নির্বাচনী রোডম্যাপ ও আস্থার সংকট

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৪৯ পিএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। সংশয়ী মানুষরা বলছেন, রোডে যত খানাখন্দক তাতে ম্যাপ নিয়ে রাস্তা চেনা যাবে কিন্তু চলতে গেলে হোঁচট খেতে হবে প্রচুর। খানাখন্দকে পূর্ণ রাস্তায় গাড়ি যত ভালোই হোক না কেন চালক পূর্ণ গতিতে বা নিশ্চিন্তে চালাতে পারে না। ফলে চলাচলের জন্য বাহন গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো রাস্তা। সেই রাস্তার নকশা বা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তাদের নকশা অনুযায়ী নির্বাচন হবে ডিসেম্বরের শেষে বা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে।

বাংলাদেশের জনগণকে বলা হয় সবচেয়ে বেশি নির্বাচনে আগ্রহী জনগণ। নির্বাচনকে তারা উৎসবের মতোই মনে করতেন। সেই দেশে নির্বাচন দিন দিন যেভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে তাতে নির্বাচন তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে অনেকাংশে। তাই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা যা সংবিধান কর্র্তৃক নির্ধারিত তা কতটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে নির্বাচন কমিশন পালন করবেন তা দেখার আগ্রহ মানুষের আছে।

নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোট হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে সিটি করপোরেশন ও জেলা সদরের আসনগুলো। তারা জানিয়েছেন তাদের লক্ষ্য ৫টি যথা : অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, স্বচ্ছ নির্বাচন, নিরপেক্ষ নির্বাচন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও সুষ্ঠু নির্বাচন। যদিও সুষ্ঠু নির্বাচন যদি প্রধান লক্ষ্য হয় তাহলে এই লক্ষ্যের মধ্যেই বাকি সবগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে তবুও তারা আলাদা আলাদা করে বলেছেন। হয়তো তারা ভেবেছেন এতে প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্ব বেশি অনুভূত হবে। তারা বলেছেন সুষ্ঠু ভোটে বাধা বা চ্যালেঞ্জ ১৪টি আর বাধা উত্তরণের উপায় ঠিক করেছেন তারা ১৯টি। তাদের কাছে তিনটি চ্যালেঞ্জ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থার অভাব। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলসমূহের আস্থা থাকা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো : নির্বাচনের সময় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে? তৃতীয় চ্যালেঞ্জ : নির্বাচনে ইভিএমের প্রতি রাজনৈতিক দলের অনাস্থা দূর করবেন কীভাবে?

এটা সবাই বিবেচনা করছেন যে, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের পটভূমিতে ২০২৩ বা ২০২৪ সালের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না কিংবা নির্বাচনকে সুষ্ঠু করা হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ ও বিতর্ক এখন তুঙ্গে। এ রকম এক পরিস্থিতিতে গত জুলাই মাসে ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ২৮টি দল অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কমিশনের সঙ্গে বসে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই বলে তাদের মতামত লিখিতভাবে পাঠিয়ে দেয়। বিএনপিসহ ১১টি দল মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেনি। সংলাপের পর জানা গিয়েছিল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ বাকি ২৮ দলের সংলাপে সব মিলিয়ে তিন শতাধিক প্রস্তাব জমা পড়েছিল ইসির কাছে। সংলাপে অংশ নেওয়া ২৮টি দলের মধ্যে ২টি দল কোনো মতামত দেয়নি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদসহ ১২টি দল শর্তসাপেক্ষে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছিল, জাতীয় পার্টিসহ ১০টি দল সরাসরি ইভিএমের বিপক্ষে মত দিয়েছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, বিকল্পধারা ও তরিকত ফেডারেশন এই চারটি দল ইভিএমের পক্ষে মত দিয়েছে। সংলাপে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে এবং তরিকত ফেডারেশন ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছিল। তখন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল যে ইভিএম নিয়ে মতামতের প্রশ্নে দলের সংখ্যা বিবেচনায় ইভিএমের সমর্থনের চেয়ে বিরোধিতাকারীর সংখ্যাই বেশি।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখন রোডম্যাপে উল্লেখ করেছে, গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত সংলাপে ২৯টি দল ইভিএম নিয়ে মতামত দিয়েছে, এর মধ্যে ১৭টি দলই কোনো না কোনোভাবে ইভিএমের পক্ষে ছিল। সরাসরি ইভিএমের বিপক্ষে ছিল ১২টি দল। কিন্তু সংলাপে দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর লিখিত প্রস্তাব বা মতামত, যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল সে অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ইসি যে ১৭টি দলকে ইভিএমের পক্ষে বলে প্রচার করেছে, তার মধ্যে ৩টি দল সরাসরি ইভিএমের বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। ১টি দলের ইভিএম নিয়ে কোনো মতামত ছিল না। আর ৯টি দল ইভিএম নিয়ে বিভিন্ন শর্তের কথা বলেছিল। সরাসরি ইভিএমের পক্ষে অবস্থান ছিল যে চারটি দলের তারা হচ্ছে আওয়ামী লীগ, তরিকত ফেডারেশন, সাম্যবাদী দল এবং বিকল্পধারা। এর মধ্যে তরিকত ও সাম্যবাদী দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক। ১৪ দলের বাইরে বিকল্পধারার সঙ্গে এক ধরনের নির্বাচনী সমঝোতা ছিল গত সংসদ নির্বাচনে। ফলে কমিশনের বক্তব্যের সততা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

আবার নতুন ইভিএম কেনার বিষয়টি যৌক্তিক হবে কি না তা ভেবে দেখার অনুরোধ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন ৩৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক। ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোট করতে হলে নতুন যন্ত্র কিনতে হবে। একাদশ নির্বাচনের আগে ইভিএম ক্রয়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার (৪৫০ মিলিয়ন ডলার) মতো ব্যয় হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, ১৫০টি ইভিএমে নির্বাচন করতে হলে আরও ২ লাখ নতুন মেশিন কিনতে হবে। তাতে ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ব্যয় কতটা যৌক্তিক সে প্রশ্নও উঠছে জোরেশোরে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও ভোটারদের আস্থাহীনতার কারণে পৃথিবীর অনেক দেশই এখন ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসছে। প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক উন্নত জার্মানি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসও ইভিএম ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। জানা গেছে, পৃথিবীর ১৭৮টির মধ্যে বর্তমানে শুধু ১৩টি দেশ তাদের সব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো আমেরিকা এবং ভারত। কিন্তু সেখানেও বিরোধিতা হচ্ছে। সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি আর সবচেয়ে বেশি ভোটারের দেশে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক এখন প্রবল। ফলে ইভিএম এখন নির্বাচনী স্বচ্ছতার গ্যারান্টি নয়।

একটা বিষয় কিন্তু ভাবিয়ে তুলছে অনেককেই। তা হলো ইভিএম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আগ্রহের কারণ কী? সংলাপের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছিলেন, ‘ইভিএমে যাওয়ার একটা বড় সিদ্ধান্ত আমাদের নিজেদের। ভোটটাকে হ্যান্ডল করবে রাজনৈতিক দল নয়, ভোটকে হ্যান্ডল করবে ইসি।’ ১৫০ আসনে ইভিএমে নির্বাচন হবে এই সিদ্ধান্ত কীভাবে বা কোন বিবেচনায় নিলেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি তখন বলেছিলেন, ‘যারা ভোট দিতে আসবেন, সেটা আমাদের মুখ্য বিবেচনায় এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো কে কী বলেছে, সেটা আমাদের মুখ্য বিবেচনায় আসেনি। কিন্তু বক্তব্যগুলো বিবেচনায় নিয়েছি। একই সঙ্গে যেসব ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগে কেন্দ্রে আসেন, তারা যেন আরও ভালোভাবে ভোট দিতে পারেন, তা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ বিতর্কটা নিষ্পত্তি হয়নি তখনো। কারণ প্রশ্ন উঠেছিল, নির্বাচন কমিশন নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন কেন? এখন আবার তাদের মতকে বিবেচনায় নিয়ে বেশির ভাগ দল চায় বলে যুক্তি করছেন কেন?

যদিও ইভিএমের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে বলতে গিয়ে গত ৩০ মে নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান বলেছিলেন, ‘গোপন কক্ষে একজন করে “ডাকাত” দাঁড়িয়ে থাকে, এটাই ইভিএমের চ্যালেঞ্জ।’ (প্রথম আলো, ৩০ মে ২০২২) পাশাপাশি এই সন্দেহ তো প্রবল যে ভোটার শনাক্তকরণের পর কথিত ডাকাতরা ‘বাটন’টি টিপে দেওয়ার পরিবেশ পরিস্থিতি থাকলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কারিগরি উৎকর্ষের ইভিএম দিয়েও নির্বাচন স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য হবে কি?

ভোটারদের মনে এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি অবিশ্বাস জাগে যে মূলত ক্ষমতাসীন দলই নির্বাচন পরিচালনা করে, নির্বাচন কমিশন তাদের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারবে না। তাহলে ইভিএমের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এবং ভোটব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা। ফলে ইভিএম বিষয়টি শুধুই কারিগরি নয়, বরং অতিমাত্রায় রাজনৈতিক এবং জনধারণ সম্পৃক্ত বিষয়।

বাংলাদেশে যেসব ইভিএম আছে সেগুলোর একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এতে ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল বা ভিভিপিএটি নেই। ভিভিপিএটি হচ্ছে, ভোটার ভোট দেওয়ার পর ইভিএম থেকে একটি কাগজ বেরিয়ে আসবে। এতে ভোটার কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন, তা দেখতে পাবেন। ফলে তিনি নিশ্চিত হবেন যে তার ভোট সঠিক জায়গায় পড়েছে। তবে কাগজটি কিন্তু ভোটার নিতে পারবেন না। এটা থেকে যাবে যাতে ফলাফল পুনঃগণনা করার সময় কাজে লাগে। ভিভিপিএটি না থাকায় নির্বাচন কমিশন ভোটের যে ফলাফল ঘোষণা করবে, তা-ই চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এটি পুনঃগণনা বা অডিট করার সুযোগ থাকবে না। ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তা দূর করার কোনো উপায় থাকবে না। সম্ভবত এসব কথা ভেবেই নির্বাচন কমিশনের গঠন করা কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান প্রয়াত জামিলুর রেজা চৌধুরী ২০১৮ সালে ইভিএম কেনার সুপারিশে সই করেননি।

একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। সৈয়দ মুজতবা আলী লিখেছিলেন, একবার পোর্ট সৈয়দে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজকে তোপধ্বনি দিয়ে স্বাগতম জানানো হয়নি বলে বন্দরে দায়িত্বরত ক্যাপ্টেনের বিচার হচ্ছিল। জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তোপধ্বনি করোনি কেন? ক্যাপ্টেন বলেছিল, স্যার ২২টি কারণ ছিল। বলো কী কী কারণ? ক্যাপ্টেন বলল, প্রথমত বারুদ ছিল না, দ্বিতীয়ত সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডমিরাল বলেন, থাক থাক আর কারণ জেনে দরকার নেই। বারুদ না থাকলে অন্য কারণ তো অবান্তর। সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রথম চ্যালেঞ্জ আস্থা। তাহলে ইভিএম কিংবা আর কোনো চ্যালেঞ্জ নিয়ে কি খুব বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন আছে?

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত