বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির দরকার নেই

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ১০:৪৭ পিএম

অবশ্যই আমি ছাত্ররাজনীতির পক্ষে। ছাত্রজীবনে যেহেতু সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, সেই কারণে কোনোভাবেই ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে নই। কিন্তু এই মুহূর্তে দেশের উজ্জ্বলতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির নামে যা হচ্ছে, তাতে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি না থাকাই ভালো। কষ্ট হলেও এই বাস্তবতা স্বীকার করা ছাড়া, অন্য কোনো পথ নেই। এখন রাজনীতির খোলনলচে অনেক বদলে গেছে।

অস্বীকারের উপায় নেই, বাঙালির যত অর্জন তার সবই শুরু হয়েছে ছাত্ররাজনীতির হাত ধরে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়  (বুয়েট) এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সংগ্রাম এবং অর্জনের যে ইতিহাস, আমরা তার জন্য গৌরব বোধ করি। কিন্তু এখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেনো রাজনীতি চাচ্ছি না, তার পক্ষে যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতির যে আদর্শ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যে ধরনের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা গর্জে উঠেছিল, বর্তমানে কিন্তু সেই পরিস্থিতি নেই। এর বাইরে বিবেচনায় নিতে হবে, বুয়েটের শিক্ষাব্যবস্থা এবং ছাত্ররাজনীতির নামে যা হচ্ছে, সে বিষয়ে কথা বলা। চিন্তা করতে হবে  ছাত্ররা রাজনীতি করবে কোন বিষয়ে,  কেন করবে, কার জন্য করবে? এ বিষয়গুলো স্পষ্ট হলে মনে হয় কোনো বিতর্ক থাকবে না।

মনে হয় না, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি না হলে বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে। মনে রাখতে হবে, এখানে ‘ডিএসডব্লিউ’ (ডিরেক্টর অব ওয়েলফেয়ার অব স্টুডেন্ট) রয়েছে। এটিই সব সমস্যার সমাধান করে। এর মূল দায়িত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তার দায়িত্বই হচ্ছে, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সব ধরনের সমস্যার সমাধান করা। সুতরাং বুয়েটের ছাত্রছাত্রীদের যে কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য, প্রাতিষ্ঠানিক একটি ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে কোনো রাজনীতির দরকার নেই।

হ্যাঁ, জাতীয় রাজনীতির কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে যখন সমাধানের প্রশ্ন আসে, তখন একটা প্রশ্ন তৈরি হয় বটে। কিন্তু তারও একটা উত্তর রয়েছে। প্রথমে আমাকে ভাবতে হবে, নিজস্ব আঙিনার কথা। যেখানে আমি রাজনীতি করছি, যাদের জন্য করছি, যে বিষয়ে করছি এবং যে সময়ে করছি সেই নির্দিষ্ট জায়গায় আমার দায়বদ্ধতা কতটুকু? বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলে।

জাতীয় রাজনীতির লেজুরবৃত্তি করে, কখনই আমি আমার টার্গেট কমিউনিটিকে আশ্বস্ত করতে পারব না। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার না করতে পারলে, কোনোভাবেই সম্ভব নয় একজন ভিন্ন আদর্শের ছেলেমেয়ের সমস্যাকে নিজের বলে ভাবতে।

কখনোই শোনা যায়নি, ডিপার্টমেন্টে একজন ভালো শিক্ষকের জন্য কোনো ছাত্র সংগঠন আন্দোলন করেছে। লাইব্রেরির কোনো সংকট দেখা দিলে, সে বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে। অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ে কোনো রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিলে, ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণ জরুরি কিন্তু আমি যেখানে পড়াশোনা করছি, সেই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের বাইরে রেখে আমি কোনো আন্দোলনে যেতে পারি না। আবার করতে পারি না, রাজনীতির নামে কোনো ধরনের শক্তি প্রদর্শনও।

এই সবই যদি হয়, রাজনীতির নাম দিয়ে তাহলে বিষয়টা না থাকাই ভালো। ফলে নষ্ট রাজনীতির চেয়ে, রাজনীতি না থাকা অনেক ভালো।

শুধু বুয়েট না, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি ছাত্ররাজনীতির মূল আদর্শ বা স্পিরিটকে ধরে রাখা যায় তাহলে আমার কোনো প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু আমরা তো তা পারছি না। এর সঙ্গে কিন্তু আরেকটি কথা আছে, ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষকরাজনীতিও বন্ধ করা উচিত। পৃথিবীর কয়টা দেশ রয়েছে, যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি রয়েছে?

ছাত্ররাজনীতির মূল আদর্শ থেকে অনেক আগেই আমরা বের হয়ে এসেছি। অ্যাকাডেমিক বা ছাত্রছাত্রীদের দেখভাল করার বিষয়টা যদি মুখ্য না হয়, তাহলে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির কোনো দরকার নেই। আমি কোনোভাবেই ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে বলছি না। শুধু বুয়েটের চরিত্র বিশ্লেষণ এবং বাস্তবতার নিরিখে কথাগুলো বলছি।

তারা অবশ্যই দেশের কথা ভাববে, উন্নয়নের কথা ভাববে এবং সামষ্টিক অগ্রগতির কথা ভাববে। কিন্তু দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসব বিষয় ভাবলে, বিষয়টা সামষ্টিক অর্থে ছাত্রছাত্রীদের কোনো কল্যাণে আসবে না।

এই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনোভাবেই রাজনৈতিক অস্থিরতা কেউ কামনা করে না। মনে রাখতে হবে দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাই এখানে পড়াশোনা করতে আসেন। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে তাকে বুয়েটে পড়াশোনার সুযোগ পেতে হয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সবারই একটা স্বপ্ন থাকে। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার একটা স্থির পরিবেশ থাকে। নির্দিষ্ট সময়ে তাকে পড়াশোনা শেষ করে, কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়।

অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানও এখানে পড়াশোনা করেন, যারা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অনেক কষ্টে নিজেকে গড়ে তোলেন। জীবন সংগ্রামের সেই করুণ চিত্র কেবল তারাই জানেন, যারা এমন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এখানে ছাত্ররাজনীতির নামে কোনো সন্ত্রাসী, দখলদারিত্বের সুযোগ নেই। এখন কোনো পক্ষ যদি ছাত্ররাজনীতির নামে, কোনো ছাত্রকে এক্সপ্লয়েট করতে চায়, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।

আমি রাজনীতি করব, আমার প্রয়োজনে। সেই প্রয়োজনটা তৈরি হবে আমার বোধ, শিক্ষা থেকে। চিন্তার সঠিক স্ফুরণ তখনই হবে, যখন তা সমষ্টির কথা বলবে। কিন্তু প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি কি সেই কথা বলছে? যদি বলত, তাহলে বন্ধের কোনো প্রশ্ন আসত না।

সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকে, মোট ছাত্রছাত্রীর কত অংশ? দেখা যাবে, বড়জোর ১০-১২ ভাগ ছেলেমেয়ে এ বিষয়ে বেশ সক্রিয়। কেন সক্রিয় তা এই বিশ^বিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্রছাত্রী ভালোমতোই জানেন। সবচেয়ে বড় কথা, যে কারণে ছাত্ররাজনীতি এখানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে  তার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ  নেই কেন?

যদি সত্যিকার অর্থে এই রাজনীতি কল্যাণের জন্যই হতো, তাহলে কোনোভাবেই তা বন্ধ করা সম্ভব হতো না। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাই এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতেন। অথচ তা হয়নি। না হওয়াটাই প্রমাণ করে, এই মুহূর্তে প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির কোনো দরকার নেই।

চিরতরে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার কথা বলছি না। অবশ্যই এর দরকার রয়েছে।  কিন্তু যা দরকার তা হচ্ছে, ছাত্র নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সুবিধা-অসুবিধা নিজের বলে ভাবতে হবে। সামষ্টিক অর্থে যখন কেবলমাত্র শিক্ষার্থীদের কল্যাণেই এই রাজনীতি কথা বলবে তখনই এটি থাকতে পারে। না হলে নয়। প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ে বর্তমানে যে ধরনের সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ বিরাজ করছে, তা বিনষ্ট করার চক্রান্ত কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ছাত্ররাজনীতি যদি প্রয়োজনই হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরাই তার জন্য আন্দোলন করবে। বাইরে থেকে কোনো ধরনের চাপ বা অস্থির পরিবেশ তৈরি করা হলে, বুঝে নিতে হবে এর ভিন্ন কোনো অর্থ রয়েছে।

দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও, ছাত্রছাত্রীদের কলাণে রাজনীতি করা দরকার। আমার জানা নেই, অন্য বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে বুয়েটের মতোন ‘ডিএসডব্লিউ’ রয়েছে কি না? যদি না থাকে তাহলে তা ভিন্ন আলোচনা।

লেখক: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত