তুর্কিয়ে তুরস্কিয়ে নয় কিন্তু

আপডেট : ২০ জুন ২০২২, ১১:৪৯ পিএম

মিয়া গুল আকবর জেব-এর কথা মনে পড়ে? ঠিক এক যুগ আগে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিশ্বসংবাদ হয়ে উঠেছিলেন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সংবাদপত্রে অন্তত একটি সিঙ্গেল কলাম হলেও তিনি পেয়েছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা পাকিস্তানি এই কূটনীতিবিদ সোয়াতের রাজ পরিবারের সদস্য। গাঁটের পয়সা খরচ করে খাওয়াতেন রাজকীয় জন্মের ইজ্জত রক্ষা করতে। প্রতিবেশী ভারতের দিল্লিতে কাউন্সেলর ও ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন; তারপর আফগানিস্তানে রাষ্ট্রদূত। ২০০৯ থেকে ২০১৪ অবসর গ্রহণের আগে পর্যন্ত কানাডায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত।

২০১০-এর ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরোল তাকে সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূত করার জন্য সৌদি সরকারের সম্মতি এগ্রিমো চাওয়া হয়েছিল; কিন্তু একটি বিশেষ কারণে তাকে গ্রহণ করতে সৌদি আরব সরকার অসম্মতি জানিয়েছে। অসম্মতির বিশেষ কারণ তার নাম। আকবর জেব নামটি সৌদি আরবে গ্রহণযোগ্য নয়। আকবর জেব মানে ‘বৃহত্তম পুরুষাঙ্গ’। এ রকম একটি নাম নিয়ে সৌদি আরবে কূটনৈতিক সম্প্রদায়ে অবস্থান তার জন্য বিব্রতকর হবে, সে দেশের জন্যও হবে। সুতরাং তারা অসম্মতি জানাল। কোনো একটি স্কুপ থেকে খবরটি সংগ্রহ করে প্রকাশ করতেই আরবীয় সাংস্কৃতিক সমালোচক আহমেদ আল ওমরান বলে দিলেন, সিদ্ধান্ত ঠিকই আছে। নামটি একটি সাংস্কৃতিক ‘রেডলাইন’ অতিক্রম করে যায়। তার নাম ছাপতে গণমাধ্যম বারবার বিব্রত হবে, ছাপার পর প্রতিবারই সমালোচনার সম্মুখীন হবে। এটা পাকিস্তানের জন্যও অসম্মানজনক ও বিব্রতকর হবে। উদারপন্থি সৌদি আরব সমালোচকরা মনে করেন, এটি ভিন্ন একটি সংস্কৃতির ওপর অযাচিত এবং অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপ। যে নামই তার হোক, এগ্রিমো পাঠানো উচিত ছিল। মিয়া গুল আকবর জেব স্বীকার করলেন, এই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংবাদে তিনি বিব্রত হয়েছেন। সংবাদটির সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি তিন বছরের জন্য কানাডার রাষ্ট্রদূত পদে এসেছেন, মাত্র ৯ মাস হয়েছে, এখনই তার সৌদি আরব বা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে পদায়ন হওয়ার কথা নয়। তিনি চাকরি জীবনের শেষ পর্যন্ত কানাডাতেই ছিলেন, হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন নিজের নাম তার জন্য কতটা বিব্রত অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। তিনি তো ভারতেও ছিলেন, ওখানেও আরবি জানা পন্ডিতের ঘাটতি নেই। কিন্তু কেউ তো নাম নিয়ে প্রশ্ন করেননি। ভারতবর্ষের সম্রাটই ছিলেন আওরঙ্গজেব। ভিন্ন এক জেব। আকবর জেব, নিজের নাম নিয়ে মোটেও অসন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি ৫৫ বছর বয়সে (যখন সংবাদটি প্রকাশিত হয়) নাম পাল্টানোর তাগিদ অনুভব করলেন না। একালের সেলিব্রিটিদের নিজের নাম অপছন্দ হওয়ার কারণে যারা নাম বদলেছেন তারা হচ্ছেন : অলিভিয়া ওয়াইল্ড পূর্বনাম অলিভিয়া ককবার্ন (সমস্যা কক নিয়ে, যারা মানে স্ল্যাং অর্থে শিশ্ন)। তার মা লেসলি ককবার্ন যখন ভার্জিনিয়ায় কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচন করছিলেন, তখন বেরিয়ে আসে তিনি আসলে ওয়াইল্ড নন, ককবার্ন।

জোয়াকিন ফিনিক্স অল্প বদলেছেন পূর্বনাম জোয়াকিন র‌্যাফায়েল বটম। পরিবর্তন বটম বা নিতম্বের কারণে। টিনা টার্নারের পূর্বনাম আনা মে বুলক। সংগীত জীবনের শুরুতে বুলক বা ষাঁড় বাদ দিয়ে প্রথম স্বামীর নামের টার্নারটা গ্রহণ করেছেন। অভিনেত্রী সান্দ্রা বুলক তার ‘বুলক’ রেখে দিয়েছেন। অনরে দ্য বালজাকের পূর্বনামের ইংরেজি মানে অ-কোষ। সুতরাং ঔপন্যাসিক বালজাক নিজের নামটা ঠিক করে নিয়েছেন। দ্য রক নামের অভিনেতার পূর্বনাম থিওডোর রকিংচেয়ার। তিনি আর দোল খাওয়া চেয়ার থাকতে রাজি ছিলেন না।

নামে কিছু আসে যায় কি না এ নিয়ে শেকসপিয়ার রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট-এ জুলিয়েটকে দিয়ে একটি রায় দিয়ে গেছেন : নামে কি এসে যায়? গোলাপকে যে নামেই ডাকো ঘ্রাণ মিষ্টিই হবে। What’s in a name?/ That which we call a rose/ By any other name would smell as sweet আসলেই তাই কি না এ নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। তিনি বলেছেন, নাম মানুষকে বড় করে না, ‘মানুষ নামকে জাঁকাইয়া তোলে’।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সবটা গ্রহণ করতে রাজি নন। তারা দেখিয়েছেন নাম পড়াশোনা, পরীক্ষার ফলাফল, চাকরিপ্রাপ্তি, সাফল্য ইত্যাদিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। সুতরাং তাদের থিসিস হচ্ছে ‘নেইম ম্যাটার্স’। নাম বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করে যেসব পুরুষের নারী নাম ট্রেসি, লেসলি, অ্যাশলে, লরেন তারা হেনস্তার শিকার হন। লওরা নামের মেয়ে হিন্দি ভাষীদের দঙ্গলে পড়লে বিবর্ত হন। ‘বাথরুম ওয়ার্ডস’ যেমন ডিক, পুশি, বিভার মজার হলেও পরিত্যাজ্য। পুরনো আমলের নাম বার্থা, সিলড্রেড, গারট্রুড, ইউস্টেস একইভাবে পরিত্যাজ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনার প্রভাবে নামের মানেও বদলে গেছে। বায়রন গোশালা; ব্রেনডান দুর্গন্ধযুক্ত চুল; ক্যালডিন টেকো; ক্যামেরন বাঁকা নাক; ক্যাম্পবেল বাঁকা মুখ; স্যামুয়েল অন্ধকারের রাজপুত্র; বেলিন্দা সুন্দর সাপ; ক্যাসান্ড্রা উপেক্ষিতা; সিসিলয়া অন্ধ; ডেসডিমোনা শয়তান প্রকৃতির; লামিয়া শিশু হত্যাকারী; লোলা দুঃখিনী; লিলিথ রাতের দানব; ম্যালরি হতভাগা, পোর্শিয়া শূকরী।

টার্কি নামেই ১৯২৩ সাল থেকে গোটা দুনিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের এই দেশটিকে চেনে। আমরা বলি তুরস্ক। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে যেকোনো যোগাযোগ ও সম্বোধনে টার্কিই বলতে হয়। কিন্তু সে দেশ আর ক্রিসমাসের টার্কি হয়ে থাকতে রাজি নয়। রাজি নয় থ্যাংকসগিভিং ডিনারের খাবার হতে। যারা খুব কাছে থেকে টার্কি নামের বেঢপ পাখিটি/মুরগিটিকে দেখেছেন অবশ্যই স্বীকার করবেন, এটা স্মার্ট কোনো পাখি নয়। সুতরাং রিসেপ এরদোয়ান জাতিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টার্কি নামে পরিবর্তন আনবেন এটা প্রত্যাশিতই ছিল। শুধু মেন্যুর টার্কিই নয় একটু গর্দভ টাইপের মানুষ কিংবা ফ্লপ কোনো কিছুকেও টার্কি বলা হয়। সংসদে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের নাম তুর্কিয়ে; জাতিসংঘও নতুন নাম কবুল করেছে। জুনের শুরু থেকে একটা টার্কি তুর্কিয়ে নামক দেশে পরিবর্তিত হলো। এতে এরদোয়ান জাতীয় তাবাদি শক্তিকে সংহত করার একটি ভালো সুযোগ পাবেন, তার জনপ্রিয়তা ঊর্ধ্বমুখী নয়, দীর্ঘদিন ধরে শাসন করছেন, বিরোধীরাও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এ সময় দেশের নবনামায়ন রাজনৈতিকভাবেও ক্ষমতাসীন দলকে কিছুটা বাড়তি সুবিধে দিতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। এরদোয়ান বা তার দল বাস্তবে কতটা লাভবান হবে তার বিশ্লেষণ এই নিবন্ধের আওতাভুক্ত নয়; বরং বিভিন্ন দেশের নাম পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত একটি চিত্র তুলে ধরাই এর উদ্দেশ্য।

জার্মানিতে নিযুক্ত পারস্যের রাষ্ট্রদূত নাৎসি জাতীয়তাবাদের উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ দেশেও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাতে আগ্রহ পোষণ করেন বলে উল্লেখ করা হয়। রেজা শাহ পাহলভি ১৯৩৫ সালে দেশের পার্শিয়ান নাম ইরান অনুমোদন করেন, আন্তর্জাতিক মহল নতুন নাম গ্রহণের অনুরোধ জানান। তবে দীর্ঘদিন পারস্য ও ইরান উভয় নামই ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৩৯ সালে সিয়াম (শ্যাম) থাইল্যান্ড নামে নতুন করে বিশ^সভায় পরিচিতি লাভ করে। আজকের কম্বোডিয়া ১৯৫৩ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ছিল কিংডম অব কম্বোডিয়া এবং খেমার রিপাবলিক। ১৯৭৫-৭৯ কমিউনিস্ট শাসনকালে দেশের নাম হয় ডেমোক্রেটিক কাম্পুচিয়া; তারপর রিপাবলিক অব কম্বোডিয়া এবং ১৯৯৩ থেকে পুনরায় কিংডম অব কম্বোডিয়া হিসেবে পরিচিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইউনিয়ন অব বার্মার নাম ১৯৮৯ সালে বদলে যায়, হয়ে যায় মিয়ানমার। ২০২০ থেকে হল্যান্ড হয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। ১৯৩৭ সালে আইরিশ ফ্রি স্টেট আয়ারল্যান্ড নাম ধারণ করে। সিলোন বা সিংহল ২০১১ থেকে পুরনো নাম শ্রীলঙ্কায় প্রত্যাবর্তন করে। ২০১৯-এর রিপাবলিক অব মোসেডোনিয়া রিপাবলিক অব নর্থ মেসেডোনিয়া নাম ধারণ করে। ২০১৮-তে সোয়াজিল্যান্ড হয় ইসওয়াতিনি। উত্তর রোডেশিয়া ও দক্ষিণ রোডেশিয়ার একাংশ একীভূত হওয়ার পর দেশের নাম হয় জিম্বাবুয়ে। ফ্রেঞ্চ সোমালিল্যান্ড ১৯৭৭ সাল থেকে জিবুতি নামে পরিচিতি লাভ করে। গিলবার্ট আইল্যান্ডস স্বাধীনতা পেয়ে ১৯৭৯ সালে নাম নেয় কিরিবাতি। চেক রিপাবলিকের নাম ২০১৬ থেকে চেকিয়া। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ফেডারেল পিপলস রিপাবলিক অব যুগোস্ল্যাভিয়া কমিউনিস্ট শাসনে ১৯৬৩ সালে সোশ্যালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অব যুগোস্ল্যাভিয়ায় পরিণত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯২ সালে যুগোস্ল্যাভিয়াও খন্ডবিখন্ড হয়ে ছয়টি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে : সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, স্ল্যোভেনিয়া, মেসেডোনিয়া এবং মন্টেনেগ্রো। একসময় হিটলার আর জার্মান সমার্থক হয়ে ওঠে। তখনই হিটলার ট্রেঞ্চে সমাহিত হন। ইন্দিরা গান্ধীর স্তাবকরা একসময় চেঁচিয়ে বলতে শুরু করেন ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা সেবারের নির্বাচনে কংগ্রেসসহ ইন্দিরার ভরাডুবি হয়। দেশের নামের সঙ্গে দেশ শাসকের নাম বেশি জড়িয়ে গেলেই পতন আসন্ন হয়ে ওঠে।

পাদটীকা ১ :

আকবর জেবকে নিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম। ৬৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত এই রাষ্ট্রদূত ভালোই আছেন। তার নামের বিতর্কটি যখন সামনে আসে ইকোনমিস্টের মতো সিরিয়াস সাপ্তাহিকী লিখে ভাগ্যিস আকবর মানে বৃহত্তর, ক্ষুদ্রতম হলে ব্যাপারটা আরও বিব্রতকর হতো।

পাদটীকা ২ :

টার্কি এখন তুর্কিয়ে এটুকু মনে রাখাই ভালো। উৎসাহী কেউ যেন আবার তুরস্কের বদলে তুরস্কিয়ে লিখে না ফেলেন সেদিকে নজর রাখতে হবে। এরদোয়ান যাই মনে করুন, আতাতুর্ক কামাল পাশা এখনো আমাদের অনেক প্রিয় :

‘ঐ খেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই

অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোরসে সামাল সামাল তাই

কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই

লেফট রাইট লেফট।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত