আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে গত দুটি নির্বাচনের মতো সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন না। দেশে এখন পর্যন্ত ১১টি সাধারণ নির্বাচনের চারটি অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে। এই নির্বাচনগুলো ছিল শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। এ কারণে সরকারের পদত্যাগকেই চূড়ান্ত বা এক দফা দাবি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব বিষয় গতকাল শনিবার ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপির প্রত্যাশা, ইইউ বরাবরের মতো দেশের জনগণের পক্ষে অবস্থান নেবে। একই সঙ্গে দলটি বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম-খুন, একাদশ নির্বাচনে অনিয়ম, সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে হামলা ও মামলার নানা প্রামাণ্য তথ্য-উপাত্ত ইইউ প্রতিনিধিদলের হাতে তুলে দিয়েছে।
বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দাতাদের কিছু কোয়ারি (তথ্য) ছিল, আমরা তা জানিয়েছি। তাদের বলেছি, একটি গণতান্ত্রিক দেশে একটি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪০ লাখ মামলা দেওয়া হয়েছে। এদের সঙ্গে আপস? এদের অধীনে নির্বাচন? আমাদের সামনে কোনো পথ নেই। তাই জাতির অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা স্বার্থে সব মানুষের একটাই দাবি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তাদের দাবি আদায়ের জন্য আমরা এ সরকারের পদত্যাগের জন্য এক দফার ঘোষণা দিয়েছি।’ ইইউ সংলাপের বিষয়ে কিছু বলেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংলাপের বিষয়ে তারা কিছু আমাদের কাছে জানতে চাননি। তারা নির্বাচন সুষ্ঠু করার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তা ছাড়া বিএনপি বরাবরই বলে আসছে সরকারের সঙ্গে আমাদের আলোচনা তখনই হবে যখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মেনে নেবেন। এর বাইরে সংলাপের প্রশ্নই আসে না। সরকার গতবারের মতো নির্বাচন করতে কিছু রাজনৈতিক দলকে মাঠে নামিয়েছে সংলাপের বিষয়ে কথা বলতে। বিচার মানি তালগাছ আমার এমন সংলাপে আমরা যাব না।’
গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। ইইউ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলটির প্রধান রিকার্ডো চেলারি। বৈঠকে বিএনপির পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ও মানবাধিকার-বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান।
সূত্রগুলো বলছে, মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিএনপির আলোচনা হয়েছে। বিষয়গুলো হচ্ছে আগামী নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর বাস্তবতা, উপকারিতা ও সুপারিশ। দ্বিতীয়ত, এ দেশের নির্বাচন এত বেশি প্রশ্নবিদ্ধ কেন এবং বাংলাদেশের নির্বাচন আদৌ জনগণের ভোটের মাধ্যমে সম্ভব হবে কি না। তৃতীয়ত, বর্তমান বাস্তবতায় আগামীতে দেশের অবস্থা কী হতে পারে। এরই প্রেক্ষাপটে আপনাদের সুপারিশ কী?
জবাবে বিএনপি নেতারা বলেছেন, দেশে এখন পর্যন্ত ১১টি সাধারণ নির্বাচনের চারটি অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে। এই নির্বাচনগুলো ছিল শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাতটি নির্বাচনই ছিল কলঙ্কিত ও প্রহসনমূলক। এর মধ্যে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে সংযোজিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে বাতিল করে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সর্বদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’ হয়েছিল। গণভোটের আয়োজন না করেই ২০১১ সালে তাড়াহুড়ো করে তা বাতিল করে সরকার। সংসদীয় কমিটির সর্বসম্মত মতামতকেও উপেক্ষা করে। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক অচলায়তন ও সংকটের প্রধান কারণ।
এ দেশের নির্বাচন এত বেশি প্রশ্নবিদ্ধ, নির্বাচন আদৌ জনগণের ভোটের মাধ্যমে সম্ভব হবে কি না এমন বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি নেতারা বলেছেন, এক ব্যক্তি, পরিবার ও দলের স্বৈরাচারী শাসন অব্যাহত থাকলে নিরপেক্ষতা ও গ্রহণ জাতীয় নির্বাচন হবে না। এসব কারণে ইইউ যদি পর্যবেক্ষণ পাঠায় তাহলে কোনো সুফল দেশবাসী পাবে না। বরং আবারও সেটা একটা অবৈধ ও অনির্বাচিত সরকারকে অন্যায্য বৈধতা দেওয়ার পথ পরিষ্কার করবে বলেও বৈঠকে বিএনপি নেতারা প্রতিনিধিদলকে জানান।
চলতি বছরের ১৯ মে থেকে গতকাল পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত জনসমাবেশকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ৩০০ মামলা, এক হাজার গ্রেপ্তার ও প্রায় ১০ হাজার ৩০০ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে তথ্যে তুলে ধরা হয়।
আলোচনার একপর্যায়ে বিএনপির সমাবেশ থেকে এক দফার ঘোষণা, দলটি ঘোষিত ৩১ দফার রূপরেখাসহ বেশ কিছু বিষয়ে জানতে চেয়েছিল ইইউ প্রতিনিধিদল। জবাবে বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন তথ্য তাদের দেওয়া হয়। এ সময় নেতারা বলেন, তাদের বার্তা পরিষ্কার। এ সরকারের ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই। তারা সমস্যার তৈরি করেছে, সমস্যার সমাধান না করলে তাদের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।
দলটির সম্পাদক পর্যায়ের এক নেতা বলেন, মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে আলোচনা হয়েছে। এর আগে সকালে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রতি সারা বিশ্বের নজর। প্রশ্ন হচ্ছে কেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখানে এসে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের মতামত দিতে হচ্ছে? দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশে তো তাদের যেতে হচ্ছে না। কেন বাংলাদেশে আসতে হচ্ছে। সবার মনে যে প্রশ্ন, ওদের মনেও নিশ্চয়ই একই প্রশ্ন। বর্তমান সরকারের অধীনে যে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ, গ্রহণযোগ্য নয়, এই ভিত্তির ওপরই কিন্তু সারা বিশ্ব বাংলাদেশের ওপর নজর রাখছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তারা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এ ব্যাকগ্রাউন্ডেই তারা বাংলাদেশে আসছেন।
তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে আমরা সব সময় বলে আসছি, বাংলাদেশের জনগণ যেটা বলছে, বিশ্ববিবেক যেটা বলছে, এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, সম্ভব না। মূল কারণগুলো হচ্ছে এদের অধীনে নির্বাচন হবে না। কারণ নির্বাচনের দিন তো দূরে থাক। ভোট চুরি তো এখনই চলছে। এই যে ডিসি পোস্টিং হচ্ছে, পুলিশের পোস্টিং হচ্ছে, বিএনপি নেতাদের গ্রেপ্তার চলছে, দু-তিন দিনের মধ্যে যে আক্রমণ চলছে, যুবদল নেতার হাত কেটে ফেলছে, বিএনপির জনসভায় বাধা দিচ্ছে, গতকালের পদযাত্রায় আক্রমণ করেছে। এটা তো অব্যাহতভাবে চলছে।
তিনি বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিচার করে তাড়াতাড়ি সাজার ব্যবস্থা করছে, তারা যাতে নির্বাচন করতে না পারে। এসব কাজ তারা প্রতিদিন করছে ভোট চুরির জন্য। কারণ তারা নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে জোর করে আবার ক্ষমতায় আসতে চায়। স্বাভাবিকভাবে এ কথাগুলো আজকের আলোচনায় এসেছে। শেষ কথা হচ্ছে, এই সরকারের অধীনে দেশের মানুষ তাদের ভোট প্রয়োগ করতে পারবে না। জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষণ পাঠাবে কী পাঠাবে না, এটা তাদের সিদ্ধান্ত। কথা হচ্ছে, নির্বাচন তো হতে হবে। পর্যবেক্ষক আসার প্রশ্ন তখনই আসে, যখন একটি নির্বাচন হয়। এ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণ, গণতান্ত্রিক বিশ্ব বিশ্বাস করে না, জনগণ বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেছে। আগামীতেও বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এই প্রেক্ষাপটে তারা যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটা তাদের ব্যাপার। তারা এখানে আসার উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার করছে যে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হয়নি। নির্বাচন যদি হতো তাহলে কই তারা তো নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া কোথাও যাচ্ছে না। কেন বাংলাদেশে আসছে, সেটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। বাংলাদেশে যে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, সেটির লক্ষণ প্রতিদিনই আমরা দেখছি। জেল, মিথ্যা মামলা, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগকে ব্যবহার করা প্রতিনিয়ত চলছে।
মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর নিয়ে বিএনপির মূল্যায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা একটা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশীদারত্বমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। এখান থেকে আপনারা ধরে নেন বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের কী ধারণা এবং তারা কী চায় বাংলাদেশে। কূটনৈতিক ভাষায় এর চেয়ে বেশি কিছু বলার আছে?
সংলাপ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। এখানে মানবাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ, আইনের শাসন, জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। যেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই, লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, সংলাপের জন্য তো একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ লাগে। সংলাপ গণতান্ত্রিক পরিবেশের একটি অংশ। বাংলাদেশে যেখানে কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। যেখানে গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক অধিকার নেই। সেই পরিবেশটা প্রথমে তৈরি করতে হবে। তারপরই সংলাপের প্রশ্ন আসছে।