বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থন এখনো যথেষ্ট বেশি। পিওর জরিপে ৩৮টি দেশে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ লোক মনে করে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা যে আইন প্রণীত হয়, এমন ব্যবস্থা উত্তম। কিন্তু গণতন্ত্রের বিকল্প ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন আছে, এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়। প্রকৃত হুমকিটা হলো অপেক্ষাকৃত কম পরিণত বা অপরিণত গণতন্ত্রের বেলায়, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল এবং গণতান্ত্রিক অভ্যাসগুলো জনগণের মধ্যে তেমন গ্রথিত নয়। তারপরও পাশ্চাত্যে যা ঘটে, তা এসব দেশকেও প্রভাবিত করে। আমেরিকা একসময় পদানত মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আজ সেই আমেরিকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এমন এক ব্যক্তি বসে আছেন, যিনি অনুপ্রেরণা সৃষ্টি তো পরের কথা, বরং বিরাগেরই শুধু জন্ম দিতে পারেন। নবীন গণতন্ত্রকে চারপর্যায়ে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে ঘটে স্ট্যাটাসকো নিয়ে জনগণের সত্যিকারের অভিযোগ ও অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। তুরস্কের ধর্মপ্রাণ সংখ্যাগরিষ্ঠরা সেক্যুলার এলিট শ্রেণির দ্বারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলে মনে করে এবং সেই কারণে বর্তমান ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট। কয়েক দশক ধরে বিজয়কেতন উড়িয়ে চলার পর গণতন্ত্র কি এখন পিছু হটতে শুরু করেছে? প্রশ্ন উঠছে, এ জন্য যে, বেশ কিছু লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যা থেকে বলা যায় গণতন্ত্র আজ আর আগের অবস্থায় নেই। স্নœায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির আগে সামরিক শাসন ছিল বিশ্বরাজনীতিতে একটি অনিবার্য বাস্তবতা। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা অনেকটা কমে গেলেও তা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এখনো আফ্রো-এশিয়ার অনেক দেশেই সামরিক শাসনের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সামরিক বাহিনী কোনো কোনো দেশে প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও, পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। দুটো কারণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব স্নায়ুযুদ্ধকালীন অবস্থা থেকে দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
যুগে যুগে কর্র্তৃত্ববাদী শাসকের আবির্ভাব হয়েছে পৃথিবীতে এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, কর্র্তৃত্ববাদী শাসকের নির্মম পতনও প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। তা সত্ত্বেও কর্র্তৃত্ববাদী শাসকরা শিক্ষা নেননি কখনো। এমনকি নতুন নতুন অবাস্তব আদর্শ প্রচার করে এবং জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়ন নিশ্চিতের দোহাই দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সমকালীন বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে কর্র্তৃত্ববাদী শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে কর্র্তৃত্ববাদী শাসকরা রাষ্ট্র শাসন করে গেছেন বা বিদ্যমান বিশ্ব ব্যবস্থায়ও তেমন ধরনের শাসকরা জনগণের ওপর কর্র্তৃত্ববাদ চাপিয়ে দিয়ে দেশ শাসন করে চলেছেন।
জনগণ জেনে-বুঝেও শাসকের প্রতি এক প্রকারের আনুগত্য প্রকাশ করে বলে মনে করা হলেও, মূলত জনগণ ভয়ের মধ্যে থাকে বলেই শাসকের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না। কেননা শাসক তার প্রতি আনুগত্য আদায় করার জন্য জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ করে জনগণকে অত্যাচার-নির্যাতন ও জেল-জুলুমের ভয় দেখিয়ে ভিন্ন মত দমন করে শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্য আদায় করার জন্য সচেষ্ট থাকে।
কাগামির মতানুযায়ী, বিরোধী মতের লোকেরা শাসকের প্রতি টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করে না ওই ভয়ের কারণেই। পক্ষান্তরে কর্র্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত এক শাসন ব্যবস্থা। যেখানে মানুষের সব প্রকার মৌলিক অধিকারের ওপর এক ধরনের ঘোষিত এবং অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় বলে মানুষের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হয়ে পড়ে। সর্বদাই শাসকের গুণগান করা কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের এক মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। শাসকের বিরুদ্ধে যায়, এমন ধরনের সর্বপ্রকারের মত প্রকাশ ও প্রচারের অধিকার নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত থাকে বলে এ ধরনের শাসনাধীন সমাজকে ‘বদ্ধ সমাজ’ বলে অভিহিত করা হয়। বিশ শতকে গণতন্ত্রের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল বিশ্ব ব্যবস্থায়। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ছিল, উন্নয়ন মডেলের একটি মৌলিক উপাদান। এর মধ্যেই জনগণের প্রকৃত মৌলিক অধিকারের বিষয়টি খোঁজা হয়েছিল। তাই দেশে দেশে ছিল গণতন্ত্রের জয়জয়কার। তবে একুশ শতকের পৃথিবীতে গণতন্ত্রের বিপরীতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থাকে একটি উন্নয়ন মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’ এমন একটি প্রচারণা সামনে নিয়ে আসা হয়েছে
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয়। ফলে বিশ্বের দেশগুলোয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এবং পক্ষান্তরে কর্র্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার রাষ্ট্রের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং বদ্ধ সমাজ ব্যবস্থার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এসব দেশে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে একজন মাত্র শাসকের পদতলে নিয়ে এসে সব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ক্ষুদ্র একটি পরিবার ও চক্রী দলের হাতে কেন্দ্রীভূত করে গণতন্ত্রের কফিনের ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের মিনার। আর এখানে মানুষের সব অধিকার অস্বীকার করে শাসন ব্যবস্থার মিনারের চূড়ায় বসে থাকা শাসকের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে জনগণের ওপর। জনগণের সমর্থন আছে কি নেই, সে সম্পর্কে ভ্রুক্ষেপ করা হয় না।
কর্র্তৃত্ববাদী শাসনে দেশের সংবিধানকে এমনভাবে সাজানো হয়, যা একমাত্র শাসকের অনুকূল ক্ষেত্র সৃষ্টি করে মাত্র। সংবিধানের দোহাই দিয়ে শাসকরা রাষ্ট্রযন্ত্র এবং এর সব প্রতিষ্ঠানের ওপর অবাধ ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। অর্থাৎ শাসক নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন করার লক্ষ্যে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যবর্তী সব প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দিয়ে এর ওপর নিজের কর্র্তৃত্ব স্থাপন ও কায়েম করেন, যাতে বাধাহীনভাবে শাসকের আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। আধুনিককালের লোকরঞ্জনবাদী কর্র্তৃত্বপরায়ণ শাসকরা নিজেদের সাধারণত চার স্তরবিশিষ্ট পিরামিডের সর্বোচ্চ চূড়ায় স্থাপন করেন, যেখানে শাসকই হলেন একমাত্র পূজনীয়; রাষ্ট্রের সবকিছুই পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয় একমাত্র শাসকের কর্র্তৃত্বে। যেমন- সক্রিয়, অন্ধ অনুগত একদল সমর্থকগোষ্ঠী, বাহ্যত দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী জনগোষ্ঠী, সমর্থকগোষ্ঠী; যারা সত্যিকারভাবেই বিশ^াস করে শাসকের অধীনে দেশ ও জনগণের উন্নতি নিশ্চিত হয়েছে। এ ধরনের শাসনে এমন একদল লোকের উদ্ভব হয়, যারা শাসকের বদৌলতে সুবিধাপ্রাপ্ত ও সুবিধাভোগী এবং খুন, গুম, ভয়ভীতির কারণে একদল লোক শাসককে সমর্থন দিয়ে থাকে, শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
তুরস্কের অভ্যুত্থান থেকে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বেঁচে যাওয়ার পর রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের ভাটা পড়ে। প্রকৃত অর্থে পশ্চিমা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে কর্র্তৃত্ববাদী ঐক্যের সৃষ্টি হয়। ব্রেক্সিটের পর চীন সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র পিপলস ডেইলির মন্তব্য হচ্ছে, এটা পশ্চিমা গণতন্ত্রের মৌলিক ভুলের ফসল। দ্য গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, পশ্চিমের সন্ত্রাসী হামলাগুলো আসলে গণতন্ত্র ধসে পড়ার ইঙ্গিত। এ বিষয়ে রবার্ট কেগান লিখেছেন, মানবসভ্যতার শাসনের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক শাসনের চেয়ে কর্র্তৃত্বপরায়ণ শাসনের ইতিহাসই দীর্ঘ। বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ যদি বিবর্ণই হয়, তবে হয়তো পুরো বিশ্ব আর অভিন্ন সুরে গলা মেলাতে পারবে না। হয়তো এশিয়ার কিছু দেশ যে পথে এগোতে চাইবে, ইউরোপের দেশগুলো তাকে ভুল মনে করবে। অঞ্চলভেদে বদলে যাবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা। কোনো একক নীতিতে আর বিশ^বাসী তাল মেলাতে চাইছে না। তবে তা ভালো হবে, নাকি মন্দ হবে সময়ই তা বলে দেবে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
