ভারতে গণতন্ত্র আছে বলে লোকপ্রসিদ্ধি রয়েছে, কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চেহারাটা কী তা ধরা পড়ে তার জেলখানাতেই। এটা সব রাষ্ট্র সম্পর্কেই সত্য। কারাগার হচ্ছে রাষ্ট্রের দর্পণ। সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রকে চিনতে হলে তার জেলখানায় যাও, এ খুবই খাঁটি পরামর্শ।
‘মাই ডেজ ইন এন ইন্ডিয়ান প্রিজন’ নাম দিয়ে মেরি টাইলার নামে একজন ইংরেজ মহিলা একটি বই লিখে ওই চেহারাটা তুলে ধরেছেন, জনসমক্ষে। তার এই বই একটি নতুন ‘রবিনসন ক্রুশো’। তফাৎ এই যে, ড্যানিয়েল ডিফোর সেই বিখ্যাত কাহিনীর সবটাই কাল্পনিক, আর মেরি টাইলারের এই নতুন কাহিনীর সবটাই বাস্তবিক। বাস্তবকে তিনি এতটুকু বাড়িয়ে বলেননি, বরঞ্চ পড়তে পড়তে মনে হয় নিজের ভেতরের অনেক অনুভূতি ও ক্ষোভকে আড়ম্বরহীন সাদামাটা ভাষার শাসনে আটক করে রাখতে চেয়েছেন। ড্যানিয়েল ডিফোরও সাদামাটা, খুবই নিরাভরণ, কিন্তু তার কল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ, যে জন্য ‘রবিনসন ক্রুশো’ যারা পড়েন এক নিঃশ্বাসেই পড়েন। মেরি টাইলার লেখিকা নন, সাধারণ মানুষ, স্কুল শিক্ষিকা, ১৯৭৭ সালে ‘মাই ডেজ ইন এন ইন্ডিয়ান প্রিজন’ যখন লেখেন তখন বয়স সদ্য ত্রিশ পার হয়েছে, তাকে বহন করতে হয়েছে অসাধারণ অভিজ্ঞতার এক নির্মম বোঝা। সেই বোঝাই তাকে লেখিকা করল, নইলে তার লিখবার কথা নয়। তার বইও রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম আমি, এই সেদিন।
মেরি টাইলার ভারতে এসেছিলেন ব্যক্তিগত কারণে। ১৯৭০ সালে। সে হচ্ছে নকশালবাড়ি আন্দোলনের কাল। তিনি তার বাঙালি স্বামী অমলেন্দু সেনের সঙ্গে দরিদ্র ভারতবাসীর জীবন দেখতে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সীমান্তবর্তী এক গ্রামে। পুলিশ সেই গ্রাম ঘেরাও করে ৫১ জন তরুণ-তরুণীকে চালান দিয়েছিল নকশালী বলে। এই মহিলা তাদের একজন। রটে গেল খবর যে, মারাত্মক এক নেত্রী গ্রেপ্তার হয়েছে। ইংল্যান্ড থেকে চীন হয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতে এসেছে বিপ্লব করবে বলে। (একজন পুলিশ অফিসার বলেছেন তাকে, দু’শ বছর শাসন করেও শখ মেটেনি, আবার এসেছ আমাদের দেশ দখল করতে।)
অতিনাটকীয়ভাবে তিনি জেলে চলে গেলেন, অভিযোগ কী লিখিতভাবে জানলেন না, প্রতিদিন আশা করলেন মুক্ত হবেন, পাঁচ বছর চলে গেল বিনা বিচারে; তারপর হঠাৎ একদিন দেখেন মহামান্য অতিথির সম্মান পাচ্ছেন, জেল ওয়ার্ডার স্যালুট দিচ্ছে, দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা, বিহারের হাজারীবাগ থেকে ফার্স্ট ক্লাস কামরায় ট্রেনে এলেন কলকাতায়, সেখান থেকে বিমানবন্দরে মহামান্য অতিথিদের কক্ষে আতিথেয়তার চূড়ান্ত, হাত মিলিয়ে বিদায় নিলেন পদস্থ কর্মচারীদের কাছ থেকে, তারপরে প্লেন, প্লেনে করে লন্ডন, বিমানবন্দরে নেমে সংবাদ সম্মেলন। কোথা থেকে কোথায়। সবটাই অবিশ্বাস্য।
আরও বেশি অবিশ্বাস্য মাঝখানের অভিজ্ঞতা, যেখানে তিনি রবিনসন ক্রুশোর মতো একাকী। বিপজ্জনক, তাই নির্জন প্রকোষ্ঠে থাকেন কখনো, এবং সব সময়ই বিচ্ছিন্ন। স্বামী অমলেন্দু আরেক জেলে, স্বামী চিঠি লেখেন, ইনি সেসব চিঠি পান না। কয়েক শ’ মাইল ট্রেন ভ্রমণ করে স্বামীর আত্মীয়-স্বজন আসেন দেখা করতে, তাতে শ্রম যত হয় সিদ্ধি ততটা হয় না। বিলেত থেকে বাবা টাকা পাঠান, পৌঁছায় না। খবর রটে গেছে বিলেতি কাগজে যে, তার প্রাণদন্ডাদেশ হয়ে গেছে। সে গুজব বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন পড়লে কেমনভাবে নেবেন ভেবে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। মা’র বক্ষব্যাধি ছিল, অপারেশন হলো ওই সময়ে। তারপর মা মারাও গেলেন, মেয়ের ওই কারাবন্দি থাকা অবস্থাতেই। জেল অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে মেরি টাইলারকে সে-খবর যখন দেওয়া হলো, তিনি দেখেন তিনি কাঁদতে পারছেন না, এই ভয়ে যে জেল প্রশাসন তার দুর্বলতা দেখে ফেলবে। ফিরে এসে কেঁদেছেন, সহবন্দি বীণা, হীরা, গোলাপীদের জড়িয়ে ধরে। আর ওই মেয়েরা যারা জেলে এসেছে অপরাধী হিসেবে, খারাপ খারাপ নাম সেইসব অপরাধের, তারা দেখা গেছে অনেক বেশি ভালো মানুষ তথাকথিত ভালো মানুষদের তুলনায়। জেলের ভালো মানুষ কর্মকর্তারা ঘুষ খায়, নিপীড়ন করে; আর এরা এসে দাঁড়ায় পাশে। মেরি টাইলারকে বলেছে এরা, এদেশে তোমার কেউ নেই, না-থাকুক, এই দেখো আমরা আছি, আমরা তোমার বোন, আমরা তোমার মা। এই মেয়েরা নিজেদের ভাগ কেটে রান্না করে খাইয়েছে তাকে। সান্ত¡না দিয়েছে, পরামর্শ দিয়েছে, অসুস্থ হয়ে পড়লে যত্ন নিয়েছে। এর বিপরীতে ব্রিটিশ হাই কমিশনের কর্তাদের দেখা যাচ্ছে মোটেই বুঝতে চাচ্ছে না তাদের স্বজাতীয় বন্দিনীর সমস্যাগুলো কী ও কেমন। কল্পনার রবিনসন ক্রুশোর অভিজ্ঞতা বাস্তবের মেরি টাইলার কোথায় পাবেন? কিন্তু তার সঞ্চয়ও কিছু কম নয় তাই বলে।
ভারতবর্ষের প্রতি বিদেশিদের আকর্ষণ পুরনো ব্যাপার। কেউ আসে ভ্রমণে, অধিকাংশই এসেছে লুণ্ঠনের আশায়, লুণ্ঠনটাই আসল, বাকিটা ছদ্মবেশ। কিন্তু কেউ কেউ, অত্যন্ত নগণ্য তাদের সংখ্যা, এসেছেন অন্য প্রয়োজনে। মানবিক।
আরেকজন মেরি, মেরি কারপেন্টার চারবার এসেছিলেন ভারতবর্ষে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে। তার ওপর প্রভাব পড়েছিল তার পিতৃবন্ধু রাজা রামমোহন রায়ের। ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে তার অত্যন্ত অধিক কৌতূহল ছিল, ওদিকে উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদের তখন উন্মেষকাল, মেরি কার্পেন্টার সেই উন্মেষের পক্ষে কাজ করেছেন। ভারতবর্ষে এসে তিনি এর কারাগারগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, কেননা তার বিশেষ আগ্রহ ছিল কারা-সংস্কারের। বিলেতে ফিরে গিয়ে মেরি কার্পেন্টার বই লিখেছিলেন ‘সিক্স মানথস ইন ইন্ডিয়া’ নামে। বড় বই, দুই খন্ডে।
মেরি কার্পেন্টারের কয়েক বছর পরে এসেছিলেন আরেক মহিলা, মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল, ভগিনী নিবেদিতা নামে যিনি অধিক পরিচিত। তার ওপরে প্রভাব পড়েছিল অপর একজন বিখ্যাত ভারতীয়ের, স্বামী বিবেকানন্দের। মার্গারেট নোবেলের অনুপ্রেরণাটি ছিল আধ্যাত্মিক, তিনি কলকাতায় এলেন, ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করলেন, নাম হলো তার ভগিনী নিবেদিতা। পরে, বিংশ শতাব্দীতে যখন সন্ত্রাসবাদের শুরু তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি, অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে। ভগিনী নিবেদিতা মারা যান ১৯১২ সালে, মেরি টাইলার কলকাতায় আসেন আরও অনেক পরে, ৫৮ বছর পরে, ১৯৭০ সালে। একাল সম্পূর্ণ ভিন্ন কাল।
আধ্যাত্মিকতার নয়, জাতীয়তাবাদের সংগ্রামের নয়। একালে স্বাধীন ভারতের দরিদ্র মানুষ লড়াই করেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, তাদের সঙ্গে মুখোমুখি দ্বন্দ্ব তাই রাষ্ট্রযন্ত্রের। মেরি টাইলার তার পূর্বসূরি দুজনের মতো অত্যন্ত বিশিষ্ট মানুষদের প্রভাবে পড়েননি, তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল অমলেন্দু সেন নামে কলকাতার এক ইঞ্জিনিয়ারের। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে অমলেন্দু তখন পড়াশোনা করছেন পশ্চিম জার্মানিতে, সেখানে মেরি গিয়েছিলেন বেড়াতে। দুজনের পরিচয় হয়েছে হঠাৎ করে, এবং জেনেছেন তারা যে তাদের মধ্যে গভীর ঐক্য রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির। মেরি টাইলার ইংরেজ জাতির সাম্রাজ্যবাদী গৌরবে আস্থা হারিয়েছিলেন আগেই, উত্তর লন্ডনের যে-স্কুলে পড়াতেন তিনি সেখানে নানা জাতির ছেলেমেয়েদের দেখে বিদেশ সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল মনের ভেতর। অমলেন্দুকে দেখা গেল গভীরভাবে দেশপ্রেমিক। জাতীয়তাবাদী নয়, দেশপ্রেমিক। পশ্চিমে থাকলে বেশ ভালো থাকতে পারতেন তিনি বৈষয়িকভাবে, সেই মোহ ছিন্ন করে ফিরে এলেন কলকাতায়।
কলকাতা-লন্ডনে চিঠির আদান-প্রদান হয়েছে, অমলেন্দু বলেছেন, এসো, ভারতবর্ষ দেখে যাও। সেই ডাকেই ভারতে আসা মেরি টাইলারের। কাজটা তার বাবা-মা পছন্দ করেননি। তবু যখন যাবেনই তখন বাবা বলেছেন, ভারতে তোমার নানা অভিজ্ঞতা হবে, দেখো জড়িয়ে পড়ো না, দূরে থেকো। এই সতর্কবাণী অপ্রয়োজনীয় প্রমাণিত হয়নি। কেননা মেরি টাইলার জড়িয়ে পড়েছিলেন।
(আগামীকাল বৃহস্পতিবার সমাপ্য)
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়