৫৬ লাখ মানুষের ছোট্ট এক দেশ নরওয়ে। শীতকালীন অলিম্পিকে পদকের বন্যা ভাসানো কিংবা দাবার বোর্ডে ম্যাগনাস কার্লসেনের বিশ্বজয় সব মিলিয়ে খেলাধুলায় তাদের সাফল্য কম নয়। কিন্তু ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের সেই এক রাত পুরো নরওয়েকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মার্সেইয়ের স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল ‘পুঁচকে’ নরওয়ে। ধারাভাষ্যকার আর্নে শেইয়ের সেই বিখ্যাত চিৎকার, ‘আমরা মার্সেইয়ে গোল করেছি!’ আজও নরওয়েজিয়ানদের হৃদয়ে অমলিন।
২৬ বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র মঞ্চে আবারও সেই চিরচেনা সমীকরণ। স্থান এবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। একদিকে টুর্নামেন্টের অন্যতম হট-ফেভারিট ব্রাজিল, অন্যদিকে নতুন এক ‘সোনালি প্রজন্ম’ নিয়ে ইতিহাসকে নতুন করে লেখার মিশনে থাকা ভাইকিংরা।
কাগজে-কলমে লড়াইটা ডেভিড বনাম গোলিয়াথের। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় আটকে আছে ব্রাজিল। সেলেসাওরা ফুটবল ইতিহাসে নরওয়ের বিপক্ষে চারবার মুখোমুখি হয়ে একবারও জিততে পারেনি (২ হার, ২ ড্র)। ১৯৯৮ সালের সেই ঐতিহাসিক পেনাল্টি স্কোরার কেতিল রেকডাল মনে করেন, এই পরিসংখ্যান ব্রাজিলের মনে অবচেতন এক ভয়ের জন্ম দেবে। তিনি বলেন, ‘রবিবার ব্রাজিলের ওপরই সবচেয়ে বেশি চাপ থাকবে। নরওয়ের কাছে আবার হেরে যাওয়ার একটা সুপ্ত আতঙ্ক তাদের তাড়া করবেই।’
তবে এবারের নরওয়ে দল শুধু অতীতের স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। আর্লিং হালান্ড এবং মার্টিন ওডেগার্ডের মতো বিশ্বমানের মহাতারকারা ইউরোপিয়ান ক্লাবের শীর্ষ স্তরে খেলে অভ্যস্ত। রেকডালের ভাষায়, ‘হ্যালান্ড-ওডেগার্ডরা ৯৮-এর ভূত নিয়ে ভাবছে না। তারা প্রতিদিন ইউরোপের সেরা মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেই এখানে এসেছে।’
যদি শেষ আটে যেতে হয়, তবে ব্রাজিলকে যেকোনো মূল্যে থামাতে হবে নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডকে। চলতি বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই ৫ গোল করা এই স্ট্রাইকারকে আটকে রাখা যতটা কঠিন মনে হচ্ছে, ব্রাজিলের জন্য তা সহজ হতে পারে তাদের ডাগআউটের কারণে।
ব্রাজিলের বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তি, যিনি রিয়াল মাদ্রিদের কোচ থাকাকালে চ্যাম্পিয়নস লিগে সিটির বিরুদ্ধে একাধিকবার হালান্ডকে বোতলবন্দি করার নিখুঁত ফর্মুলা তৈরি করেছিলেন। আনচেলত্তির সেই ব্লুপ্রিন্ট ছিল খুবই সহজ কিন্তু কার্যকারী। একজন নির্দিষ্ট ডিফেন্ডারকে হালান্ডের পেছনে ‘ছায়ার মতো’ লেলিয়ে দেওয়া, যাতে আক্রমণভাগে তিনি এক ইঞ্চি জায়গাও না পান। রিয়াল মাদ্রিদে এই কঠিন মিশনটি আনচেলত্তি সঁপে দিয়েছিলেন আন্তোনিও রুডিগারের ওপর। রুডিগারের কড়া পাহারায় হালান্ড এতটাই অসহায় বোধ করতেন যে, ২০২৩/২৪ মৌসুমে পেপ গার্দিওলা ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে তার এই সেরা স্ট্রাইকারকে মাঠ থেকে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন! এবার নিউ জার্সিতে আনচেলত্তি যদি রিয়াল মাদ্রিদের সেই সফল ট্যাকটিক্স ব্যবহার করেন, তবে হালান্ডকে পুরো ম্যাচজুড়ে তাড়া করার জন্য ব্রাজিলের সবচেয়ে উপযুক্ত অস্ত্র হলেন গ্যাব্রিয়েল মাগালাস। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের হয়ে খেলার সুবাদে গ্যাবি খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে এই ৯ নম্বরকে অচল করতে হয়।
ব্রাজিলের শিবিরে যখন ইনজুরি ও কার্ডের সমস্যায় থাকা লুকাস পাকেতার বিকল্প খোঁজার ব্যস্ততা, তখন নরওয়ের কোচ স্টেল সোলবাকেন শুরু করেছেন মাঠের বাইরের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ব্রাজিলকে ম্যাচের ফেভারিট মেনে নিয়ে কোচের চাতুর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘ব্রাজিল অবশ্যই ফেভারিট, তবে সমীকরণটা এমন নয় যে লড়াইটা ৯০ বনাম ১০ শতাংশের হবে। আমি মনে করি ম্যাচটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ হবে।’
কথা প্রসঙ্গে নরওয়ে কোচ কৌতুক করে বলেন, ব্রাজিলকে থামাতে তিনি হয়তো স্ট্রাইকারবিহীন ‘৭-৩-০’ ফরমেশনে দল নামাবেন! তবে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও নেইমারকে নিয়ে তার মূল্যায়ন বেশ জমে উঠেছে। চলতি টুর্নামেন্টে ৪টি গোল করা ভিনি জুনিয়রকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘ভিনি যখন ফর্মে থাকে, তখন সে যেকোনো দলের জন্যই এক বড় সমস্যা। তাকে থামানো সহজ নয়।’ অন্যদিকে, চোট বা ফর্মের কারণে চলতি টুর্নামেন্টে এখনো পুরো ৯০ মিনিট খেলতে না পারা ব্রাজিলের পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে সোলবাকেনের সোজাসাপ্টা তোপ, ‘নেইমার যতক্ষণ বেঞ্চে বসে আছে, ততক্ষণ তাকে নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোনো দুশ্চিন্তা নেই!’
গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও ব্রাজিলের যাত্রা মসৃণ ছিল না। শেষ ৩২-এর ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় গোলে ২-১ ব্যবধানে জিততে হয়েছে তাদের। তবে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র বিগত ১০টি ম্যাচের ৯টিতেই জিতেছে ব্রাজিল। কিন্তু তাদের বড় দুশ্চিন্তা হলো গ্রুপ পর্বের পর ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে খেলা শেষ ৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচেই হেরেছে সেলেসাওরা!
কোচ স্টেল সোলবাকেনের অধীনে নরওয়ে ফুটবল এক নতুন দিগন্তে। শেষ ৩২-এর ম্যাচে আইভরি কোস্টকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচ জিতেছে তারা। কাকতালীয়ভাবে, ১৯৯৮ সালে ইতালির কাছে যে ম্যাচে নরওয়ে হেরে বিদায় নিয়েছিল, সেই ম্যাচে মাঠে খেলেছিলেন বর্তমান কোচ সোলবাকেন নিজে। এবার ডাগআউটে দাঁড়িয়ে সেই আক্ষেপ ঘোচাতে চান তিনি।
ব্রাজিলের শিবিরে ক্যাসেমিরো, লুকাস পাকেতা এবং রাফিনহাকে নিয়ে বড় ধরনের ইনজুরি শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, নরওয়ে আশা করছে তাদের তারকা ডিফেন্ডার জুলিয়ান রাইয়ারসন চোট কাটিয়ে ফিরবেন।
ব্রাজিলের শৈল্পিক ফুটবল আর ট্যাকটিক্যাল মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির বিপরীতে নরওয়ের পাওয়ার ফুটবল আর ‘ভাইকিং রো’ এর গর্জন। ফুটবল বিধাতা যে চিত্রনাট্য লিখেছেন, তাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আজ ছড়াবে কোটি টাকার ফুটবল রোমাঞ্চ!