পোশাকের পরিচয় ও পরিচয়ের পোশাক

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩৮ পিএম

পোশাক মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে যার বেশ কিছুটা যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতিনীতি ও চর্চার প্রতিফলনও পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্য দিয়ে হয়ে থাকে। তাই প্রয়োজনের পাশাপাশি পোশাক কখনো কখনো জাত-পাত, পরিচয়, মর্যাদা, ক্ষমতা ও লৈঙ্গিক বিভাজন ইত্যাদির পরিচয় হয়ে ওঠে। বলা বাহুল্য এর কোনোটাই সর্বজনীন নয়। পারস্যের কবি শেখ সাদি মধ্যযুগে পোশাকের গুণের কথা গল্পের মাধ্যমে শুনিয়েছিলেন। তার গল্পটা আপাতদৃষ্টিতে সাদাসিধে, যেখানে সাধারণ পোশাকে তার যোগ্য সমাদর না হওয়ায় তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে অভিজাত পোশাকের কারণে সেই একই বাড়িতে তার অভ্যর্থনার ধরনও বদলে গিয়েছিল। এতে তিনি আপ্যায়ন করা খাবারের একটা অংশ তার পোশাকের পকেটে ঢুকিয়ে ছিলেন এই বিবেচনায় যে খাবারটা তার পোশাকেরই প্রাপ্য। নিঃসন্দেহে এটা ছিল পোশাকি সমাজের প্রতি তার তীব্র প্রতিবাদ। কিন্তু এই গল্প কতটুকু আমাদের শেখাতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সম্প্রতি লুঙ্গি পরিহিত এক সিনেমাদর্শক পোশাকের কারণে সিনেমা হলে ঢুকতে পারেননি। পরে অনেককেই লুঙ্গি পরিধান করে এর প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ আবার একধাপ এগিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে লুঙ্গির সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেছেন। যদিও এর উদ্দেশ্য খুব একটা পরিষ্কার না কিন্তু এখানে প্রতিবাদটাই মুখ্য। শুধু পোশাক নিয়েই নয়, পোশাকের সঙ্গে পরিচ্ছদ ও এর ধরন নিয়েও অনেক আলোচনা বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর মতো অবস্থায় চলে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর প্রকাশ ঘটে সহিংসতা ছড়ানোর মধ্য দিয়ে। কিছুদিন আগে রাজধানীর ফার্মগেইট এলাকায় একজন শিক্ষিকাকে কপালে টিপ পরার কারণে পুলিশ বাহিনীর সদস্যের হাতে নিগৃহীত হতে হয়েছিল। সে ঘটনারও প্রতিবাদ করেছিল সচেতন মহল এবং দোষী ব্যক্তি শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিল। পোশাক নিয়ে আমাদের যেমন প্রত্যাশা আছে একই সঙ্গে পোশাকের প্রচলিত ধ্যানধারণাভিত্তিক পোশাকি সংস্কৃতি বিনির্মাণ নিয়েও চেষ্টার অন্ত নেই। পোশাকেও নির্দিষ্ট মানদণ্ড, চর্চা ও রীতি মানা বা না মানা যেন অপরাধের পর্যায়ে পড়ে; এমনভাবে সেটা ঘটে যে ব্যক্তির স্বাচ্ছন্দ্য ও পছন্দের বিষয়টি যেন অনেক দূরের বিষয়। কোনটা দেশি, কোনটা বিদেশি এ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের শেষ নেই। বিজ্ঞজনেরা এই বিতর্ককে সময়ের অপচয় বলছেন।

তবে বিতর্কতেই শেষ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর অন্তর্নিহিত কর্র্তৃত্ববাদী আচরণ। নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিতর্কের পেছনে দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি টান যতটা না উদ্দেশ্য তার থেকে অনেক অনেক বেশি থাকে নারীর প্রতি কর্র্তৃত্ববাদী আচরণের প্রচ্ছন্ন চেষ্টা। এদের অনেকেই পোশাকের স্বাধীনতায় সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি তত্ত্বের ঘোর সমর্থক। আর তাদের কর্মকাণ্ড বড্ড বেশি একপেশে, শুধু নারীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। সামাজিক অনাচার ও ব্যাধির জন্য নাকি নারীদের পোশাকই দায়ী! উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো, প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা এবং অপরাধীকে সামাজিক দায়মুক্তি দেওয়া। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এই সামাজিক অনাচারগুলো যাদের দ্বারা সংঘটিত হয় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। কখনো কখনো দেশীয় সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের দোহাই দিয়েই দায়মুক্তির প্রবণতা, এই প্রবণতা যেমন দীর্ঘদিনের এবং এর সপক্ষে লোকের ঘাটতি নেই! অনেকেই বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বিধিবিধানের দোহাই দিয়ে নারীর পোশাকের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেন বা অবস্থান নেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর জন্য তাদের কোনো ধরনের প্রতিবাদ বা সামাজিক লজ্জার মুখোমুখি হতে হয় না। এতে সহজেই বোঝা যায় পোশাকের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে একটি উপসর্গ। আসল কারণ হচ্ছে নারীর চলাফেরার স্বাধীনতা, ক্ষমতায়ন, সামাজিক পরিম-লে ভূমিকা ও স্বকীয়তা বজায় রাখার বিরুদ্ধে অবস্থান। তাদের দৃষ্টিতে এই সবগুলোই সমস্যা ও প্রচলিত চিন্তা ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর এটাই পুরুষতন্ত্র। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে এই ধরনের প্রচলিত চিন্তাভাবনা কিছুকাল আগেও শুধু ব্যক্তিগত গ-ির মধ্যে থাকলেও সাম্প্রতিক অনলাইন সামাজিক মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা পেতে শুরু করে।

তবে অতিসম্প্রতি ঘটনাপ্রবাহ যেন আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কয়েকজন যুবক যাদের সবাই শিক্ষার্থী কি না জানা যায়নি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে নারীর পোশাকের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেছে। তাদের দেখাদেখি আরও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ধরনের প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেকেই আছেন যারা এই প্রচারণার সরাসরি সমর্থক, আবার এরকম আছেন যারা এর প্রকাশ্য সমর্থক না হলেও, এই ধরনের প্রচারণা তাদের কাছে নিরীহ প্রকৃতির, এর মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এই ধরনের প্রচারণার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মুখ্য উদ্দেশ্যেই হচ্ছে সমাজে নারীর স্বাধীনতাকে অগ্রাহ্য করা, নারীকে ছোট করা, সবচেয়ে যেটা ভয়ংকর তা হচ্ছে নারীকে তথাকথিত পুরনো ধারণার মধ্যে বাক্সবন্দি করে ফেলা। আগ্রহ উদ্দীপক বিষয় হচ্ছে এই ধরনের প্রচার-প্রচারণায় আবার কিছু মেয়েদের যুক্ত করা হয়। বিষয়টা এমন যে, তারা সত্য উপলব্ধি করে নিজেরাই সমাজ সংস্কারে এগিয়ে এসেছে।

এই ধরনের প্রবণতা যে একদম নতুন না তার প্রমাণ পাওয়া যায় বেগম রোকেয়ার লেখনীতে। ১৯৩১ সালে প্রকাশিত ‘অবরোধ বাসিনী’র শুরুতেই তিনি বলে নিয়েছেন, ‘আমরা বহুকাল হইতে অবরোধ থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের বিশেষত আমার কিছুই নাই।’ আর এটাই হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাতুর্যপূর্ণ হাতিয়ার। যে কৌশল সাধারণভাবে অনেককেই চমৎকৃত করে, আত্মোপলব্ধির নামে অধস্তনতাকে অন্যকেও বরণ করে নিতে উৎসাহিত করে। তবে পোশাকের স্বাধীনতা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যারা এ ধরনের জীবনযাপন করতে চান এটা তাদেরও স্বাধীনতা। এর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে এই ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু নির্বিষ প্রচার-প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই প্রচার-প্রচারণা ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে আর এর পরের ধাপটাই হচ্ছে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে বাধ্য করা। যার বহুল প্রচলন ইতিমধ্যে আমাদের সমাজে আছে। ফলে সমাজে এই ধরনের প্রবণতা মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্ল্যাকার্ডে পোশাকের মাধ্যমে পাবলিক নুইসেন্স না ছড়ানোর কথা বলা হলেও, এই প্ল্যাকার্ডের ওপর ভর করে পাবলিক প্লেসে নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানি আরও বেশি প্রশ্রয় পেতে পারে যেমনটা ঘটেছিল নরসিংদী রেল স্টেশনে এক তরুণীকে হেনস্তার মধ্য দিয়ে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত