৪৭৮ কোটি টাকা লোপাটের চেষ্টা

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২১, ০২:০২ এএম

আয়োজন ছিল ‘প্রকল্প ডাকাতি’র। প্রস্তুত করা হয়েছিল ভুয়া নথিপত্র। প্রকল্প এলাকার একেকটি নারিকেল গাছের মূল্য দেখানো হয়েছিল প্রায় কোটি টাকা। টিনশেড ঘরের ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছিল দুই কোটি টাকা। নিম্নমানের জমি (ডোবা বা পুকুর) উঁচুমানের (ভিটি বা ভরাট জমি) দেখিয়ে অধিগ্রহণ বাবদ ধরা হয়েছিল অবিশ্বাস্য মূল্য। এভাবেই রাজধানী ঢাকার আশপাশে ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প থেকে ৪৭৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সব আয়োজন সম্পূর্ণ করেছিল সরকারের একদল কর্মকর্তা।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার আলাদা দুটি তদন্তে দুর্নীতি পরিকল্পনার মহোৎসবের প্রমাণ মেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রভাবশালী শিক্ষা কর্মকর্তা দিল আফরোজ বিনতে আছিরসহ সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। আর দিল আফরোজ বিনতে আছির এই দুর্নীতি পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চিঠি পাওয়ার পর ১০ কর্মদিবসের মধ্যে দিল আফরোজকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। এর আগে সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া এই প্রকল্পের পরিচালক আমিরুল ইসলামকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও তদন্ত প্রতিবেদনে আলোচিত এই দুর্নীতি পরিকল্পনায় জড়িত হিসেবে সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাসহ আরও ২১ জনের নাম এসেছে। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।  

দিল আফরোজ বিনতে আছির মাউশির সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এবং ওই প্রকল্পের সদস্য সচিব। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার দুটি তদন্ত প্রতিবেদনই দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। এসব প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য এবং দেশ রূপান্তরের নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা যায়, দিল আফরোজ বিনতে আছির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্য। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার নিয়ম না থাকলেও দীর্ঘ ১৫ বছর মাউশির প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত দিল আফরোজ। তার নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে ভয়ংকর দুর্নীতির নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এর আগেও দিল আফরোজের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তার প্রমাণ  তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটি একনেকে পাস হয় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। বিদ্যালয়গুলো স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয় খিলক্ষেতের জোয়ার সাহারা, সাভারের নবীনগর, হেমায়েতপুর, আশুলিয়া, বাড্ডার সাঁতারকুল, ধামরাই, পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও চিটাগং রোড এলাকা। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য ২ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।

২০১৭ সালে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম। এরপর প্রকল্পের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ শুরু করেন। কিন্তু আরডিপিপিতে (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প) ৬৭.০১ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি দেখিয়ে ১ হাজার ১২৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার প্রস্তাব করায় বিপত্তি দেখা দেয়, যা খুবই অস্বাভাবিক মনে হয় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের কাছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যয় বৃদ্ধির ওই প্রস্তাবের সত্যতা যাচাইয়ে ২০২০ সালের শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মোমিনুর রশীদকে সভাপতি করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এছাড়া আলাদাভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। দুটি প্রতিবেদনেই প্রস্তাবিত ওই প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি পরিকল্পনার প্রমাণ তুলে ধরা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে, প্রস্তাবিত সাতটি বিদ্যালয়ের অধিগ্রহণের জন্য চূড়ান্ত করা জমি নাল (নিচু বা ডোবা জাতীয়) হলেও জমির শ্রেণি গোপন করে মূল্য নির্ধারণের সময় নাল, ডোবা, পুকুর শ্রেণির জমিকে ভিটে মাটি দেখিয়ে এবং অবকাঠামো ও গাছপালার মূল্য অবিশ্বাস্য পরিমাণ বাড়িয়ে সরকারি বিপুল অর্থ লোপাটের প্রক্রিয়া চলছিল। জোয়ার সাহারায় প্রস্তাবিত স্কুলের জন্য জমির প্রকৃত দাম ৪৭ কোটি ৭৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা। আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য হতে পারে সর্বোচ্চ ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। কিন্তু পিডি আমিরুল ইসলাম (ওএসডি) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় দুই একর জমির জন্য ৩৬৫ কোটি ৭৩ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকা মূল্য প্রস্তাব করেন। এছাড়া ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকার গাছপালার জন্য ৬০ কোটি টাকা মূল্য প্রস্তাব করেন। তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে শুধু এই ২ একর জমির জন্যই  সরকারের ক্ষতি হতো ৩১৭ কোটি ৯৯ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা। ওই জমিতে থাকা ১৫টি কড়ই গাছের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৪ কোটি টাকা করে। 

বাড্ডার সাঁতারকুল মৌজার ২ একর জমি ভূমি অফিসের পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ নাল শ্রেণির। এছাড়া অধিকাংশ জমির শ্রেণি ডোবা। যার প্রতি শতাংশের মৌজা দর ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৯২ টাকা। জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিন গুণ হিসাবে ২০০ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য ২৮ কোটি ৫২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হওয়ার কথা। গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য হবে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা। কিন্তু শুধু জমির দামই প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৬ কোটি ২ লাখ ৮৩ হাজার ২০০ টাকা। আর ১ লাখ টাকার গাছপালা ও অবকাঠামোর দাম প্রস্তাব করা হয় ৬ কোটি টাকা। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি হতো ৭ কোটি ৫১ লাখ ৮ হাজার টাকা।

সাভারের হেমায়েতপুর এলাকার বিলামালিয়া মৌজার ২ একর জমি ভূমি অফিসের পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ পুকুর শ্রেণির। এছাড়া জমিটির অধিকাংশ শ্রেণি নাল। সেখানে প্রতি শতাংশের মৌজা দর ৪ লাখ ১১ হাজার ১২ টাকা। সে হিসাবে দুইশ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য আসে ২৪ কোটি ৬৭ লাখ ৭ হাজার টাকা। আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য ১ লাখ টাকাই যথেষ্ট। অথচ পিডি আমিরুলের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট ২০০ শতাংশ জমির প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণ করে ৮১ কোটি ৮২ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮ টাকা। যার মধ্যে ২১টি নারিকেল গাছের দাম সর্বোচ্চ হওয়ার কথা ১ লাখ টাকা। কিন্তু এই নারিকেল গাছের দাম প্রস্তাব করা হয় ১৩ কোটি টাকা। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি হতো ৫৭ কোটি ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৮ টাকা।

এভাবে প্রতিটি প্রস্তাবিত বিদ্যালয়েরই জমির দাম হেরফের এবং গাছপালা, ঘরবাড়ি, বিবিধ স্টেশনারি, গাড়ি, আসবাবপত্র ও কম্পিউটার মেরামত ও গাড়ি ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়। যার মোট পরিমাণ ৪৭৮ কোটি ৬৮ লাখ লাখ ৯ হাজার ৭৪৭ টাকা। অস্বাভাবিকভাবে মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করেন সে সময়কার পিডি আমিরুল ইসলাম। আর পিডির এই অনৈতিক প্রস্তাব অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন মাউশির কর্মকর্তা দিল আফরোজ বিনতে আছির। গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেয়। এতে দুর্নীতির আয়োজনের বিষয়টি উঠে আসায় ২৯ সেপ্টেম্বর পিডি আমিরুল ইসলামকে ওএসডি করে মাউশিতে পাঠানো হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এতদিন দিল আফরোজের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মন্ত্রণালয়।

তবে সর্বশেষ গত ২ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা) মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় দিল আফরোজকে। এতে বলা হয়, ‘আপনি সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা। উক্ত প্রকল্পের সদস্য সচিব হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণের মূল্য তালিকা যাচাই-বাছাই করে সম্পূর্ণ দুরভিসন্ধিমূলকভাবে দুর্নীতির অভিপ্রায়ে মিথ্যা তথ্য সন্নিবেশ করে আরডিপিপি প্রস্তুতে সহায়তা করেছেন। এবং উক্ত অভিযোগসমূহ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। যেহেতু প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে আপনার এমন কার্যক্রম শৃঙ্খলা ও আচরণ পরিপন্থী। যা সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ২০১৮-এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর আওতায় আপনার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, এই চিঠি পাওয়ার পর ১০ কার্য দিবসের মধ্যে নিম্ন স্বাক্ষরকারীর (সচিব) নিকট লিখিতভাবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।’ দিল আফরোজ আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত কোনো শুনানি চান কিনা সেটিও জানতে চাওয়া হয় চিঠিতে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দিল আফরোজ বিনতে আছির গতকাল মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দাদের দুটি প্রতিবেদনই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের সমস্ত দায়দায়িত্ব জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন প্রকল্প কার্যালয়। দায়িত্বশীল কর্র্তৃপক্ষ হিসেবে প্রকল্পের দলিল প্রণয়ন এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় মাউশির সিল স্বাক্ষর রয়েছে। আরডিপিপি একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই কেবল বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়। সুতরাং অনেক প্রক্রিয়া বাকি ছিল।’

প্রকল্পের দুর্নীতি পরিকল্পনার সঙ্গে আরও অনেক বড় বড় রাঘববোয়াল জড়িত থাকলেও তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে বলেও দাবি করেন দিল আফরোজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত