নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেই মুক্তি

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:১৪ এএম

জ্বালানি হলো সেসব পদার্থ, যাদের ভৌত বা রাসায়নিক গঠন বা অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে শক্তির নিঃসরণ ঘটে। আর যেসব জ্বালানিতে এই শক্তি-নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলো হলো ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি। আধুনিক যুগে উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে জালানির ভূমিকা অপরিহার্য। বর্তমানে জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগ পূরণ করে আসছে জীবাশ্ম জ্বালানি। এর মধ্যে প্রধান হলো পেট্রোলিয়াম, তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস। আমরাও এসব জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বেশির ভাগ নির্ভরশীল, তবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। এ জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। এই জীবাশ্ম-জ্বালানি নির্ভরতা এবং জ্বালানির আমদানি-নির্ভরতা দুটোই এখন আমাদের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে, ভবিষ্যতেও এই অবস্থা ভিন্ন হবে তা ভাবার কোনো কারণ নেই; জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনীতি-পরস্পর পরস্পরকে জটিল করে ফেলছে। 

বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বর্ধিত উন্নয়ন প্রচেষ্টার কারণে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলেছে। ফলে দিন দিন ভূমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এখন বাংলাদেশ এই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শিকার; আইপিসিসির (International Panel on Climate Change, IPCC) এক প্রাক্কলনে বলা হয়েছে যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রাক্কলিত ৫০ সেন্টিমিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে দেশের আনুমানিক ১১ শতাংশ ভূমি ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে এবং ১৮ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে যাবে। কাজেই এখন থেকেই বিকল্প জ্বালানির সংস্থান করা অতীব জরুরি এবং সেটা হতে হবে সাশ্রয়ী, সবুজ ও টেকসই পন্থায়। অন্যথায় শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো ধরিত্রীই বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি হলো এমন এক শক্তির উৎস, যা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুনঃপুন ব্যবহার করা যায় এবং তা কখনোই নিঃশেষ হয়ে যায় না। এগুলো হলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎসজাত শক্তি; সূর্যের আলো ও তাপ, বায়ুপ্রবাহ, জলপ্রবাহ, জৈবভর, ভূ-তাপ, সমুদ্র তরঙ্গ, সমুদ্র-তাপ, জোয়ারভাটা, আবর্জনা শক্তি, হাইড্রোজেন ফুয়েল প্রভৃতি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা হলো এর পুনঃব্যবহার যোগ্যতা; শক্তি উৎপাদনের জন্য বারবার অর্থ বিনিয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে না। তা ছাড়া এটা হলো পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানি; এতে পরিবেশদূষণ নেই বলেই চলে। বাংলাদেশ কয়েকটি সবুজ জ্বালানিতে অনেক দেশের চেয়ে বেশ সমৃদ্ধ বলে ধারণা করা হয়। এসব উৎস থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আহরণ করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও স্বয়ম্ভরতা নিশ্চিত করতে দেশে অনেক নীতি, পথ-নকশা, পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা ও প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। যেমন ১৯৯৭ সালে বেসরকারি খাতে অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি উৎপাদনে অর্থায়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ((IDCOL)। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সবুজ জ্বালানির প্রসার ঘটাতে ২০১২ সালে গঠন করা হয় টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (স্রেডা)। ২০১৫ সালে গঠন করা হয়েছে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিল। টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য ২০২১ সালে অনুমোদন করা হয় মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা ২০২২-৪১।

২০০৮ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে এ উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ২০১০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ৫ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ পূরণ করা।  এখন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ। অথচ এ সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উৎপাদন ক্ষমতার একটা বড় অংশ (৪৮ শতাংশ) অলস পড়ে রয়েছে এবং তার জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে (Institute for Energy Economics and Financial Analysis Report, dt. 28.07.2023, IEEFA)।  

এ অবস্থার কারণ সবুজ জ্বালানির প্রতি নীতিবিরুদ্ধ পশ্চাৎদেশ প্রদর্শন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি অন্ধ পক্ষপাতিত্ব গ্রহণ। জাইকার সহযোগিতায় ২০১৬ সালের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মহাপরিকল্পনায় উচ্চাকাক্সক্ষী প্রবৃদ্ধি অভিক্ষেপের ভিত্তিতে জ্বালানি চাহিদা প্রাক্কলন করায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই একপেশে অবস্থান গ্রহণ যৌক্তিকতা পায়। এখন আবার প্রণয়ন করা হচ্ছে সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ((Integrated Energy & Power Master Plan, IEPMP). এই পরিকল্পনায় কিছু ইতিবাচক দিক থাকলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপেক্ষিত এবং এলএনজি ও কয়লা আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়েছে। মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনায় মোট জ্বালানিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ ধরা হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও ২০২১ সালের জলবায়ু সম্মলনে একই কথার প্রতিধ্বনি করেন। কিন্তু আইইপিএমপি মতে, ২০৪০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির ৪০ শতাংশ হবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, আর ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ হবে মাত্র ১৭.১০ শতাংশ। এর অর্থ কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কারখানায় বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত থাকবে, শুধু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূষণ ক্লিন বা পরিচ্ছন্ন করা হবে। তা ছাড়া আগের পরিকল্পনার মতো এখানেও বিদ্যুৎ চাহিদার অভিক্ষেপ করা হয়েছে বাড়িয়ে; ২০৫০ সালে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯০ গিগাওয়াট। এভাবে অতিরঞ্জিত চাহিদার ভিত্তিতে হিসাব করা নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ফেলে রেখে আগের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি অংশের উৎপাদন ক্ষমতা গড়ে তোলা হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে এবং পরিবেশদূষণ আগ্রাসী হয়ে উঠবে। 

এ দেশে যেমন রয়েছে কোটি কোটি মানুষ, তেমনি তাদের থাকার জন্য রয়েছে লাখ লাখ বাড়িঘর। আবার প্রতিদিন মানুষ ও কলকারখানা হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন করে চলেছে। এসব বাড়িঘরের ছাদ থেকে সৌরবিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কলকারখানার ছাদ, নদী অববাহিকা ও অব্যবহৃত ভূমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। National Solar Energy Roadmap-2021-41 অনুযায়ী এসব সুবিধা ব্যবহার করে দেশে ২০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।  IEEFA-এর এক হিসাব মতে, বাংলাদেশ বর্তমান কাঠামতেই দিনের বেলায় প্রতিদিন ১,৭০০ থেকে ৩,৪০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, আর বায়ুশক্তি থেকেও পারে ২,৫০০ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান The National Renewable Energy Lab (NREL)-এর হিসাব অনুযায়ী এ দেশে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তার সদ্ব্যবহার করে ৩০,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এসব হিসাব ও প্রাক্কলন থেকে এটা স্পষ্ট যে, হাইড্রোজেন,  অ্যামোনিয়া ও সিসিএস (Carbon Capture & Storage)-)-এর মতো অতি উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর এবং আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল জ্বালানি ছাড়াও দেশে সাধারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তর সম্ভাবনা রয়েছে। সেগুলোরই আগে সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। গ্রিড ও অফ-গ্রিড ব্যবস্থাপনায় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সেগুলোকে শুধু সমৃদ্ধ ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা এটা যে শুধু গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনে, তাই না; এটা জ্বালানি নিরাপত্তাকেও সুসংহত করে। নবায়নযোগ্যতার কারণে একবার একটা স্থাপনা গড়ে উঠলে তা প্রতিস্থাপনের আগ পর্যন্ত প্রায় বিনা বিনিয়োগে দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ শক্তি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিকূল প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে বিশ্ব আজ নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে হাঁটছে। ২০২২ সালে বিশ্বে ২৯৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে যুক্ত হয়। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশই আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস থেকে। আগের বছর এই হার ছিল ৮১ শতাংশ। এ সময় একই উৎস থেকে চীন উৎপাদন করেছে ১৪১ গিগাওয়াট ও ভারত করেছে ১৫.৭ গিগাওয়াট। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে ২০২০-২২ সালে ভারতের ৪.২০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছে (আজকের পত্রিকা, অনলাইন ডেস্ক, ০২.৮.২০২৩)। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। ইতিমধ্যে তাদের উৎপাদনক্ষমতা ৬৪ গিগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। তাদের ২০২২ সালে গৃহীত বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের ৮৪ শতাংশই ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর (ডেইলি স্টার, ১৪.০৪.২০২৩)।

দেশে এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট চলছে। এ জন্য আমদানিতে চলছে নিয়ন্ত্রণ। দেশের আমদানি করা পণ্যের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো জীবাশ্ম জ্বালানি। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে এ পণ্যটির আমদানিও সীমিত হয়ে পড়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে; করতে হচ্ছে লোডশেডিং। এই অবস্থা থেকে টেকসই পদ্ধতিতে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর আস্থাশীল হয়ে তার উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। IEEFA-এর এপ্রিল ৫, ২০২৩ তারিখের এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, ২০৪১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে ২০২৪ সাল থেকে প্রতিবছর ১.৫৩ বিলিয়ন থেকে ১.৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার প্রয়োজন হবে। যদিও এর মধ্যে সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়। আপাতদৃষ্টিতে এই অঙ্ক অনেক স্ফীত বলে মনে হলেও এটা ২০২১-২২ সালের জ্বালানি খাতে প্রদত্ত ভর্তুকির চেয়ে কম। এক বছরের ভর্তুকির সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করে যদি বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপনা গড়ে তোলা যায়, তার চেয়ে আর কি ভালো হতে পারে?

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত