উত্তম চরিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হলো ক্রোধ নিবারণ ও রাগ সংবরণ করা। ক্রোধ নিবারণের অর্থ হলো রাগ দমিয়ে রাখা, পেটের মধ্যে চেপে রাখা এবং তা প্রকাশ ও বাস্তবায়ন না করা। আল্লাহতায়ালা ক্রোধ নিবারণকারীদের প্রশংসা করে বলেন, ‘যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আর আল্লাহ মুহসিনদের ভালোবাসেন।’সুরা আলে ইমরান : ১৩৪
রাগ হলো ধ্বংসকারী ও বিবেক-বুদ্ধি বিনাশকারী। যখন রাগ আসে তখনই অবক্ষয় বিস্তার লাভ করে। রাগের উত্তালতা ও বিস্ফোরণ অসংখ্য রক্তপ্রবাহ, স্ত্রী তালাক, আত্মীয়ের সঙ্গে শত্রুতা, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে। বিশ্বাসঘাতকতার ধূলিকণা বিশ্বস্ততার সৌন্দর্যকে আড়াল করে এবং উচ্চাভিলাষের তরবারি, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের রশিকে কর্তনকারী, যা অন্তরে লুকায়িত থাকে ছাইয়ের নিচে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে থাকার মতো। রাগ কথাকে এলোমেলো, দলিলকে অকার্যকর, মেধাকে বিক্ষিপ্ত, বিবেককে আচ্ছাদিত এবং দুনিয়া ও আখেরাতকে ভুলিয়ে দেয়। ক্রোধ যার ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তার চেহারায় দৃষ্টিপাত করা যায় না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-কে বললেন, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, তুমি রাগ করবে না। লোকটি কয়েকবার এই কথা পুনরাবৃত্তি করল। রাসুল (সা.) প্রত্যেকবারই বললেন, তুমি রাগ করো না।সহিহ বোখারি
মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় এসেছে, লোকটি বলেন, আমি নবী করিম (সা.)-এর কথাটি নিয়ে চিন্তা করে দেখলাম যে, রাগ সব অকল্যাণের মূল। ইবনে আবদুল বার (রহ.) বলেন, ‘যে রাগকে সংবরণ ও প্রতিহত করবে, সে শয়তানকে লাঞ্ছিত করবে এবং তার ব্যক্তিত্ব ও দ্বীন নিরাপদ থাকবে।’ ইবনুল মোবারক (রহ.)-কে বলা হলো, এক কথায় আমাদের উত্তম চরিত্রের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, ‘রাগ পরিহার করা।’ যারা সওয়াবের আশায় রাগের সময় ক্ষমা ও ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহতায়ালা তাদের প্রশংসা করেছেন।
যে ব্যক্তি রাগের আনুগত্য করে, সে তার আদবকে নষ্ট করে। দ্রুত রাগান্বিত হওয়া স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের বৈশিষ্ট্য। এমন মানুষ যখন রেগে যায়, তখন সে বাজে কথা বলে, আঘাত করে, তার সঙ্গে কথা বললে ক্ষিপ্ত হয়, কোনো বিষয়ে আলোচনা করলে জ্বলে উঠে আর বিরোধিতা করলে অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। এটা তার অজ্ঞতা ও অদূরদর্শিতার প্রমাণ। এগুলো প্রত্যেক রাগী, মূর্খ ও হঠকারীর বৈশিষ্ট্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’সহিহ বোখারি
যে ব্যক্তি ক্রোধের দাবানল প্রজ্বালিত হওয়ার পর সহনশীলতার মাধ্যমে তা দমন, ধৈর্যের মাধ্যমে পরাজিত এবং অবিচলতার মাধ্যমে পরাভূত করল; সে তার সবচেয়ে শক্তিশালী শত্রু এবং মন্দ প্রতিপক্ষকে দমন করল। সুতরাং আপনারা রাগের কারণ ও হেতুসমূহ পরিহার করুন। রসিকতায় বাড়াবাড়ি করবেন না, কেননা রসিকতা হলো ক্রোধের পটভূমি। রসিকতা দিয়ে অন্তরকে আনন্দিত করার পরিবর্তে অপবাদ, গিবত ও বিদ্রুপের মাধ্যমে সুপ্ত হিংসা-বিদ্বেষ জাগ্রত করবেন না। এগুলো শয়তানের ফন্দি এবং প্রবৃত্তির প্রবঞ্চনা।
তর্ক-বিতর্ক ক্রোধ উদ্রেককারী, সুতরাং যখনই তর্ক শুনবে তখনই থেমে যাবে। হজরত আবু উমামা আল বাহেলি (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার, যে হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করে। আর যে ব্যক্তি হাসি-তামাসার মধ্যেও মিথ্যা বলে না, আমি তার জন্য জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে একটি ঘরের জিম্মাদার হব। আর যে ব্যক্তি উত্তম চরিত্রের অধিকারী, তার জন্য আমি জান্নাতের উচ্চতম স্থানে একটি ঘরের জিম্মাদার।’সুনানে আবু দাউদ
কলহ-বিবাদ দ্বীনকে নিশ্চিহ্ন এবং মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আপনারা তার নিকটবর্তী হবেন না এবং উপহাস, বিদ্রুপ, দোষারোপ, পরস্পরে কলহ, ঝগড়া, বিবাদ, বিরোধিতা, বৈপরীত্য, জুলুম, গিবত, চোগলখোরি, গালাগাল, শত্রুতা, অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ, অধিকার বঞ্চিত করা, অন্যের সম্পদ হ্রাস এবং মাপে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এই কাজসমূহ মানুষের মধ্যে অনিষ্ট, হিংসা এবং ক্রোধকে উসকে দেয়। আর যখন রাগ এসে পড়ে তখন ফেতনা চক্কর দেয়, শয়তান উপস্থিত হয়, চক্ষুসমূহ অন্ধ হয়ে যায় এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন, ভালোবাসা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।
ক্রোধ ও শত্রুতার অগ্নিশিখাকে নির্বাপিত করুন ধীরস্থিরতা, সহিষ্ণুতা এবং সহনশীলতার মাধ্যমে। তার শিখাকে প্রশমন করুন জবাবদিহি ও অভিযুক্তকরণ থেকে মুক্ত থাকার মাধ্যমে। ক্রোধের প্রতিবিধান করুন জিকির ও তাকে প্রশমিত করুন ধৈর্যের মাধ্যমে এবং তার মূলোৎপাটন করুন নীরবতার মাধ্যমে। নীরবতার মধ্যে রয়েছে নির্বুদ্ধিতা ও বুদ্ধির চপলতার উপেক্ষা, রাগের প্রশমন এবং বিয়ের পরিসমাপ্তি। নীরব ব্যক্তি কখনো লজ্জিত হয় না। পক্ষান্তরে ঝগড়াটে রাগী ব্যক্তি ক্রোধে, রোষে ও ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে এবং মন্দ কথা বলে; সে নিরাপদ থাকতে পারে না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও রাগের উদ্রেক হলে সে যেন নীরবতা অবলম্বন করে।’ তিনি এটা তিনবার বলেছেন।
ঝগড়ার মেঘমালা দেখা দিলে স্বামী-স্ত্রীর জন্য করণীয় হলো পারস্পরিক সৌহার্দ্যরে মাধ্যমে বিবাদ বন্ধ, নম্রতা প্রদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘ সম্পর্ক রক্ষা এবং ঝগড়া-বিবাদকে দীর্ঘায়িত না করা। ক্রোধের নির্বুদ্ধিতা যাকে প্ররোচিত করবে, সে যেন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়; কেননা ক্রোধ হলো শয়তানের হাতিয়ার। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে তার ক্রোধ প্রশমিত হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়ে ‘আউজুবিল্লাহ’ পাঠ করবে তখন তার রাগ প্রশমিত হয়ে যাবে।”
যার মাঝে রাগ সংক্রমিত হয়েছে, সে যেন বসে পড়ে। হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও যদি দাঁড়ানো অবস্থায় রাগের উদ্রেক হয়, তাহলে সে যেন বসে পড়ে। এতে যদি রাগ দূর হয় তো ভালো, অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে।’সুনানে আবু দাউদ
ক্ষমার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই। কাজেই আপনার শক্তি-সামর্থ্য থাকলে দয়া করুন, বিজয়ী হলে সদাচরণ করুন এবং কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করলে কোমল আচরণ করুন। আপনাদের যেন ক্ষমতা ও অর্থবিত্ত প্ররোচিত না করে ক্রোধের সময় অত্যাচারী হতে। গৃহকর্মী, অসহায় ও মিসকিনদের নির্যাতন এবং তাদের গালাগাল করতে। বরং আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে স্মরণ করুন। কেননা গৃহকর্মী ও অসহায়দের ওপর আপনার ক্ষমতার চেয়ে আল্লাহর ক্ষমতা আপনাদের ওপর অনেক বেশি।
২৪ ফেব্রুয়ারি মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
