মেঘনার মোহনা আর বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মনপুরা যেন বাংলাদেশের এক বিস্ময়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এই দ্বীপে রয়েছে সমুদ্র, নদী, বনভূমি ও বন্যপ্রাণীর এক অনন্য সমন্বয়। কিন্তু সৌন্দর্যের এই লীলাভূমির মানুষের জীবন দীর্ঘদিন ধরে এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি বিদ্যুৎহীনতা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন উন্নয়নের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, তখনো মনপুরার হাজারো পরিবার দিন শেষে ডুবে যায় অন্ধকারে।
মনপুরাবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে শুধু বিদ্যুতের আলো নয়, উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে উপকূলের এই জনপদে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে এক জনসভায় দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেই জনসভায় তিনি মনপুরাকে একটি আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। দ্বীপটির যোগাযোগ, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তার নেতৃত্বে সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মনপুরাবাসী।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) সূত্রে জানা গেছে, ‘মনপুরা দ্বীপে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের আওতায় সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মানের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন করা হবে ওজোপাডিকোর নিজস্ব তহবিল থেকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যুতের অভাব মনপুরার উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। বর্তমানে রামনেওয়াজ ও বাংলাবাজার এলাকায় দুটি বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে উচ্চমূল্যের কারণে অধিকাংশ মানুষের জন্য সেই সুবিধা সহজলভ্য নয়। ফলে দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ এখনো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে।
বদলে যাওয়ার অপেক্ষায় এক জনপদ
প্রায় ৩৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মনপুরা উপজেলা ভোলা জেলার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। চারটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই দ্বীপে বর্তমানে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এই জনপদের মানুষ বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষা করে আসছেন।
এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, তজুমদ্দিন উপজেলা থেকে পল্লী বিদ্যুতের লাইন ইতোমধ্যে চর লাদেন, চর জহিরউদ্দিন হয়ে চর মোজাম্মেল পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম চালু রয়েছে। বর্তমানে চর মোজাম্মেল থেকে ঢালচর, কাজিরচর ও চর কলাতলী পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। এই প্রকল্পের আওতায় সরাসরি পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চর কলাতলী থেকে সাবমেরিন লাইনের মাধ্যমে মনপুরা উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) পল্লী বিদ্যুৎ থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ করে তাদের নিজস্ব বিতরণ ব্যবস্থার আওতায় মনপুরার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করবে। প্রাথমিক পর্যায়ে পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব না হলেও প্রধান সরকারি অফিস, আদালত, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কিছু আবাসিক এলাকায় ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এই পর্যায়ের বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় বরফকল, বড় ওয়ার্কশপ, শিল্পকারখানা ও ভারী যন্ত্রপাতিনির্ভর স্থাপনাগুলো আপাতত অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি হবে জাতীয় গ্রিডের পূর্ণাঙ্গ সংযোগ বাস্তবায়নের আগে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা।
অন্যদিকে চরফ্যাশনে ইতিমধ্যে জাতীয় গ্রিডের সাবস্টেশন স্থাপন করে চালু করা হয়েছে। সেখান থেকে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে পুরো মনপুরা উপজেলাকে জাতীয় গ্রিডের আওতায় আনার জন্য সরকার একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মনপুরা সরাসরি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। তখন বরফকল, শিল্পকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসহ উপজেলার সব আবাসিক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে আসবে নতুন গতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবার নাম নয়; এটি উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত হলে মনপুরার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যুতের অভাবে রাতের পড়াশোনায় সমস্যার মুখোমুখি হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত হলে তারা ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন ক্লাস ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ পাবে। একইভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
মনপুরার অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়লে মাছ সংরক্ষণ, বরফ উৎপাদন, কোল্ড স্টোরেজ, ক্ষুদ্র শিল্প, সেলাই কারখানা, ওয়ার্কশপ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
বিশেষ করে মৎস্য খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অনেক সময় জেলেদের ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়লে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
পর্যটনের নতুন দুয়ার
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বহুদিন ধরেই পর্যটনের সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত মনপুরা। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, হরিণের বিচরণভূমি, মেঘনা ও সাগরের মিলনস্থল এবং মনোমুগ্ধকর সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তবে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত হলে পর্যটন খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে। গড়ে উঠবে আবাসন, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য পর্যটনসেবা। ফলে স্থানীয় মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মনপুরার মানুষের অন্যতম দাবি ছিল জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ। সরকারপ্রধানের আন্তরিক উদ্যোগে সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। তিনি মনে করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মনপুরার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. মো. শামীম রহমান বলেন, সরকার মনপুরাকে একটি আধুনিক পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সংযোগ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হবে।