সঠিক উত্তর দিয়ে পন্ডিত মশাইয়ের পরাজয়

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৩, ১১:২৩ পিএম

ত্রিকালদর্শী বৃদ্ধ অছিমদ্দীন ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল আর হালের বাংলাদেশ আমলে ৫২ বছর পার করেছেন। পরকালের পথে পা দিয়ে রেখেছেন তিনি। অছিমদ্দীন দেখেছেন কীভাবে তার সামনে ব্রিটিশরা তল্পিতল্পাসহ চলে গেছে এ দেশ ছেড়ে, দেখেছেন কীভাবে সংসার ভেঙেছে পাকিস্তানিদের। নিজে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ স্বাধীন করতে মহান মুক্তিযুদ্ধে। অতীত তার কাছে এখন ধূসর, স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে আনন্দ-বেদনার সুখ সর্বনাশের নানান মুহূর্তগুলো গুটিয়ে গেছে। অফুরন্ত অবসরের আয়নায় অছিমদ্দীন দেখেন তার ছেলেবেলা, কৈশোরকাল, ক্যাম্পাস জীবন, যুদ্ধের রণাঙ্গন, মনুষ্য কারসাজিতে জিনিসপত্রের দামবৃদ্ধির বেসাতি, নীতি-নৈতিকতার নানান বেশভূষা।

নব্বই বছরে কত কিছিমের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে তার! জমিদার বরকন্দাজের পর একবিংশ শতাব্দীর সূচনাপ্রহরে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ এই সময় ও সমাজে বয়স, বর্ণ, পর্যায় ও প্রকার ভেদে নানান কিসিমের মানুষ এখনো রীতি পদ্ধতি, নীতি ও নিয়মে ঔপনিবেশিত। শ্রমজীবী কর্মক্লান্ত মানুষের পাশাপাশি অতি চালাক ফিটফাট ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও কর্মী, শিক্ষাবিহীন শিক্ষিতের সমারোহের পাশে প্রযুক্তি প্রখর মেধাবী মুখ, মুক্তবুদ্ধি শান্ত সমাহিত চিন্তাচেতনার সারিতে সহসা মৌলবাদী চেহারার মানুষ, উন্নয়নকর্মীর পাশাপাশি নিজের আখের গোছাতে তৎপর এনজিও কর্ণধার, সন্ত্রাসীর ভয়ে আতঙ্কিত মানুষ, চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী আত্মউৎসর্গীকৃত সেই পুলিশ সার্জেন্ট, ষড়যন্ত্রের শিকার গৃহহীন মানুষ, আশ্রয়ণ প্রকল্পে হাসিমুখের মানুষ, বানভাসি মানুষ, নিঃস্বার্থ ত্রাণকর্মীর পাশে সুযোগসন্ধানী-অসৎ উদ্দেশ্য অভিলাষী চোখের মানুষ, কোণঠাসা সৎ ও নিষ্ঠাবান চাকুরে, ধান্দাবাজ আর আত্মস্বার্থের শর্করাসমৃদ্ধ জনস্বার্থসেবী আমলা, অবিবেচক বাসের হেলপার, ট্রাকের মাতাল ড্রাইভার, নীল সাদা অধ্যাপক, একচোখা আঁতেল, রাজনৈতিক শিল্পী, ঋণখেলাপি, ব্রিফকেসবাহী নতুন শিল্পপতি, নকল সরবরাহকারী, উদ্ধত ছাত্রনেতার সামনে অসহায় অধ্যক্ষ, জামিনপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী, কুকুরের মাংস বিক্রেতা আর এসিডে দগ্ধ তরুণীর দেশে সেঞ্চুরি করা ক্রিকেটার। সময় সমাজ ও সংসারে এত পরিবর্তন দেখার জন্য প্রভু নিরঞ্জন তাকে যে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন এটাই আশ্চর্য লাগে। বড় কৃতজ্ঞতা তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি।

চোখে মোটা চশমা পরেন তিনি। ইতিমধ্যে তিনবার চোখের ছানি কাটাতে হয়েছে, দু’বার বড় অপারেশন, ৪৩ এর মন্বন্তর, ৭১ এর রণাঙ্গন, অতিমারী করোনাকালে মরণ পথ থেকে ফিরে এসেছেন। চৌকস ক্রিকেটারের মতো সাফল্যের ছক্কা মেরেছেন কয়েকবার, আবার বোল্ড আউট হয়ে সাজঘরেও ফিরেছেন কখনো-সখনো। শ্রান্তি ও ক্লান্তির কোলে মাথা রেখে তন্দ্রায় গিয়েছেন আবার নতুন উদ্যমে জেগে উঠেছেন। অছিমদ্দীন তালপাতায় হাত মকশ করেছেন, শ্লেটে পেনসিল ভেঙেছেন, কাগজে মুখে কালির আলপনা এঁকেছেন। এখন তিনি দেখেন তার নাতিপুতিরা কম্পিউটারে লেখাপড়া করে। ক্যালকুলেটারে অঙ্ক কষে, নামতা মুখস্থ তারা করে না, বানান শেখা লাগে না তাদের ব্রেনে; অঙ্ক কষার কাজটা নিয়েছে মেশিন, কত রঙ-বেরঙের জীবনজ¦লন্ত জীবন তরঙ্গ।

ব্রিটিশ আমলে অছিমদ্দীন দেখেছেন গোরা পুলিশ, খাকি হাফপ্যান্ট বেল্ট পরা চৌকিদার-দফাদার, নায়েব কানুনগো, মোটা পেট পঞ্চায়েত, শৌখিন ধুতিপরা জমিদার বাবু, রুমি টুপি পরা মৌলবি, পৈতা লাগানো ব্রাহ্মণ আর বাংলার বারবধূ। কলের গানে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ কিংবা ‘নিমাই দাঁড়াবে’ জাতীয় গান শুনতে শুনতে রাতে ঘুমুতে যেত বালক অছিমদ্দীন। কলের গান থেকে টেপ, টেপ থেকে চিপসে এখন গান শোনা যায়, ইউটিউবে পুরো সিনেমা দেখা যায়। স্কুলে যাওয়ার তাড়া ছিল না, তবে কুটে পন্ডিতের হাতের বেতের ভয় তো ছিলই। এখন তো বিনামূল্যে পাওয়া পাঠ্যবই দামি গাইড বইয়ের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। অকাতরে বিদ্যাদানে ধন্য গুরুমশাইরা এখন কোচিংয়ের কসাই।   

সেই অছিমদ্দীন কী দেখছেন তার বায়ান্ন বছর বয়েসি বাংলাদেশে? জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নীতি-নৈতিকতাবিহীন দলীয় কর্মী প্রবেশের প্রথা কেন চালু হলো সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির পারিবারিক, সামাজিক সংসারে? এখন সামান্য একটা চারিত্রিক সনদ আনতে গেলে ইউপি সদস্য পর্যন্ত পক্ষ-বিপক্ষ ভেদে আচরণ করে। গ্রামের ভেতর দিয়ে এলজিইডি রাস্তা বানাবে সেখানে ভাগ বসাবে ক্ষমতাসীন দলীয় কর্মী, সেই রাস্তা ওজন সর্বস্ব ভারী যানবাহন চলাচল করে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত করবে ইউপি চেয়ারম্যান, স্থানীয় ঠিকাদার এমনকি উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায়, চোরে চোরে মাসতুতো ভাইয়ের মতো আচার-আচরণে স্থানীয় শান্তি নিয়ম-শৃঙ্খলার মাঠ হচ্ছে বেদখল। বড় রাস্তার শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য বড় বড় উপদেশমূলক (গতিসীমা, ওভারলোডেড গাড়ি, একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না) বিলবোর্ডের খরচটাও অকার্যকর অপচয় মনে হয় প্রতিদিন গড়ে ৭০/৮০ জনের পথে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদে। বড় শহরে ট্রাফিক সিগন্যালও জ¦লে আবার হাততোলা ট্রাফিকের বিচার বিবেচনাহীন ব্যবসাও চলে।   

অছিমদ্দীনের গ্রামের বসতবাড়ির গা ঘেঁষে চলে গেছে পাকা রাস্তা। নসিমন, মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতিতে চলাচলে সেই রাস্তায় হাঁটতে ভয় পায় সবাই। অকাল মৃত্যুর ফাঁদ মানুষকে গৃহবন্দি করে তুলছে। ফিটনেসবিহীন, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চলছেই, কেউ দেখার নেই। গরিবের দিন এনে দিন খাওয়ার উপার্জন আনে যে ভ্যান গাড়ি তা চুরি হলে থানায় কিংবা পরিষদে নালিশ বা উদ্ধার প্রার্থনাতেও পয়সা লাগে, পাছে প্রশাসন ও বাহিনী তার চৌদ্দগুষ্টি যাচাইয়ে নেমে বিব্রত করতে শুরু করবে।

অছিমদ্দীন ভাবেন পদে পদে এসব ঠেকা-বেঠেকায় পড়ার জন্য কি তারা স্বাধীন হয়েছেন। দিন দিন ভালো মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, পালিয়ে বেড়াচ্ছে। রাতের  চেয়ে ভোরবেলায় ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য বেড়ে যাচ্ছে। কে কাকে দেখবে? বিপুল উন্নয়ন দৈনন্দিন সুশাসন কেড়ে নিচ্ছে কি না, শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন নতুন সংস্কারের নামে পঙ্গু করে দিচ্ছে না তো জাতিকে? দেশের অদক্ষ শ্রমিক যাচ্ছে বিদেশে আর প্রতিবেশী দেশের শিক্ষিত ও দক্ষরা এসে এ দেশ থেকে রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে।  শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে স্মার্ট বাংলাদেশে। সাগর-রুনির চার্জশিট দিতে বিলম্বের কারণ খোঁজা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে সহযোদ্ধা সহকর্মীরা। সবখানে সংশয়, সন্দেহ, অধৈর্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কেনা-বেচা চলছে তো চলছে।                

জাপানের এক মন্দিরে ৩ বানরের মূর্তি আছে- একটি বানর মুখে আঙুল দিয়ে, এক বানর কানে আঙুল দিয়ে এবং অপর বানর চোখে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। বানর তিনটির একান্ত প্রতিজ্ঞা যে তারা খারাপ কিছু শুনবে না, খারাপ কিছু বলবে না এবং খারাপ কিছু দেখবে না। অছিমুদ্দীন কোরআন শরিফের সুরা বাকারার ৭ম আয়াতে পড়েছে (যারা গাফিল তারা ফিরবে না) আল্লাহ তাদের অন্তঃকরণ এবং তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন আর তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন।  আবার গাফিল বা কাফিরদের বলা হয়েছে ‘তারা বধির, মূক ও অন্ধ সুতরাং তারা ফিরে আসবে না’। (বাকারা, আয়াত/১৮)। অছিমুদ্দীন ভাবেন সত্যিই তো মুখের কথা কানে শোনা এবং চোখের দেখায় তারতম্য ঘটলে বিপদ নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশের জন্য। অছিমুদ্দীন প্রায়ই দেখেন নানান বিষয়-আশয়ে আচার-আচরণে চলনে-বলনে সবাই কেমন যেন খাপছাড়া ও সমন্বয়হীনতার উদাহরণ সৃষ্টি করেই চলেছেন।

অছিমুদ্দীন শুনেছেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নাকি বলা আছে কোনো বন্ধুদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট হতে পারে এমন কোনো মন্তব্য বা বক্তব্য দেওয়া যাবে না। অছিমুদ্দীন ভাবেন নিজেদের দুর্বলতা অন্যেরা জানুক এটা অন্যায়কারীরা চান না। লোকে কথা বললে তা মোকাবিলা করতে দোষারোপে ও দুর্বৃত্তপনাতেও কম যান না অনেকে। কারও মাজা ভেঙে দিয়ে তারপর বলা তার মাজা ভেঙে গিয়েছে। অছিমুদ্দীনের ছেলেবেলায় পড়া, মনে হয় বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় বা বনফুলের একটা গল্প দুই গ্রামের পন্ডিতের কে কেমন বুদ্ধিমান তার পরীক্ষা প্রতিযোগিতা হচ্ছে গ্রামবাসীর মধ্যে। দিনক্ষণ ঠিক করে সবাই দু গ্রামের মাঝখানে বটতলায় দুই পন্ডিতের পান্ডিত্যের পরীক্ষা/বির্তক সভার আয়োজন করেছে। এক পন্ডিত প্রশ্ন করলে অপর পন্ডিত জবাব দিতে পারলে সবাই ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আনন্দ হইচই করে। বিষয়টি অনেকটা টাইব্রেকারে গোল দেওয়া বা ঠেকানোর কসরতের মতো। তো এক পর্যায়ে এক পন্ডিত ‘I do not Know এর বাংলা কী হবে জানতে চাইলেন অপর পন্ডিত সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন ‘আমি জানি না’। আর যায় কোথায়, মূর্খ গ্রামবাসী হইচই করে উঠল পন্ডিত মহাশয় এটা জানেন না, তিনি নিজেই স্বীকার করলেন। কী আর বলা, সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য প-িত মহাশয়ের পরাজয় ঘোষিত হলো। কেউ আসল কথার ধারেকাছে গেল না। গলাবাজির সরগরমে সবার যুক্তি ও বুদ্ধি লোপ পেল। আপন আচরি ধর্মে আস্থাবান অছিমুদ্দীন ইদানীং দেখেন তার চারপাশে এভাবে বোকা বানানোর মহোৎসব চলছে।

লেখক: সাবেক সচিব এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত