ভোলাতে চেয়েও যায়নি ভোলানো

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩, ০৩:০২ এএম

একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার খোকা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। নিজের একটি ভূখণ্ড, বিশ্ব মানচিত্রে খচিত একটি দেশ; বাংলাদেশ বিনির্মাণে কত কিছুই না তার করা। শুধু করাই নয়, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালির আজন্মলালিত স্বপ্ন-স্বাধীনতাও এনে দিয়েছেন। কিন্তু সেই স্বাধীন দেশে তার থাকা হলো কই!

দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল এই বাংলাদেশে মাত্র থাকতে পেরেছেন সাড়ে তিন বছর। অথচ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান কারাগারে থেকেছেন তার চেয়েও বেশি সময়। অকৃতজ্ঞ কিছু বাঙালি, হায়েনার দল তাকে বেঁচে থাকতে দেয়নি। গড়ে তুলতে দেয়নি স্বনির্ভর বাংলাদেশ। স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার পর দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন কিন্তু সফল করে যেতে পারেননি অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারা মহানায়ক। তার আগেই স্বপ্নের বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে তাকে। আমরা কেউই তাকে রক্ষা করতে পারিনি।

বলছি টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে পরে জাতির জনক হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে সপরিবারে যাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। শুধু কী তাই? তার হত্যার বিচার করা যাবে না তাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে তারই স্বপ্নের বাংলাদেশে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হত্যার পর তাকে ভুলে যাওয়ার নানা চক্রান্ত-অপচেষ্টা করা হয়েছে তারই বিনির্মাণ করা বাংলাদেশে। খুনি মোশতাক চক্র শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যাই করেনি, ক্ষমতায় আসা শাসকরা তার অশরীরী উপস্থিতিরও মৃত্যু ঘটাতে সব চেষ্টা করেছে। তবে কোনো চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে পারেনি ইতিহাসের পাতা থেকে। মুক্তিযুদ্ধে যেমন তারই ডাকে ঘরবাড়ি, মা-বাবা ও সংসার ছেড়ে নানা বয়সের মানুষ অংশ নিয়েছে, ঠিক তেমনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরে কিছু সূর্যসন্তান তাকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে ধরে রাখা হয়েছে শিল্প-সাহিত্য, গদ্য-পদ্যে।

আজ ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ৪৮তম শাহাদাতবার্ষিকীতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভোলানোর ষড়যন্ত্র ও স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তাকে ধরে রাখার যে সংগ্রাম করেছেন, তার বর্ণনা করেছেন দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের কাছে। তারা বলেছেন, একদিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভোলানোর অপচেষ্টা, অন্যদিকে অকৃত্রিম ভালোবাসা-আবেগে ভাস্বর হয়ে থেকেছেন বাঙালির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। কাজটি অনেক জটিল হলেও থেমে থাকেননি তারা। বঙ্গবন্ধুকে ধরে রাখতে নানা প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা কিশোর-যুবক বয়সী ভক্তরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামরিক শাসকদের চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র কোনো কিছুই টুঙ্গিপাড়ার খোকাকে মানসপট থেকে উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। বরং বঙ্গবন্ধুর অশরীরী উপস্থিতি সাহস জুগিয়েছে কলেজপড়ুয়া ছাত্রদের অন্তরে। তাদের ছোট প্রচেষ্টাগুলো একসময়ে বড় আরও বড় করে উপস্থিতি ঘটিয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। এর জন্য সময় হয়তো লেগেছে, তবে বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর-যুবকরাই সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করেছে। 

বঙ্গবন্ধু যে বছর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় পাস করে কলেজে ভর্তি হন মিনার মনসুর। এখন কবি হিসেবে সুপরিচিত। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী প্রতিবাদী সাহিত্যধারার পুরোধা-ব্যক্তিত্ব কবি মিনার বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চক্রান্ত সফল হওয়ার পর তাকে মানুষের মন থেকে ভুলিয়ে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রযন্ত্র। তবে সারা দেশের আনাচে-কানাচে কিছু তরুণ প্রতি মুহূর্তে চেষ্টা করেছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করে বেঁচে থাকতে।

তিনি বলেন, ১৯৭৬ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি, সম্ভবত প্রথম বঙ্গবন্ধুর নামে সেøাগান দেওয়া হয়। ওইদিন সিদ্ধান্ত নিলাম প্রভাতফেরি করে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার যাব। আমরা সাতজন। ফুল কেনার পয়সা ছিল না। ফুলের দোকানও তখন ছিল না। নিজের বাসাবাড়ির আঙিনায় বাগান থেকে ফুল নিয়ে প্রভাতফেরিতে যাই। শহীদ মিনারে আমরা ফুল দিই। সুজন ভাই (খোরশেদ আলম সুজন) হঠাৎ করে এসে জোরালো গলায় বক্তৃতা দিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুর রক্ত বৃথা যেতে দেব না। এরপরই সবাই পালিয়ে যায়, আমরা স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভেতরে মিশে যাই।

প্রেম ও দ্রোহের কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত এ কবি বলেন, ১৯৭৬ সালে গোপনে চট্টগ্রামের মেজবান (কাঙালিভোজ), কোরআন খতম আয়োজন করি (১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের পশ্চিম বাকলিয়া)। ওই মেজবানে একজন ব্যাংকার ছিলেন, জয়নাল আবেদিন। তিনি আমাদের এসে বললেন, আমি একটা গরু কিনে দেব। কিন্তু কেউ জানবে না। আমার নামটা গোপন রাখবে তোমরা। চাকতাই আওয়ামী লীগ সভাপতি ছিলেন আবদুল গাফফার খান, তিনি চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ছিলেন। তিনি বললেন, আমি এক বস্তা চাল দেব। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন শুরু হলো। কোরআন খতম চলছে, ফজরের নামাজ শেষে আলো ফুটতে ফুটতে পুলিশ এলো। জানতে চাইল কী হচ্ছে আমরা বললাম, কিছু না। দাঁড়িয়ে থাকল পুলিশ। এরপর আর্মির গাড়ি এসে দাঁড়াল। জানতে চাইল এ আয়োজনের নেতা কে? আমরা বললাম, নেতা কেউ নেই। আমরাই নেতা। এরপর আর্মির সদস্যরা আয়োজনের শামিয়ানা ও টেবিল-চেয়ার ভেঙে দিল। তিন ডেগ তৈরি খাবার। এক ডেগ পাশের ডোবার ভেতর ফেলে দিল। এক ডেগ পুলিশ নিয়ে গেল, আরেক ডেগ আমরা কোনোভাবে রক্ষা করতে পারলাম। কিন্তু আমরা দমে যাইনি। বিকেলে সেখানেই স্মরণসভা করলাম। সেখানে অনেক ছাত্রলীগ নেতা উপস্থিত হলো। সুজন ভাইসহ অনেকেই বক্তব্য রাখল। তারা আমাদের অভয় দিল।

মিনার মনসুরের দাবি, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ভয় কেটে গেল। ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে একটি স্মরণিকা, ১৯৭৮ সালে তৃতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে ‘এপিটাফ’ প্রকাশ করেন তারা। ১৯৭৯ সালে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকীতে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ মানের স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। ১৯৮০ সালে ‘আবার যুদ্ধে যাবো’ শিরোনামে একটি বিশেষ বুলেটিনও প্রকাশ করেন তারা। তাতে পঁচাত্তরের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশের বিশিষ্ট মানুষের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়।

মিনার মনসুর বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঠিকই করেছি, অস্ত্র দিয়ে নয়, কলম দিয়ে।

তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর চট্টগ্রামের বাসার সামনে লম্বা দাড়িওয়ালা এক বিহারি মূল গেটে (টিনের) সজোরে লাথি মারছে! আমরা দুই ভাই এগিয়ে এসে দেখি দাড়িওয়ালা ওই বিহারি লোকটা বড় তলোয়ার হাতে বলছে, তোদের বাবাকে মেরে ফেলেছি, বেরিয়ে আয় তোদেরও মারব। মূল গেটে এটা দেখে আমরা ভেতরের রুমে যাই। লোহার রড নিয়ে ঘুমাতাম। দুই ভাই রড নিয়ে বেরিয়ে এসে আর দেখিনি তাকে। এরপর দুই ভাই রেডিও নিয়ে বসি। খুনি ডালিমের ঘোষণা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে।

মিনার মনসুর বলেন, এরপর ভেবেছি আরেকটি যুদ্ধ হবে। সূর্য ওঠার প্রস্তুতির অপেক্ষায়। ভেতরে বেশ আবেশ! বয়সে ছোট বলে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারিনি, আছে সেই আক্ষেপও। তাতে কী, মুজিব হত্যার বদলা নিতে এ যুদ্ধে তো অংশ নেব।

তিনি বলেন, সূর্য উঠতেই দুই ভাই দুদিকে চলে যাই। ধরে নিয়েছি যুদ্ধ হবে। অবাক হয়েছি, কোথাও কোনো প্রতিবাদ দেখিনি। দু-একটি আর্মির গাড়ি রাস্তায় ঘোরাফেরা করছে। তা দেখে ঘরে ফিরে আসি। ঘরে বঙ্গবন্ধুর একটি সুন্দর ছবি ছিল। তার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছি। ভেতরে সবার যুদ্ধের প্রস্তুতি ছিল, নেতৃত্ব ছিল না। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সবাই ভড়কে গিয়েছিল। অনেকেই ভোল পাল্টেছে। বড় অংশ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছে।

অবরুদ্ধ মানচিত্র গ্রন্থের এই লেখক বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে ধরে রাখতে লিফলেট করেছি, সুজন ভাই লিফলেট বের করেছিলেন। রমজান মাস ছিল। মসজিদে, বাসস্ট্যান্ডে ওই লিফলেট ছড়িয়ে দিতাম। ওই লিফলেট সবাই হাতে নিত, দেখেছি। কিন্তু ভড়কে যাওয়া মানুষ প্রতিবাদের সাহস দেখাতে পারেনি। একটার পর একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।

তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে ফিরলে আগের চেয়ে বড় পরিসরে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ অনুষ্ঠান হয়। তত দিনে স্বৈরশাসকরা দুর্বল হতে শুরু করেছে।

বাঙালি জাতির মানসপটে বঙ্গবন্ধুকে ধরে রাখতে আরেক সংগ্রামী কিশোর তুষার দাশ। ১৯৭৫ সালের কলেজপড়ুয়া ওই কিশোর এখন কবি তুষার দাশ। টুঙ্গিপাড়ার খোকার হত্যাকাণ্ডে ব্যক্তিগতভাবে মুষড়ে পড়া এ কবি বলেন, বঙ্গবন্ধু ঘোরবিরোধীদেরও মনে রাখতে হবে তাকে ভুলে থাকা সম্ভব নয়। আমরা সে সত্যটি বুকে ধারণ করেই চলেছি। আমাদের মনে রাখতে হবে, তার অনুপস্থিতিতে, হুকুমে এ বাঙালি ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। তাই লেখালেখিতে ধারণ করেছি আমার দ্বিতীয় পিতা বঙ্গবন্ধুকে।

তিনি বলেন, আমি সহজ করে বলি, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কলঙ্কজনক অধ্যায় আমাকে মুষড়ে দিয়েছে। আরও মুষড়ে দিয়েছে যাদের ষড়যন্ত্র-চকান্তে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে কর্মকাণ্ডে। খুনি মোশতাক, স্বৈরশাসক জিয়ার শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে ভুলিয়ে দিতে।

বিশুদ্ধতার প্রতীক এ কবি বলেন, লেখক, বুদ্ধিজীবী, কবি-সাহিত্যিকরা লেখালেখির মধ্য দিয়ে, আবেগ-অনুভূতি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে রেখেছেন বাংলাদেশে। তা ছাড়া তৎকালীন শাসকরা বঙ্গবন্ধুর অশরীরী উপস্থিতিরও মৃত্যু ঘটাতে চেয়েছেন। তবে এগিয়ে এসেছে কিশোর-যুবকসমাজ। কবিতায় তাকে এনেছেন, প্রবন্ধে তাকে এনেছেন, গল্পেও তাকে এনেছেন। কারণ, তারাই পারে, লেখালেখি যারা করে তাদের আবেগ থাকে।

বঙ্গবন্ধুকে তিনি দ্বিতীয় পিতা হিসেবে জানেন দাবি করে এ লেখক বলেন, শ্মশানে যাওয়ার আগেও এটাই মেনে যাব, সুযোগ হলে মানাতে বাধ্য করব। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে বড় ক্ষতি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, লেখাপড়া ছেড়ে দিলাম। ফলে ইন্টারমিডিয়েটে আমি থার্ড ক্লাস পাই। আমি অত খারাপ ছাত্র ছিলাম না। মেট্রিকে আমি ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড আমাকে ট্রমার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত