এইচএসসির ফল কোন বার্তা দেয়?

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:৫৬ এএম

২০২২ সালের ৬ নভেম্বর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় এবং ঐ বছরের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরীক্ষা চলে। এতে ১২ লাখ ৩ হাজার ৪০৭জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এবার ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখ ঐ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, সব বোর্ডে পাসের হার ৮৬ শতাংশ। গতবার এই হার ছিল ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক লাখ ৮৬ হাজার পরীক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছে, গতবার জিপিএ ৫ পেয়েছিল এক লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন। এবার মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৯২.৫৬ শতাংশ, দ্বিতীয় কারিগরি শিক্ষাবোর্ড ৯১ দশমিক ২ শতাংশ। সাধারণ বোর্ডের মধ্যে কুমিল্লায় পাসের হর ৯০ দশমিক ৭২ শতাংশ। এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবারও পাসের হার ও জিপিএ ৫ পাওয়ার দিক দিয়ে এগিয়ে আছে মেয়েরা। এবার ছেলেদের পাসের হার ৮৪ দশমিক ৫৩, আর মেয়েদের ৮৭ দশমিক ৮৪। এবার মোট জিপিএ ৫ পাওয়া ছেলেদের সংখ্যা ৮০ হাজার ৫৬১ এবং মেয়েদের সংখ্যা ৯৫ হাজার ৭২১ জন। গত বছরের তুলনায় এ বছর জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১২ হাজার ৮৮৭ জন। বেড়েছে শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠান, কমেছে শতভাগ পাস। শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এক হাজার ৩৩০ প্রতিষ্ঠান থেকে। অন্যদিকে পরীক্ষায় ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউই পাস করেনি। করোনার সময় সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার যেখানে ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, করোনার পরের বছরই একই পরীক্ষায় ওই বিষয়ে পাসের হার নেমে এসেছে ৯০ শতাংশের নিচে। এতে সার্বিক ফলাফলে পাসের হারসহ জিপিএ ৫ পাওয়ার সংখ্যা কমেছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে শুধু ঢাকা বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৯২.৩৩ এবং কুমিল্লা বোর্ডে ৯৪.৬৪ শতাংশ। এর বাইরে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে।

ওপরে সংখ্যাগুলো আমাদের কোন মেসেজ দেয়? যেমন ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ, এবার তা কমে হয়েছে ৮৬ শতাংশ। এর কারণ? দেশে কি হঠাৎ কোনো হরতাল বা দুর্যোগ বা দুর্বিপাক ছিল যে গতবারের চেয়ে এবার এত কমসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করেছে? করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা হয়নি। জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নে শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করে। ২০২১ সালেও একই কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে ডিসেম্বরে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে গ্রুপভিত্তিক তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয়ে ছয়টি পত্রে এইচএসসি পরীক্ষা হয়েছিল। অর্থাৎ ২০২১ সালে প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি, সব বিষয়ে মূল্যায়ন হয়নি। সব বিষয়ে মূল্যায়ন হলে পাসের হার কমে যেত।

আরও দুই তিনটি পরিসংখ্যান যদি বিবেচনায় নিই তাহলে সে দুটির অর্থই বা কী দাঁড়ায়? একটি হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সর্বোচচ (৯২.৫৬ শতাংশ)। তার অর্থ কি এই যে, কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছেলেমেয়েদের তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের শিক্ষার্থীরা বেশি মেধাবী, কিংবা তারা আরবিও ভালো জানে, বাংলাও ভালো জানে কিংবা অন্যকিছু? এর কোনো সদুত্তর নেই। একইভাবে পাসের হারে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (৯১.২ শতাংশ)। তারাও কি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীদের চেয়ে অধিকতর মেধাবী কিংবা তারা কারিগরি শিক্ষায় বেশ পারদর্শী। তাদের দক্ষতা দ্বারা তারা দেশে কিংবা বিদেশে চমৎকার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে পারে? তারা প্রাকটিক্যালি অনেক ভালো? আসলে বিষয়টি তা-ও নয়। দু-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া দক্ষতার বাস্তব প্রয়োগে তারা অনেক পিছিয়ে। তাহলে এই ফল দ্বারা আমরা কী বুঝতে পারি, আমাদের জন্য এটি কী মেসেজ বহন করে? সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে কুমিল্লা বোর্ড এগিয়ে আছে? কেন? কীভাবে? এর কি কোনো সঠিক উত্তর আছে?

এবার বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে গ্রামগঞ্জের বেসরকারি কলেজগুলোতে। ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউই পাস করেনি যে সংখ্যা গতবার ছিল ৫টি। এটিরই বা কী অর্থ? একটি অর্থ হতে পারে ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা অকাতরে নকল করার সুযোগ পেয়েছিল ২০২১ সালে, এবার হয়তো কোনো কারণে সেটি করতে পারেনি তাই এত প্রতিষ্ঠান ফেল করেছে। এ ছাড়া এর খুব একটা ভালো ব্যাখ্যা মেলানো যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক যা গতবার যেভাবে ছিল এবারও সেভাবেই আছে। তাহলে হঠাৎ এত প্রতিষ্ঠানের শূন্য পাস কেন? শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রাজধানী ঢাকার কলেজও আছে। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৪টিই ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন আর মাদ্রাসা বোর্ডের ৪টি, আর দুটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন।

উচ্চ মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার বৃহত্তর জগতে প্রবেশের সুযোগ পায়, যা ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে অনেক শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে বোঝা যায় বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ত্রুটি রয়েছে। এই ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সমাজে যত ছোট-বড় উদ্যোক্তা হয়েছেন, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন, অন্য মানুষের জন্য কাজের ব্যবস্থা করেছেন তাদের অধিকাংশেরই এইসব গুণ ছিল এবং আছে। আর যারা শুধু পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত ছিল তাদের কিন্তু এসব কাজ করতে দেখা যায় না। বরং তারা ঐসব প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য ছোটাছুটি করে। দুঃখ প্রকাশ করে। অনেকে বলেও থাকেন যে, শিক্ষিত মানুষের দাম নেই, দাম হয়েছে অশিক্ষিত ছেলেমেয়ে যারা ক্লাসের পেছনে থাকত। আসলে ঘটনা তো তা নয়। তারাই প্রকৃত শিক্ষিত, তারাই সমাজের প্রকৃত উপকার করছে। আর যারা শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা আর নম্বর পাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকত তারা সমাজের জন্য, মানুষের জন্য খুব একটা কিছু করতে পেরেছে এমন দৃশ্য বিরল উদাহরণ ছাড়া সচরাচর দেখা যায় না।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত