তাই কোনো রেকর্ডের কথা না বলে শুধু বলেছেন, ‘আমি শুধু চাই ও সুখী থাকুক। আমরা সবাই আসলে এটাই চাই।’
ট্রফি আর রেকর্ডের পাহাড় ডিঙিয়ে দিনশেষে মেসিও তো একজন সাধারণ মানুষ, একজন সন্তান, একজন বাবা। জন্মদিনের এই বিশেষ লগ্নে কোটি কোটি ভক্তের একটাই প্রার্থনা ভালো থেকো ফুটবল জাদুকর, তোমার চারপাশের মানুষগুলোকে নিয়ে তুমি কেবল সুখী থেকো!