বিশ্বব্যাংক বলছে, পৃথিবীর প্রধান খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় অনেক দেশের খাদ্য বাবদ অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে তাদের জিডিপির ১ শতাংশের সমান। কিছু দেশের পক্ষে এই ব্যয়ভার মেটানো সম্ভব হলেও অনেক দেশ ঋণ সংকটে পড়বে। তাদের পক্ষে ওই বাড়তি ব্যয়ভার আদৌ বহন করা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যয়ভার মেটাতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দ্বারস্থ হয়েছে। বাংলাদেশ এজন্য ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চাইলেও বিদ্যমান ব্যবস্থায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ মিলবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের তুলনায় ২০২২ সালের ২৯ জুলাই কৃষিপণ্যের মূল্য সূচক বেড়েছে ২৯ শতাংশ। বিশ্ববাজারে গম ও ভুট্টার দাম যথাক্রমে ২২ ও ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও চালের দাম কমেছে ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টন গম ও ২২ থেকে ২৫ লাখ টন ভুট্টা আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে গম ও ভুট্টার মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইতিমধ্যে দেশে আটা, ময়দা, সুজি, বেকারি পণ্য, মৎস্য ও গৃহপালিত পশু-পাখির খাবারের দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। খাদ্য আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সারের মূল্যবৃদ্ধি আর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সার উৎপাদনের প্রধান উপকরণ হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস। যুদ্ধের কারণে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। এতে দেশের বেশ কয়েকটি সারকারখানার উৎপাদন অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। আবার যেসব দেশ সার আমদানি করে, তাদেরও উচ্চমূল্যে সার আমদানি করতে হচ্ছে।
ইউরিয়া সারের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা এবং চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ সরকার ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ৬ টাকা বৃদ্ধি করেছে। ডিলার পর্যায়ে ইউরিয়া সারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ১৪ থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা এবং কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ১৬ থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, দেশে বোরো মৌসুমে প্রতি বিঘায় ৩০ কেজি ও আমন মৌসুমে ২৩ কেজি ইউরিয়া সারের দরকার হয়। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে তা ৫ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যবহার করা হয়, যা ফসল ও মাটির জন্য ক্ষতিকারক।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের বর্তমান দাম ৮১ টাকা। এতে ৬ টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি কেজিতে ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের ভর্তুকি ছিল মাত্র ১৫ টাকা। বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সারের দাম চার দফা কমিয়ে অত্যন্ত স্বল্প দামে পর্যাপ্ত সার কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। ডিএপি সারে শতকরা ১৮ ভাগ নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সারের উপাদান রয়েছে। সে জন্য ইউরিয়া সারের অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে ডিএপির ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ কারণে সরকার ডিএপি সারের দাম প্রতি কেজি ৯০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা করে কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করছে। এতে কয়েক বছরে ডিএপি সারের ব্যবহার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ডিএপি সারের ব্যবহার বাড়ার ফলে ইউরিয়ার ব্যবহার কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে ইউরিয়ার ব্যবহার কমেনি; বরং বেড়েছে। এর ফলে দেশে সারে দেওয়া ভর্তুকি বেড়েছে চার গুণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে সারে ভর্তুকি লেগেছিল ৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা, সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে লেগেছে ২৮ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশের গবেষেণা প্রতিষ্ঠান ‘সানেম’-এর হিসাব অনুসারে, দেশের শহরাঞ্চলের প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর গড় মোট আয়ের ৬১ দশমিক ৩১ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্যের পেছনে। আর গ্রামীণ প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। পৃথিবীর সব দেশেই প্রান্তিক মানুষের খাদ্য ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সে জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এসব মানুষের পক্ষে খাদ্য গ্রহণ কমানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এতে তাদের স্বাস্থ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছিল। আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টন হবে। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন কমেছে আউশে। আউশে ২৭ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে উৎপাদন হয়েছে ২০ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। বাংলাদেশে গত জুনে মোটা চালের কেজি ৫২ টাকা আর সরু চালের কেজি ছিল ৭৫ টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৪ ও ১৩ শতাংশ বেশি। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ৯ লাখ ১০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দিলেও ডলারের দাম ও আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ওই পরিমাণ চাল আমদানি নাও করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বোরো মৌসুমে হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা এবং কিছুদিন আগে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ও উত্তরাঞ্চলের বন্যায় ৫৬ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারণেই বাংলাদেশে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ পরিমাণ ৭ দশমিক ৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকের কথা আমনে কৃষকদের বীজ ও উপকরণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে আমনের উৎপাদন ভালো হবে এবং তা দিয়ে আউশের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। ফসলের জমিতে সুষম সার প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি ইউরিয়া সারের বর্তমান ব্যবহার কমপক্ষে ২০ ভাগ কমিয়ে ইউরিয়ার ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা যায়, তাতে ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বরং উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কৃষকের খরচও কমবে।
আমন ধান রোপণের এই ভরা মৌসুমে ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের ধান চাষের আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে নিরুৎসাহিত করলে ফলনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ। ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার হদ্দেরভিটা গ্রামের একজন কৃষকের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তিনি জানান, আমন মৌসুমে তিনি প্রতি বিঘা জমিতে ২৫ কেজি করে ইউরিয়া সার ব্যবহার করে ফলন পান ১০ মণ ধান। ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিঘাপ্রতি তার উৎপাদন খরচ ১৫০ টাকা বৃদ্ধি পাবে। কৃষি শ্রমিকের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে এমনিতেই
কৃষি অলাভজনক পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার ওপর সারের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি কাজে আগ্রহ হারাতে পারে তরুণ প্রজন্ম।
লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন