উন্নত জীবন পেতে চিত্রতারকারা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩, ০৬:১৪ এএম

অতীতের তুলনায় সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের শোবিজ তারকাদের বিদেশ ঘোরার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ যাচ্ছেন স্টেজ শো করতে, কেউ বা যাচ্ছেন ব্যক্তিগত কাজ বা নেহাতই ঘুরতে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে তারকাদের বিভিন্ন দেশে ঘোরার ছবি সহজেই চোখে পড়ে। তবে কিছু তারকা আছেন যারা আর দেশে ফিরে আসেন না। প্রবাসেই থেকে যান। সেই সংখ্যাও কম নয়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই যেন শোবিজ তারকাদের স্থায়ী হওয়ার জন্য প্রথম পছন্দ। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শোবিজ তারকা স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেছেন। তবে কেউই অবৈধভাবে সেখানে থাকছেন বলে শোনা যায়নি। সবাই বৈধভাবেই সেখানে বসবাস করছেন। কেউবা গিয়েছেন স্বামীর কর্মসূত্রে, কেউ আবার বাংলাদেশে ক্যারিয়ার পড়তির দিকে চলে যাওয়ায় উন্নত বিশ্বে থিতু হয়েছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসত গড়েন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শাবান। বিউটিকুইনখ্যাত এই নায়িকা দেশের শোবিজ জগতের প্রভাবপত্তি উপেক্ষা করে চলে যান বিদেশে। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্বামী ওয়াহিদ সাদিককে এমপি বানানোর মিশন নিয়ে দেশে আসেন। মনোনয়ন না পেয়ে আবার ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রে।

আরেক জনপ্রিয় নায়িকা শাবনুর থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। তিনি ক্যারিয়ারের চূড়ায় অবস্থানের সময় পাড়ি জমান ভিনদেশে।

জনপ্রিয় অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত রয়েছেন নিউ ইয়র্কেই। ছেলে-মেয়েকে উন্নত পড়াশোনার সুবিধা দেওয়ার জন্যই তিনি সেখানে স্থায়ী হয়েছেন। একসময়ের ডাক সাইটে এই অভিনেত্রী এখন অভিনয় থেকে বহুদূরে। তবে তিনি শিল্পচর্চার মধ্যেই আছেন। নিয়মিত ছবি আঁকছেন এবং সেই ছবি নিয়ে জ্যাকসন হাইটসসহ নানা জায়গায় এক্সিবিশন করছেন। সেখান থেকে বেশ ভালো আয়ও করছেন বলে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত একাধিক বাঙালি জানিয়েছেন।

বিপাশার স্বামী অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খান যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন। তার গ্রিন কার্ড পেতে প্রায় এক বছর লেগেছে। এই সময়ে তিনি সিনেমা থেকে দূরেই ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রেই তাকে অবসর পার করতে হয়েছে। এখন তিনি ঢাকা-নিউ ইয়র্ক আসা-যাওয়ার মধ্যেই আছেন।

শাকিব খানের মতো এ সময়ের চিত্রনায়িকা পূজা চেরী, অপু বিশ্বাসসহ কম জনপ্রিয় আরও কয়েকজন তারকাও নাকি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডের জন্য চেষ্টা করছেন। শুধু বড় তারকারাই নন, একেবারে তরুণ নৃত্যশিল্পী রাসেল আহমেদ, মেহরাজ হক তুষার কিংবা রণবীর সাহারাও প্রবাসে স্থায়ী হয়েছেন। তাতে বোঝা যায়, শিল্পী তকমা থাকলে বিদেশে স্থায়ী হওয়া সহজ। বিদেশে স্থায়ী হতে যে ধরনের ডকুমেন্ট লাগে, শিল্পী হওয়ার সুবাদে সেগুলো তারা সহজেই দিতে পারেন। ফলে বৈধভাবেই তারা প্রবাসে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।

এ তো গেল সাম্প্রতিক সময়ের কথা। কয়েক বছর ধরে আরও অনেক জনপ্রিয় শোবিজ তারকা প্রবাসে স্থায়ী হয়েছেন। টনি ডায়েস-পিয়া ডায়েস দম্পতি, নওশীন-হিল্লোল দম্পতি, কণ্ঠশিল্পী বেবি নাজনীন, রিজিয়া পারভিন, দিনাত জাহান মুন্নি, বাদশাহ বুলবুল, সায়েরা রেজা, ব্যান্ড তারকা বিপ্লব, চিত্রনায়ক কাজী মারুফ, চিত্রনায়িকা রাত্রি, জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেত্রী রিচি সোলায়মান, রোমানা, শ্রাবন্তী, মোনালিসা, তমালিকা কর্মকার, বন্যা মির্জা, দিলরুবা ইয়াসমিন রুহি, নোভা ফিরোজ, মিলা হোসাইন, পিয়া বিপাশা, আর্শিনা প্রিয়া, আমব্রিন সারজিন, ঈশানা, ইশিকা খান, বেনজির ইসরাত, শিরিন বকুল, রেহানা রাখি, নির্মাতা শামীম শাহেদসহ বেশ কিছু তারকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বাস করছেন।

দেশে এত ভক্ত দর্শকের ভালোবাসা, লাইমলাইট, শিল্পচর্চার মোহ ছেড়ে সাধারণ মানুষের মতো বসবাস করতে তারকারা কেন বিদেশে ছুটছেন? এমন প্রশ্ন অনেকের মনে। শোবিজের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শোবিজের পেশা কিন্তু আর দশটা পেশার মতো নয় যে আপনি ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ওপরের দিকে উঠতে থাকবেন। আবার সরকারি চাকরির মতো এ ধরনের পেশার স্থায়িত্বের কোনো নিশ্চয়তা নেই। জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে না পারলে এখানে বেশিদিন টিকে থাকা যায় না। তা ছাড়া সিন্ডিকেট, নানা ধরনের পলিটিকসকে টেক্কা দিয়ে কাজ করতে হয়। তাই অনেক তারকা এই পেশার সঙ্গে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকতে চান না। তারা ভবিষ্যৎকে একটু সুন্দর-সুস্থির করতেই উন্নত বিশে^ পাড়ি জমান। এমন নয় যে তারা সবাই খুব খুশিমনে এই সিদ্ধান্ত নেন। অনেক শিল্পীই আছেন যারা বিদেশে থেকেও দেশের শিল্প-সংস্কৃতি, নিজের চর্চা, দর্শকের ভালোবাসাকে প্রচ- মিস করেন।

নিউ ইয়র্কে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এমন একজন শিল্পী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে শিল্পীদের তরুণ বয়সেই যা মূল্যায়ন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তেমন কোনো কাজ তারা পান না। শুধু তা-ই নয়, প্রযোজক-পরিচালকরাও তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করেন না। তাই অনেকে সময় থাকতেই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন।’

সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে এভাবে দেশ ত্যাগ করে বিদেশে থাকার উদাহরণ তেমন নেই বললেই চলে। এখনকার তারকারা তবে কেন শিল্পচর্চাকে আঁকড়ে ধরে শেষ পর্যন্ত থাকতে পারছেন না? জানতে চাইলে ওই শিল্পী বলেন, ‘দেখুন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের চারপাশের অনেক পরিবর্তন হয়; যা শিল্পীজীবনেও প্রভাব বিস্তার করে। আগের সময় শিল্পচর্চা বা আমাদের শোবিজের যে অবস্থা, কাজের যে পদ্ধতি ছিল তাতে তারা তুলনামূলক কম্ফোর্টেবল একটা জায়গা পেয়েছেন। এখন আর সিচুয়েশন তেমন নয়। এ জন্যই এখনকার শিল্পীদের মধ্যে অস্থিরতাও বেশি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদেশে যেসব শিল্পী রয়েছেন, তারা শিল্পচর্চা মিস করলেও আর্থিকভাবে সবাই বেশ ভালো আছেন। অনেকে হয়তো সমাজের চোখে ছোট কাজ যেগুলো, তেমন কাজও করেন, কিন্তু আর্থিক ও জীবনমানের নিশ্চয়তা আছে বলেই খুশিমনে সেটি করছেন। যেমন ব্যান্ড তারকা বিপ্লব ট্যাক্সি চালান। একসময়ের পর্দা ঝলসানো গ্ল্যামারের অধিকারী মোনালিসা এখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুপার শপে বিউটি প্রোডাক্টের সেলস গার্ল হিসেবে কাজ করছেন। নন্দিত অভিনেত্রী শ্রাবন্তী সেবিকার কোর্স করেছেন। তিনি এই কর্মক্ষেত্রে চাকরি করেন। অভিনেত্রী নওশীনও মেডিকেল খাতে চাকরি করেন। তার স্বামী অভিনেতা হিল্লোল ইউটিউবে ফুড ব্লগ করেন নিয়মিত। বিমানবন্দরে কাজ করেন লাক্স তারকা নাফিজা জাহান। গ্যারেজের ব্যবসা রয়েছে টনি ডায়েসের। পিয়া ডায়েস নাচের স্কুল চালান। তমালিকা কর্মকারও একটি সাধারণ পেশায় আছেন।

আবার কোনো কোনো তারকা বিদেশে থেকেও ভালো চাকরি করছেন। বন্যা মির্জা বাংলাদেশে থাকতেও অভিনয়ের পাশাপাশি মার্কেটিংয়ে বড় পদে কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও তিনি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মার্কেটিং হেড হিসেবেই কাজ করছেন। অভিনেত্রী রিচি সোলায়মান, রোমানা, চিত্রনায়িকা রাত্রি, সংগীতশিল্পী সায়েরা রেজা নিউ ইয়র্কে রয়েছেন মূলত স্বামীর চাকরিসূত্রে। শিল্পী দিনাত জাহান মুন্নি বেশ ভালোই আছেন বলে জানালেন বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক কনসার্টে অংশ নিতে যাওয়া শিল্পী স্বপ্নীল সজীব। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিউ ইয়র্কে ছিলাম দুদিন। সেখানে কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে দেখা হয়েছে। কবির বকুল ভাই (গীতিকার) আর তার স্ত্রী মুন্নি ভাবির সঙ্গে দেখা হয়েছে। ভাবি বাংলাদেশে গান করে যা আয় করতেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রে স্টেজ শো করে তার চেয়ে ভালো অবস্থানে আছেন। এ ছাড়া র‌্যাম্প মডেল তৃণর বাড়িতে গিয়েছিলাম। তার স্বামী তো একজন কোরিয়ান। তিনি কোরিয়ান অ্যাম্বাসিতে কাজ করেন। তাদের থাকার জায়গা রাজপ্রাসাদের চেয়ে কম নয়। অন্য শিল্পীদের সঙ্গে দেখা হয়নি, তাই জানি না তারা কে কী করেন বা কেমন আছেন?’

নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসেই বেশির ভাগ বাংলাদেশি শিল্পী থাকেন। সেখানে বসবাসরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, ‘জ্যাকসন হাইটস হলো প্রান্তিক বাংলাদেশিদের বসবাস। এখানে বেশির ভাগ বাংলাদেশিই ছোটখাটো কাজ করেন। এখানে বাংলাদেশি যেসব তারকা থাকেন, তাদের সবার সঙ্গেই প্রায় দেখা হয়। এর মধ্যে বিপাশা হায়াত, কাজী মারুফ, টনি ডায়েস, শামীম শাহেদ, রিচি সোলায়মান, রোমানা, বন্যা মির্জা, সায়েরা রেজাসহ আরও কয়েকজন শিল্পী বেশ ভালো অবস্থানে আছেন। তবে অল্প কিছু শিল্পী আসলে তেমন কোনো কাজ জোটাতে পারেননি; বিশেষ করে পরিণত বয়সের গানের শিল্পীরা যারা রয়েছেন, তাদের কথা বলছি। তারা আশপাশের অতিসাধারণ বাঙালিদের সঙ্গে চা-পানি খায়। আড্ডা দেয়। সেসব সাধারণ মানুষের কাছে তো এটা বিশাল ব্যাপার যে একজন তারকা তাদের সঙ্গে এত সময় কাটাচ্ছেন। দিন শেষে দেখা হলো, বাজারের পয়সাটা তাদের কাছ থেকেই নিয়ে নিল। একজন সিনিয়র শিল্পীর কথা শুনলাম, তিনি টানা ছয় মাস একজনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ভাড়া ছিলেন। বাসা ভাড়া চাইতে গেলে তিনি উল্টো মালিককেই পুলিশের ভয় দেখিয়েছেন। কারণ সেখানে গ্রাউন্ড ফ্লোর ভাড়া দেওয়া নিষেধ। এই হলো অবস্থা।’   

প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক কাজী হায়াতের ছেলে জনপ্রিয় নায়ক কাজী মারুফ প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন, এটা ভাবতে খারাপ লাগলেও ছেলের কাজ নিয়ে ইতিবাচক বাবা। কাজী হায়াৎ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মারুফ বিদেশে গিয়েও বসে নেই। সেখানে সে একটি ছবি বানিয়েছে, নাম “গ্রিন কার্ড”। আমি মনে করি ছবিটি এ দেশের মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে ছবিটি দেখে মনে হয়েছে, সিনেমা হলে “গ্রিন কার্ড” দেখে দর্শকের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যাবে।’ বিদেশে স্থায়ী হওয়া নিয়ে কাজী মারুফ বলেন, ‘বাংলাদেশে সিনেমার তেমন কাজ ছিল না। কিন্তু কিছু তো করে খেতে হবে। তা ছাড়া ২০১৯ সালে আমাদের একটি ছবি মুক্তির কথা ছিল। সেভাবেই টার্গেট করেছিলাম। কিন্তু সিনেমাটি মুক্তি দিতে দেয়নি একটি বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। পরিচালক ছিলেন আমার আব্বা (কাজী হায়াৎ)। তারা আমার আব্বাকে বলেছিলেন, আমরা রিলিজ করতে না দিলে কীভাবে রিলিজ করবেন। আমার আব্বার মতো মানুষকে এ কথা শুনতে হয়েছিল। সেদিন আব্বা বাসায় এসে বললেন, “আমি এই বয়সে যুদ্ধ করব? আমি চাই না তুমিও যুদ্ধ করো এদের সঙ্গে। চলে যাও আমেরিকা।” এসব কারণেই বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এসেছি। এখানে নিজের ব্যবসা নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো আছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত