রাজনীতিতে আবার আগুন

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৩, ০২:৫৪ এএম

সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনড় অবস্থান শেষ পর্যন্ত সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে। সংঘর্ষের পাশাপাশি আগুন দেওয়ার ঘটনায় আবার জনসাধারণের মধ্যে পুরনো সেই অগ্নিসন্ত্রাসের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

গত শনিবার বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও বাস পোড়ানোর ঘটনা ঘটে। হঠাৎ করে মাতুয়াইল-আশুলিয়াসহ কয়েকটি স্থানে কয়েকটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। তবে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই পক্ষই পরস্পরকে দোষারোপ করেছে।

আগুনভীতি নিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের কর্মসূচি দমনে কঠোর হতে পারে। বিএনপি সামনে পাল্টা শক্ত অবস্থান নিতে চেষ্টা করবে। ফলে দুই পক্ষ আগুন সন্ত্রাসের পক্ষে না থাকলেও তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নেওয়া চেষ্টা করবে। আর যদি সেটি হয়, তাহলে শনিবারের সংঘাত ও বাস পোড়ানোর ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য ভালো ইঙ্গিত বহন করবে না। সে কারণে বাসে আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

২০১৩-১৪ সালে বিএনপির নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলনে সারা দেশে অগ্নিসংযোগ-পেট্রোলবোমায় প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটেছে। অনেকে আগুনে পুড়ে ঝলসে যাওয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে।

আওয়ামী লীগ বলছে, নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে আগুন সন্ত্রাস চালাতে বিএনপি একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে চলেছে। জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব পালনে দলটি শান্তি সমাবেশ নিয়ে মাঠে থাকে। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগুন সন্ত্রাস সৃষ্টি করে আন্দোলন সফল করা যাবে না। মানুষকে জিম্মি করে, ভয়ভীতি সৃষ্টি করে রাজনীতির ফল কখনো ভালো হয় না। শেখ হাসিনা সহনশীলতা পছন্দ করেন, তার মানে দুর্বলতা নয়।’

বিএনপি বলছে, দায় চাপানো আওয়ামী লীগের পুরনো রীতি ও পদ্ধতি। শনিবারের ঘটনা হাস্যকর কৌতুকে পরিণত হয়েছে বলেও দলটির নেতারা মনে করেন।

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আবার আগুনের ঘটনা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ কাউকে দোষ না দিয়ে কারা আগুন সন্ত্রাস চালাতে চায়, তাদের চিহ্নিত করা সবারই দায়িত্ব। রাজনীতিতে ২০১৩-১৪ মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ভয়াবহ ক্ষতি হবে। এটি স্মরণ রেখে সবাইকে রাজনীতি করা উচিত।’

২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে যেভাবে বাসে আগুন দিয়ে নাশকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, ঠিক সেই স্টাইলেই রাজধানীতে তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গানপাউডার, কেরোসিন তেল বা পেট্রোল ব্যবহার করে হয়েছিল। শনিবার বাসে আগুন দেওয়ার ধরনও ছিল আগের মতো। ব্যবহার করা হয়েছিল কেরোসিনের মতো দাহ্য বস্তু।

ঈদুল আজহার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকা- ছিল সভা-সমাবেশমুখী। এসব কর্মসূচিতে প্রতিপক্ষের চেয়ে বিপুল লোকসমাগমের প্রতিযোগিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। শান্তিপূর্ণ এসব কর্মসূচির কারণে জনমনে কিছুটা স্বস্তি ছিল। শনিবার রাজধানীর প্রবেশমুখে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচির ঘটনায় তাদের সেই স্বস্তিবোধ আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। ওই কর্মসূচি ঘিরে বিএনপি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এসেছিল। ফলে কর্মসূচি যে শান্তিপূর্ণ হবে না তা বোঝা যাচ্ছিল। অবস্থান কর্মসূচির স্থানগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীদের দখলে ছিল। কিছু জায়গায় বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ করতে দেখা গেলেও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাতুয়াইল ও শ্যামলীতে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ও ভাঙচুরের ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে খবর বেরিয়েছে, পুলিশের সামনেই এসব ঘটনা ঘটিয়ে ভিডিও করে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে চলে গেছে। কারা এটা করতে পারে তা অনুমানের জন্য বেশি বুদ্ধিমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজেরা অপরাধ করে বিএনপির ওপর দোষ চাপানোর অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিচ্ছি।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘পুলিশ যেখানে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা বাস পোড়াবে, এটা কেউ বিশ্বাস করবে না। পাগলেও না। বরাবরই তারা (আওয়ামী লীগ) নিজেরা এসব কাজ করে দায় চাপায় বিএনপির ওপর। কারা জ্বালাও-পোড়াও করে, ২০১৩-১৪ সালে আপনারা প্রমাণ পেয়েছেন। শনিবারে বাসে আগুনের ঘটনায় স্বয়ং বাসচালক বলছেন, মাত্র ১০ গজ দূরে ছিল পুলিশ।’

বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কর্মসূচির স্থান ছিল পুরান ঢাকার নয়াবাজার, যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া, গাবতলী, আবদুল্লাপুর ও চিটাগাং রোডে মুক্তি সরণি। মহাসমাবেশ থেকে এ অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। কর্মসূচির আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে করে স্থান পর্যন্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। সারা দেশ থেকে সরকারই ওইদিন বাস বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিল মালিকদের। রাজধানী কেন, এর আশপাশেও বাস চলতে দেয়নি সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যে বাসগুলোতে আগুন দেওয়া হলো, সেগুলো এলো কোথা থেকে? পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা পুরো এলাকায় অবস্থান নিয়ে রেখেছিল। তাদের ছত্রছায়া ছাড়া এ কাজ কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তারা।

দলটির দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, বিএনপির অবস্থান কর্মসূচি ছিল অনেকটা টেস্ট কেসের মতো। বিএনপি দেখতে চেয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীনরা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করে। এর মধ্য দিয়ে দলটি দুটি বিষয় পরিষ্কার হতে চেয়েছিল। প্রথমত, ভিসানীতি ও সর্বশেষ জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচন চেয়ে মার্কিন ছয় কংগ্রেসম্যানের চিঠির পর রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা-সমাবেশের বিষয়ে সরকারের উদারনীতি বজায় থাকবে, নাকি তারা পুরনো চেহারায় ফিরে যাবে। দ্বিতীয়ত, কর্মসূচিতে হামলা বা বাধা এলে সেটি কোন পর্যায় গিয়ে ঠেকতে পারে। এ ছাড়া এই কর্মসূচির পর যে অবস্থা তৈরি হবে, সেটি বিদেশিদের কাছে তুলে ধরে আবারও এ সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না সেটি জোরালোভাবে তুলে ধরা। এ পরিস্থিতিতে জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো বিষয় চিন্তার মধ্যেও ছিল না।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শনিবার আওয়ামী লীগ যা করেছে তা এক বাসচালকের কথাতেই সব ফাঁস হয়ে গেছে। বাসচালক বলেছেন, যে গাড়ি পোড়ানো হয়েছে তার এই পাশে-ওই পাশে পুলিশ ছিল। বিরোধী দলের কোনো মিছিল ছিল না। ওই এলাকাতেই শুক্র ও শনিবার মোটরসাইকেলে মহড়া দিয়েছে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা।’ তিনি বলেন, ‘এটা তাদের (আওয়ামী লীগ) বলা উচিত ছিল, দুষ্কৃতকারীরা করেছে আমরা খুঁজে বের করব। বিরোধী দলের ওপর না চাপিয়ে এ বক্তব্য দিলে বরং আরও বাস্তবসম্মত হতো।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনটি বাসে আগুন দেওয়ার বিষয়টি আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করি। কারণ ২০১৩-১৪ সালের মতো করে এটি আবার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে বলে মনে হয় না। এটা কারা ঘটিয়েছে, এটা বের হয়ে যাবে। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এসব ঘটনা ঘটিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে দুই দল যদি আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সংকট সমাধানে এগিয়ে না আসে, তাহলে রাজনীতিতে সংঘাত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।’

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, ‘সংঘাত ও বাস পোড়ানোর ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য ভালো ইঙ্গিত বহন করে না। সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সুষ্ঠু পরিবেশের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটি নতুন করে আলোচনায় আসবে। আবার বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বাদ দিয়ে সংঘাতে জড়াল, সেটি নিশ্চয়ই সব স্টেকহোল্ডার ভালোভাবে নেবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত